মেহেরপুর জেলার তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক। এ ব্যাংকে মেহেরপুর সদর উপজেলা, গাংনী উপজেলা, এবং মুজিবনগর উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে। তাছাড়া তিনটি উপজেলাতেই তিনটি উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক রয়েছে।
এই তিন উপজেলা ব্যাংকের প্রধান হিসেবে একটি জেলা কার্যালয় কাজ করছে। যার প্রধান কর্মকর্তা হচ্ছেন ডি ও সাইফুল ইসলাম। এখান থেকেই শুরু হয়ে গেছে দুর্নীতির এক রকম আতর ঘর বানিয়ে রেখেছেন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম। জানাগেছে, মেহেরপুর সদর উপজেলা সহ মোট দুই উপজেলায় ৫২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। ঘটনাটি ২০১৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ঘটে, যখন তৎকালীন আওয়ামী লীগের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিজেদেরকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতিতে একক অধিপত্য প্রবাহিত করেন।
তার দুর্নীতিগুলি এতটাই লাগামহীন ছিল যে, যদি অফিসের কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতো, তখনই শুরু হতো অমানবিক নির্যাতন। তার নির্যাতন ও নিপীড়নে অনেক ক্ষেত্রের মাঠ সহকারীরা আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা করে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। একটি পর্যায়ে, প্রতিবেদকের বিরতিহীন অনুসরণে পরিচয় হয় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক সদর উপজেলার একজন মাঠ সহকারী সাইদুর রহমানের সাথে। আলাপচারিতার সময়, তিনি প্রতিবেদকের সামনে গাছের সাথে দড়ি দিয়ে গলায় ফাঁসি দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। প্রতিবেদক ও তার সহকর্মীদের প্রচেষ্টায় সাইদুর রহমানকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরানো হয়।
সাইদুর রহমানের বক্তব্যের মাধ্যমে জানা যায়, ২০২১ সালের শুরুর দিকে সদর উপজেলার একজন নারী মাঠ সহকারীর প্রতি ডি ও সাইফুল ইসলামের অসাধু আচরণের প্রতিবাদ করার পর থেকেই তার ওপর মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। হঠাৎ করেই খানিকটা কারণ ছাড়াই সাইফুল ইসলাম সাইদুর রহমানকে ডেকে তার দায়ীত্বরতা ইউনিয়নের সকল সদস্যদের সদস্য বই হাজির করার জন্য বলেন। অতঃপর সাইদুর রহমানকে না জানিয়ে ওই ইউনিয়নের সকল সদস্যদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ডি ও সাইফুল ইসলাম চেষ্টা করতে থাকেন, যাতে সমাজের নিকৃষ্টতম মানুষ প্রমাণ করা যায়।
বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়ে সকল সদস্যের সামনে সাইদুর রহমানকে বেইজ্জতি করা হয়, যা সাইদুর রহমানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে অবশেষে স্ট্রোকে পরিণত হয়। জানা যায়, দীর্ঘ ৯ বছর ধরে এই মেহেরপুর জেলাতে কাজ করছেন, এর মধ্যে কখনো তিনি শাখার দায়িত্বে, কখনো জেলার দায়িত্বে রয়েছেন। আজ পর্যন্ত, সেনা কর্তৃপক্ষ থেকে জানা গেছে, এটি একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা এবং এটা বিশেষায়িত ব্যাংক নয়। সরকার ৫১% এবং সমিতির সদস্যগণ ৪৯% মালিক। কিন্তু জেলা ব্যাপী অনুসন্ধানে জানা যায়, সাইফুল ইসলাম সবাইকে বলে যাচ্ছিল যে এটি রাজস্ব ব্যাংক এবং তিনি এক রাজস্ব কর্মকর্তা।
সাইফুল ইসলাম নিজেকে যুবলীগের নেতা দাবি করে সাবেক জন প্রশাসন মন্ত্রীর সহচর ছিলেন। তিনি ৩০ হাজার ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেকে নেতৃত্বের জায়গায় প্রমাণ করতে চাইতেন। মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের ঢোলমারি গ্রামের একজন দিনমজুরের সন্তানের জন্ম নেয়া সাইফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে সেখানে আসেন। তবে দুর্নীতির মাধ্যমে আজ তিনি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে উঠেছেন। মেহেরপুর জেলার তিন উপজেলায়, প্রায় ৪২ জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে বিভিন্ন সময়ে বদলি হুমকি ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে, বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, এই খাত থেকে অন্তত ত্রিশ লক্ষ টাকা অবৈধভাবে গ্রহণ করেছেন।
তিনি কর্মকর্তা হিসেবে হাউজ লোন ও পার্সোনাল লোন সহ অনেক সুবিধার মাধ্যমে অন্তত ২০ লক্ষ টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন। যথাস্থানীয় তদন্ত কমিটিতে জেলা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়, তিনি অন্য জেলার অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত কাজে নিয়োজিত থাকতেন। সেখানে তিনি নগদে উৎকোচ গ্রহণ করেছেন ১০ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। গ্রাহক তথ্য অনুসন্ধানে অবৈধভাবে ২ কোটি টাকা অর্জন করার তথ্য পাওয়া যায়। তিন উপজেলায় ভূয়া লোন সৃষ্টি করে কোটি কোটি টাকা তসরুফ করেছেন, যেখানে অন্তত এক কোটি টাকার অবৈধ লাভ হয়েছে।
এছাড়া, জেলার অফিসের নতুন ভবন নির্মাণে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ভবন নির্মাণের মাধ্যমে ১০ লক্ষ টাকা অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে। আরো লোমহর্ষ ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে, যখন তিনি মেহেরপুর সদর শাখার শাখা ব্যবস্থাপক ছিলেন, অফিসের সাধারণ মাঠ সহকারীরা অফিসে টাকা জমা দেওয়ার পরে, প্রতিদিন ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ টাকা করে রিভার্স করে, এর ফলে অন্তত ১ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন।
এ বিষয়ে জেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ডি ও সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে, তিনি প্রথমে অভিযোগগুলির একটি অংশ স্বীকার করেন এবং প্রতিবেদককে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। প্রতিবেদক যখন ম্যানেজ হয়নি, তখন তিনি মেহেরপুরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের মাধ্যমে প্রতিবেদককে হয়রানি করার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে মেহেপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানার বাবলু সূত্রধর বলেন, “আমি সদ্য এই সদর উপজেলাতে যোগদান করেছি। ইতিমধ্যে, সাবেক একজন মাঠ সহকারী আমাকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। উক্ত অভিযোগগুলি তদন্ত সাপেক্ষে যদি প্রমাণিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















