সংবাদ শিরোনাম ::
গ্রামে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না : সংসদে রুমিন ফারহানা বন ধ্বংস করে ইন্ডাস্ট্রি করা ব্যক্তিই পরিবেশমন্ত্রী: আসিফ মাহমুদ রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু ৭৩ কোটি টাকায় ফিফা বিশ্বকাপের স্বত্ব কিনছে বিটিভি অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য নীতিমালা করছে সরকার বিসিবি সভাপতি তামিম, সহ-সভাপতি ফাহিম সিনহা চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে ২০ পিস ইয়াবাসহ একাধিক মামলার আসামি গ্রেফতার রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচারআইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদ রামিসা হত্যা মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে স্টাডি করে নেবেন : মন্ত্রীকে স্পিকার

ক্ষমতার দাপটে ওসমানীনগরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন ইউএনও মুনমুন

সিলেটের ওসমানীনগরে রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশা। তার একের পর এক বিতর্কিত ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ড জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। ‘আপা’ সম্বোধন করায় জরিমানা করাসহ ক্ষমতার অপব্যবহার, জোরপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ওসমানীনগরে যোগদানের পর থেকেই ৩৬তম বিসিএসের এই কর্মকর্তার একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। বছরজুড়ে আলোচিত ইউএনও মুনমুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মনোমালিন্যের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ‘আপা’ সম্বোধন করায় খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বনফুল অ্যান্ড কোংয়ের ওসমানীনগর শাখার এক কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে আলোচনায় আসেন ইউএনও মুনমুন। এ ঘটনার পর তার কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।

ভুক্তভোগী কর্মচারী আব্দুল মান্নানের দাবি, ইউএনও মুনমুনকে ‘আপা’ সম্বোধন করায় ভয় দেখিয়ে ওই জরিমানায় স্বাক্ষর করানো হয়। এ ঘটনা নিয়ে গত বুধবার ইউএনওকে আপা সম্বোধন করায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর থেকে ঘটনাটি আড়াল করতে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিতে শুরু করেন ইউএনও মুনমুন।

গত বৃহস্পতিবার সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম চলাকালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন ইউএনও মুনমুন। নিজের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করেন। সংবাদ সম্মেলনে বনফুলের কর্মচারীকে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের করা গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি।

যশোরে ‘সচ্ছল’ ৬২ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ডযশোরে ‘সচ্ছল’ ৬২ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড
অভিযানে নিজের ছয় বছরের শিশু কন্যাকে সঙ্গে নেওয়ার বৈধতা, বনফুলের শাখা ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে কর্মচারীর স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি ইউএনও মুনমুন।

ইউএনও মুনমুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পকের অধীন উপজেলার ৫৪ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২০ কেন্দ্রে ছয়টি করে ক্যামেরা স্থাপনের জন্য নির্বাচন কমিশন ছয় লাখ ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় । কিন্তু ওই টাকা বণ্টন না করে আত্মসাৎ করেন ইউএনও মুনমুন।

এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের এক শতাংশ বরাদ্দ খাত থেকে ৪৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং ভোটকেন্দ্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। অথচ প্রকৃত সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী ব্যয় হওয়ার কথা ছিল মাত্র ১৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ গোপন রেখে ১০ ফেব্রুয়ারি উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে অগ্রিম বিল উত্তোলন করা হয়। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে দ্রুত বিভিন্ন বাজার ও জনবহুল স্থানে ক্যামেরা স্থাপন শুরু করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি তাজপুর বাজারে একটি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউএনওর স্বামীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সাইফুল এন্টারপ্রাইজ’-এর সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে।

সিসিটিভি প্রকল্পে অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান ও গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ফলে উচ্চ আদালতে চলমান রিট মামলা থাকা অবস্থায় তাজপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কবির আহমদকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করে। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ওসমানীনগর থানার ওসিসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নিয়োগকে বেআইনি এবং বিদ্যমান আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী দাবি করে কবির আহমদ গত ১২ মে পুনরায় হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন।

ইউএনও মুনমুনের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, তিনি উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও সহকারী কমিশনারের দায়িত্ব পালনকালে পরিষদের রাজস্ব খাতে একাধিক প্রকল্পে অনিয়ম করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে সরকারি গাড়ি মেরামতের নামে ৯৬ হাজার টাকা, উপজেলা পরিষদ ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরা ক্রয় ও মেরামতের নামে ৭৩ হাজার টাকা, বাংলোর পানির পাম্প মেরামত ও স্থাপনে ৭২ হাজার টাকা এবং ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্লান্ট সংযোজন বাবদ এক লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব প্রকল্পে আংশিক কাজ বা কোনো কাজ ছাড়াই বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, গত ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় উপজেলার তাজপুর বাজারে অবস্থিত ‘আয়ান এন্ড ইয়াকুব বিরিয়ানি হাউজে’ সরকারি চাল মজুত রয়েছে—এমন অভিযোগে স্থানীয়রা প্রশাসনকে খবর দেওয়া হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রিপন রায় প্রাথমিকভাবে চালগুলো জব্দ করেন।

