স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর–কে ঘিরে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদার–এর নাম। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন, ঠিকাদারি কার্যক্রম, বিল অনুমোদন, বদলি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে নানা মহলে অভিযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি প্রকল্প ঘিরে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংশ্লিষ্ট মহলের। স্থানীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, অতিরিক্ত বিল উত্তোলন, নিম্নমানের কাজ এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে পদায়ন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অভিযোগ নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালত বা সরকারি তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত রায় প্রকাশ হয়নি, তবুও মাঠপর্যায়ের ঠিকাদার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দপ্তরের একাধিক সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক নানা তথ্য।
এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের দাবি, মো. ফিরোজ আলম তালুকদার দায়িত্ব পালনকালে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেছিলেন। এই বলয়ের মাধ্যমে প্রকল্প অনুমোদন, কাজের গুণগত মান নির্ধারণ, বিল ছাড় এবং প্রকল্প তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কর্মচারীর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল অনুমোদনের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্পের কাজ ছিল অসম্পূর্ণ কিংবা নিম্নমানের।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে দেবীনগর–হাশেম মাদবর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৬৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ছোট প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও সেখানে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নির্ধারিত কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও অতিরিক্ত অর্থ অনুমোদনের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রাস্তার কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল এবং বর্ষাকালে রাস্তার বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবে যতটুকু কাজ হয়েছে তার চেয়ে কাগজে অনেক বেশি অগ্রগতি দেখানো হয়েছিল। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, বিল অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং তদারকি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আরেকটি আলোচিত প্রকল্প হচ্ছে রাধানগর–কৃষ্ণদেবপুর সড়ক উন্নয়ন কাজ। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত বিল উত্তোলন করা হলেও বাস্তব অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় চুক্তি বাতিল করা হয়। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকায় দৃশ্যমান উন্নয়ন না থাকলেও অফিসিয়াল নথিতে কাজের অগ্রগতি উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে করে সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, মাঠপর্যায়ে প্রকল্প তদারকি কার্যকরভাবে না হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সুযোগ পেয়েছেন।
বান্দুরা–বারুয়া–শিকারীপাড়া সড়ক প্রকল্প নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। প্রায় ৯ কোটির বেশি টাকার এই প্রকল্পে কাজ শুরুর আগেই অগ্রিম বিল উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। পরে কাজের অগ্রগতি না থাকায় চুক্তি বাতিল করা হয়। এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্প এলাকায় বাস্তব কাজের চিহ্ন খুব কম দেখা গেলেও বরাদ্দের একটি অংশ আগেই উত্তোলন করা হয়েছিল। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করেন, উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক সমর্থন ছাড়া এ ধরনের আর্থিক অনুমোদন পাওয়া কঠিন। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় কারা কারা জড়িত ছিলেন, তা নিয়ে অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।
শুধু প্রকল্প অনিয়ম নয়, বদলি ও পদায়ন নিয়েও মো. ফিরোজ আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। বদলি বাণিজ্য, পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার মতো অভিযোগও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনের ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
দপ্তরের ভেতরে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তার নামও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি সমন্বিত চক্রের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো, নিম্নমানের কাজ গ্রহণ এবং কাগজে উন্নয়ন দেখিয়ে বিল ছাড়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে থাকা ঠিকাদারদের অনেক সময় কাজ পেতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আবার কেউ কেউ দাবি করেছেন, প্রকল্পের বিল দ্রুত পেতে হলে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও প্রভাব ব্যবহার প্রয়োজন হতো।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মো. ফিরোজ আলম তালুকদারের অবস্থান নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক পরিবর্তনের পরও তিনি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পুনরায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা খুব বেশি পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তিনি এক পর্যায়ে বলেন, কোনো প্রকল্পে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় কেবল একজন কর্মকর্তার নয়; সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রকৌশলী ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও এতে যুক্ত থাকতে পারেন। তার এই বক্তব্যকে অনেকে আংশিক স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখলেও অন্যরা বলছেন, এটি ছিল দায় এড়ানোর কৌশল। কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত তদারকি ও প্রশাসনিক অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে যে, কিছু প্রকল্পে কাজের মান যাচাই ছাড়াই বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়মের কারণে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, কাগজে উন্নয়ন দেখিয়ে বাস্তবে নিম্নমানের কাজ করার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে।
দুর্নীতি দমন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মনে করেন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগের তদন্ত যথেষ্ট নয়; পুরো ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়াতে হবে। প্রকল্প অনুমোদন, কাজের মান যাচাই, বিল ছাড় এবং তদারকির প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল নজরদারি ও স্বাধীন অডিট নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। মাঠপর্যায়ে কাজের প্রকৃত অগ্রগতি ও নথিতে দেখানো অগ্রগতির মধ্যে পার্থক্য থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব ও দায়িত্বকালীন সিদ্ধান্তগুলোও নিয়মিত পর্যালোচনার আওতায় আনা উচিত বলে মনে করছেন তারা।
মো. ফিরোজ আলম তালুকদারকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে এখনো পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তদন্ত হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ের অসন্তোষ, প্রকল্প বাস্তবায়নের অসঙ্গতি এবং প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য মিলিয়ে বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে মনে করছেন, প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর আর্থিক ও কারিগরি অডিট করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়, তবে এলজিইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো উন্নয়ন সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে কোনো প্রকল্পে অনিয়ম হলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়। স্থানীয়রা বলছেন, উন্নয়নের নামে বরাদ্দ অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কখনোই সম্ভব হবে না।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি রয়েছে— অভিযোগগুলোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর। সরকারি তদন্ত, আর্থিক অডিট কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা— যাই নেওয়া হোক না কেন, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অনিয়ম ও অপচয়ের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















