ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের চাঁদপুরা গ্রামে বড় ভাইয়ের টিনের ঘরের একপাশে পলিথিন ও খেজুর পাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি ঝুপড়িতে স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তান নিয়ে বসবাস করছেন দিনমজুর নির্মল বেপারী (৪৫)। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই ঝুপড়ির ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে, ভিজে যায় বিছানা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এভাবে পরিবারটি প্রতিনিয়ত অনিরাপদ ও মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মোর্শেদ খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের বেপারী বাড়িতে বড় ভাই স্বপন বেপারীর টিনের ঘরের গা ঘেঁষে ছোট একটি অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করে সেখানে বসবাস করছেন নির্মল। মূল ঘরের বাইরে আলাদা করে কোনো মজবুত স্থাপনা নেই। বাঁশ, খেজুর পাতা ও পলিথিন দিয়ে ঘেরা ওই অংশটিই তার পরিবারের একমাত্র আশ্রয়স্থল। নির্মলের পরিবারে রয়েছেন তার স্ত্রী, পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মধুমিতা এবং ৯ মাস বয়সী কন্যা নন্দিনী।
ঘরটির দেয়াল আংশিক বাঁশ দিয়ে তৈরি, তার ওপর পলিথিন টানানো। ছাউনিতে ব্যবহার করা হয়েছে খেজুর পাতা ও পুরোনো ভাঙা কিছু প্লাস্টিক। মেঝে কাঁচা হওয়ায় বৃষ্টি হলেই পানি জমে কাদায় পরিণত হয়। পর্যাপ্ত ভালো টিন না থাকায় অনেক সময় বৃষ্টির পানি সরাসরি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফলে রান্না, ঘুমানোসহ দৈনন্দিন সব কাজই বেশ কঠিন হয়ে ওঠে নির্মলের পরিবারের জন্য।
ঝুপড়ি ঘরটির ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে সীমিত জায়গার মধ্যে গাদাগাদি করে রাখা সংসারের সবকিছু। এক কোণে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলছে কাপড়চোপড়, নিচে মাটির ওপর পাতা পুরোনো চট ও ছেঁড়া মাদরে তাদের শোবার ব্যবস্থা। মাথার ওপরের পলিথিনের ছাউনিতে অসংখ্য ছিদ্র, যেখান দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি চুঁইয়ে পড়ে। বৃষ্টির সময় সেই পানি এড়াতে বিভিন্ন জায়গায় হাঁড়ি-পাতিল রেখে তা ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। বাতাস ঢোকার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় গরমের সময় ঘরের ভেতর দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি হয়, আবার বৃষ্টিতে চারপাশ ভিজে গিয়ে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। পুরো ঘরটিতে নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বসবাসের ন্যূনতম সুযোগও নেই।
স্থানীয়রা জানান, সামান্য বাতাস বা ঝড় হলেই ঘরের পলিথিন উড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে করে রাতে পরিবারটি চরম আতঙ্কে দিন কাটায়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম এলেই তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
নির্মল বেপারী জানান, কয়েক বছর আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে খড়ের গাদার ওপর থেকে পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান। সেই ঘটনার পর থেকে তিনি ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। আগে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালালেও এখন সেই সক্ষমতা হারিয়েছেন। বর্তমানে বসে বসে কৃষকদের জন্য বাঁশ দিয়ে সাজি তৈরি করেন। সেগুলো বিক্রি করে যে অল্প আয় হয়, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভাইয়ের ঘরের পাশে একটু জায়গা পাইছি। সেখানে পলিথিন দিয়ে কোনো রকমের থাকি। একটি মজবুত ও ভালো করে থাকার জন্য ঘর তৈরি করার সামর্থ্য নাই। বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে, বাচ্চাদের নিয়ে থাকা খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বসে রাত কাটাতে হয়। বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়লে বিছানা, কাপড় ও শিশুর ব্যবহার্য জিনিসপত্র ভিজে যায়। শুকনো জায়গা না থাকায় শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় পরিবারটিকে।
পরিবার সূত্রে আরও জানা যায়, নির্মলের বাবা নিশিকান্ত বেপারী অনেক আগেই মারা গেছেন। বড় ভাই স্বপন বেপারী নিজস্ব টিনের ঘরে বসবাস করলেও জায়গার স্বল্পতার কারণে নির্মলকে আলাদা করে একটি স্থায়ী ঘর করে দিতে পারেননি। ফলে তার ঘরের একপাশে পলিথিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন নির্মল। অন্যদিকে নির্মলের ছোট বোন শোভা বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকছেন।
প্রতিবেশী মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, “স্বপন বেপারীর টিনের ঘরের পাশে যে অংশে নির্মল থাকে, সেটা আসলে থাকার মতো না। বৃষ্টি নামলেই পানি ঢুকে যায়। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে আছে পরিবারটি।”
পূর্ব কূলকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “এই পরিবারটি মানবেতর জীবন যাপন করছে। যারা স্বচ্ছল আছে তাদের সহযোগিতা করা উচিত। ভাইয়ের ঘরের পাশে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বসবাস করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একটি সরকারি আবাসনের ঘর পেলেও তারা স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী জামাল হোসেন বলেন, নির্মল বেপারীর মতো অসচ্ছল পরিবার এলাকায় আরও কিছু কিছু থাকলেও তার অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। কারণ তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় নিয়মিত কাজ করতে পারেন না, ফলে আয়ও সীমিত। এতে করে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও ঠিকভাবে পূরণ করা সম্ভব হয় না।
৭নং পোনাবালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য খালিদ হাসান বাদল বলেন, নির্মল বেপারীর বর্তমান ঘরটি বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য। আমরা বিষয়টি তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করছি। সরকারি সহায়তা পেলে তাকে একটি নিরাপদ ঘর করে দেওয়া সম্ভব হবে।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেগুফতা মেহনাজ বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রতিনিধি 





