পরদিন ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় ওই প্রতিষ্ঠানে ইউএনও মুনমুন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। সরকারি ১২০ বস্তা চাল জব্দের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল মাছুম আবির ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় চাল ক্রয়ের বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করেন। আদালত যাচাই-বাছাই শেষে চালের বৈধতা স্বীকার করে দ্রুত বাজারজাত করার নির্দেশ দেয়।

অনিয়ম ঢাকতে সার্ভার ত্রুটির দোহাই লেবার কাউন্সেলরেরঅনিয়ম ঢাকতে সার্ভার ত্রুটির দোহাই লেবার কাউন্সেলরের
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, চাল বৈধ ঘোষণা করার পরও ফুডগ্রেইন (খাদ্যশস্য) সনদ না থাকার অভিযোগে প্রায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

আল মাছুম আবির অভিযোগ করেন, ইউএনওর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেওয়ার কারণেই তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জরিমানা করা হয়। রায় ঘোষণার পর গত ২৮ এপ্রিল স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে আল মাছুম আবির ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রায় পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। এ সময় ইউএনও তার বিরুদ্ধে আগের মানববন্ধনের প্রসঙ্গ তুলে রায় পরিবর্তনের সুযোগ নেই বলে জানান।

এর আগে হাইকোর্টের আপিল বিভাগে একটি রিট মামলা চলমান থাকাবস্থায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পে ইউএনওর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর একই ধরনের প্রক্রিয়ায় তাজপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কবির আহমদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে আন্দালন করে কোনো লাভ হয়নি।

এদিকে, গত ৩ এপ্রিল রাতে উপজেলার তাজপুর বাজারে বারণী মেলার নামে অবৈধভাবে র‌্যাফেল ড্র বিক্রির অভিযোগে ভাড়ায় কাজ করা লিপন আহমদ নামে একজনকে তিন দিনের কারাদণ্ড দেন ইউএনও মুনমুন। একই সঙ্গে প্রচারকাজে ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত টমটম ও মাইক জব্দ করা হয়।

অথচ পরদিন ৪ এপ্রিল তাজপুর বাজারে জনসম্মুখে ওই লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতে জব্দ করা টমটম, মাইক ও টিকিট বই পরদিন আয়োজকরা ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেন। আয়োজকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ভাড়ায় কাজ করা ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ায় ইউএনওর রায় নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে বিভাগীয় কমিশনার অতিরিক্ত সচিব মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে অনেকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্রামে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না : সংসদে রুমিন ফারহানা

ক্ষমতার দাপটে ওসমানীনগরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন ইউএনও মুনমুন

আপডেট সময় ০২:২৫:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

সিলেটের ওসমানীনগরে রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশা। তার একের পর এক বিতর্কিত ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ড জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। ‘আপা’ সম্বোধন করায় জরিমানা করাসহ ক্ষমতার অপব্যবহার, জোরপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ওসমানীনগরে যোগদানের পর থেকেই ৩৬তম বিসিএসের এই কর্মকর্তার একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। বছরজুড়ে আলোচিত ইউএনও মুনমুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মনোমালিন্যের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ‘আপা’ সম্বোধন করায় খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বনফুল অ্যান্ড কোংয়ের ওসমানীনগর শাখার এক কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে আলোচনায় আসেন ইউএনও মুনমুন। এ ঘটনার পর তার কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।

ভুক্তভোগী কর্মচারী আব্দুল মান্নানের দাবি, ইউএনও মুনমুনকে ‘আপা’ সম্বোধন করায় ভয় দেখিয়ে ওই জরিমানায় স্বাক্ষর করানো হয়। এ ঘটনা নিয়ে গত বুধবার ইউএনওকে আপা সম্বোধন করায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর থেকে ঘটনাটি আড়াল করতে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিতে শুরু করেন ইউএনও মুনমুন।

গত বৃহস্পতিবার সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম চলাকালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন ইউএনও মুনমুন। নিজের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করেন। সংবাদ সম্মেলনে বনফুলের কর্মচারীকে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের করা গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি।

যশোরে ‘সচ্ছল’ ৬২ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ডযশোরে ‘সচ্ছল’ ৬২ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড
অভিযানে নিজের ছয় বছরের শিশু কন্যাকে সঙ্গে নেওয়ার বৈধতা, বনফুলের শাখা ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে কর্মচারীর স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি ইউএনও মুনমুন।

ইউএনও মুনমুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পকের অধীন উপজেলার ৫৪ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২০ কেন্দ্রে ছয়টি করে ক্যামেরা স্থাপনের জন্য নির্বাচন কমিশন ছয় লাখ ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় । কিন্তু ওই টাকা বণ্টন না করে আত্মসাৎ করেন ইউএনও মুনমুন।

এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের এক শতাংশ বরাদ্দ খাত থেকে ৪৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং ভোটকেন্দ্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। অথচ প্রকৃত সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী ব্যয় হওয়ার কথা ছিল মাত্র ১৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ গোপন রেখে ১০ ফেব্রুয়ারি উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে অগ্রিম বিল উত্তোলন করা হয়। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে দ্রুত বিভিন্ন বাজার ও জনবহুল স্থানে ক্যামেরা স্থাপন শুরু করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি তাজপুর বাজারে একটি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউএনওর স্বামীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সাইফুল এন্টারপ্রাইজ’-এর সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে।

সিসিটিভি প্রকল্পে অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান ও গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ফলে উচ্চ আদালতে চলমান রিট মামলা থাকা অবস্থায় তাজপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কবির আহমদকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করে। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ওসমানীনগর থানার ওসিসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নিয়োগকে বেআইনি এবং বিদ্যমান আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী দাবি করে কবির আহমদ গত ১২ মে পুনরায় হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন।

ইউএনও মুনমুনের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, তিনি উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও সহকারী কমিশনারের দায়িত্ব পালনকালে পরিষদের রাজস্ব খাতে একাধিক প্রকল্পে অনিয়ম করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে সরকারি গাড়ি মেরামতের নামে ৯৬ হাজার টাকা, উপজেলা পরিষদ ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরা ক্রয় ও মেরামতের নামে ৭৩ হাজার টাকা, বাংলোর পানির পাম্প মেরামত ও স্থাপনে ৭২ হাজার টাকা এবং ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্লান্ট সংযোজন বাবদ এক লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব প্রকল্পে আংশিক কাজ বা কোনো কাজ ছাড়াই বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, গত ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় উপজেলার তাজপুর বাজারে অবস্থিত ‘আয়ান এন্ড ইয়াকুব বিরিয়ানি হাউজে’ সরকারি চাল মজুত রয়েছে—এমন অভিযোগে স্থানীয়রা প্রশাসনকে খবর দেওয়া হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রিপন রায় প্রাথমিকভাবে চালগুলো জব্দ করেন।

পরদিন ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় ওই প্রতিষ্ঠানে ইউএনও মুনমুন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। সরকারি ১২০ বস্তা চাল জব্দের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল মাছুম আবির ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় চাল ক্রয়ের বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করেন। আদালত যাচাই-বাছাই শেষে চালের বৈধতা স্বীকার করে দ্রুত বাজারজাত করার নির্দেশ দেয়।

অনিয়ম ঢাকতে সার্ভার ত্রুটির দোহাই লেবার কাউন্সেলরেরঅনিয়ম ঢাকতে সার্ভার ত্রুটির দোহাই লেবার কাউন্সেলরের
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, চাল বৈধ ঘোষণা করার পরও ফুডগ্রেইন (খাদ্যশস্য) সনদ না থাকার অভিযোগে প্রায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

আল মাছুম আবির অভিযোগ করেন, ইউএনওর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেওয়ার কারণেই তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জরিমানা করা হয়। রায় ঘোষণার পর গত ২৮ এপ্রিল স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে আল মাছুম আবির ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রায় পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। এ সময় ইউএনও তার বিরুদ্ধে আগের মানববন্ধনের প্রসঙ্গ তুলে রায় পরিবর্তনের সুযোগ নেই বলে জানান।

এর আগে হাইকোর্টের আপিল বিভাগে একটি রিট মামলা চলমান থাকাবস্থায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পে ইউএনওর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর একই ধরনের প্রক্রিয়ায় তাজপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কবির আহমদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে আন্দালন করে কোনো লাভ হয়নি।

এদিকে, গত ৩ এপ্রিল রাতে উপজেলার তাজপুর বাজারে বারণী মেলার নামে অবৈধভাবে র‌্যাফেল ড্র বিক্রির অভিযোগে ভাড়ায় কাজ করা লিপন আহমদ নামে একজনকে তিন দিনের কারাদণ্ড দেন ইউএনও মুনমুন। একই সঙ্গে প্রচারকাজে ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত টমটম ও মাইক জব্দ করা হয়।

অথচ পরদিন ৪ এপ্রিল তাজপুর বাজারে জনসম্মুখে ওই লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতে জব্দ করা টমটম, মাইক ও টিকিট বই পরদিন আয়োজকরা ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেন। আয়োজকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ভাড়ায় কাজ করা ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ায় ইউএনওর রায় নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে বিভাগীয় কমিশনার অতিরিক্ত সচিব মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে অনেকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।