ঢাকা ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিআরডিবির মাঠ সংগঠক সাইদুরের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনবিআর কর কমিশনার রাকিবের বিরুদ্ধে ৩২৪ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ দুদকের মামলার পরও বহাল এএসপি, জানেন না এসপি-ডিআইজি মুকসুদপুরে দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্ত এলজিইডির সাবেক প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের পরিবারের নামে ১৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ দুবাইয়ে এইচবিএম ইকবালের ৭ বিলাসবহুল সম্পত্তি নিয়ে এনবিআরের অনুসন্ধান বরগুনার বেতাগীতে সেই শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা, যুবককে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন পাঁচ ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন বড়লেখায় সিন্ডিকেট ভাঙায় হাকালুকির ‘হাওরখাল’ বিল পুনঃনিলামে, রাজস্ব বাড়ল ৩৮ লাখ

নাম-যশ-খ্যাতি টানেনি ভাষা সৈনিক ড. জসিম উদ্দিনকে

  • মোঃ খোরশেদ আলম
  • আপডেট সময় ০২:১৭:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২
  • ১০০০ বার পড়া হয়েছে

নীরবে-নিভৃতে বর্ণাঢ্য জীবন, সংগ্রামী জীবনের অস্তিত্ব ও আভিজাত্য রেখে শেষ নিঃশ্বাস ছেড়ে পরলোকগমন করেছেন এই মহান, মেধাবী ও গুণীজন। গত বুধবার বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যাংককের হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার কৃতি সন্তান, উজ্জ্বল নক্ষত্র, আন্তর্জাতিক পরমাণু বিজ্ঞানী, ভাষা সৈনিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত জাতিসংঘের আণবিক শক্তি কমিশনের কর্মকর্তা ড. জসিম উদ্দিন আহমেদ।

আমাদের বাংলাদেশের সন্তান। বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে যে বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলন। সেই ৫২’র ভাষা আন্দোলনের ভাষা সৈনিক তিনি। সেলুলয়েডের ফিতায় কিংবা আলোক উজ্জ্বল লাইট ক্যামেরায় বা সংবাদপত্রের পাতায় খুব বড়সড়ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এই মানুষটার অর্জন, সাহসের গল্প, বীরত্বের কাহিনী। আজ আমরা যে ভাষায় কথা বলি এই গৌরবময় ভাষার আন্দোলনের জন্য তিনি ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ফ্রন্ট লাইন সংগ্রামে বাংলা ভাষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধ করেন। ভাষা আন্দোলনের কথা আলোচনায় আসলেই সবার প্রথম ভেসে আসে যে কয়টা নাম, তাদের মধ্যে অন্যতম হল সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ প্রমুখ।

৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পিচঢালা পথে একটা মিছিল এগিয়ে আসলো। যে মিছিল বহন করে নিয়ে আসছিল এক একটা বর্ণমালা। বর্ণমালার মিছিল। বাংলা ভাষার নবজন্ম। ১৪৪ ধারা ভেঙে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে অংকিত মানচিত্রে একটা দলিল “বাংলা ভাষা”।

স্লোগান মুখর মিছিলে চালানো হল গুলি, লুটিয়ে পড়লো মিছিলের অগ্রগামী তরুণের দল। রাজপথ রক্তস্নাত। আবুল বরকত যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়। আবুল বরকতের সাথে ফ্রন্ট লাইনে বাম পাশের মানুষটাই ছিল এই ভাষা সৈনিক জসিম উদ্দিন আহমেদ।

আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলে ড. জসিম উদ্দিন ত্বরিত গতিতে বরকতের রক্তাক্ত দেহ কোলে নেন। প্রাণপণে চেষ্টা করেন বরকতকে প্রাণে বাঁচাতে! ভাষার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে লড়াই করে যাওয়া বীর ভাষা সৈনিক জসিম উদ্দিন সবসময়ই থেকেছেন নাম-যশ-খ্যাতি অর্জন থেকে দূরে। কাজকে ভালোবেসে, নিজের মেধা কাজে লাগিয়ে জ্ঞানার্জন করেছেন, বিশ্ববাসীর জন্য সেই জ্ঞান এর বহিঃপ্রকাশ করেছেন কর্মে।

১৯৩১ সালের ১০ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গলিয়ারচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ড. জসিম উদ্দিন আহমেদ। তাঁর পিতা মরহুম ওয়াজ উদ্দিন আহমেদ এবং মাতা রাহাতুন্নেছা। ড. জসিম উদ্দিন আহমেদ ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি এবং ১৯৫৫ সালে পর্দাথ বিদ্যায় এম.এস.সি ডিগ্রি লাভ করেন। ফিজিক্সের মত কঠিন একটা বিষয়কে খুব সহজে ধারণ করে নেন মস্তিষ্কের নিউরন সেলে।

১৯৫৬ সালে ঢাকা সরকারি কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৫৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। আনবিক শক্তি কমিশনের সাথে সাথেই আমেরিকা চলে যান উচ্চশিক্ষার জন্য। ১৯৫৯ সালে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে আণবিক বিকিরণ নিরাপত্তা বিষয়ে এমএসএস ডিগ্রি তারপর পাকিস্তানে ফেরত এসে করাচীর পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশন ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন।

বাংলাদেশ তখনো স্বাধীন হয়ে উঠেনি। পাকিস্তানি শাসকের হাতে কব্জা বাংলাদেশ। সেইসময় তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকায় বদলি হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্র স্থাপন করার দায়িত্ব পালন করেন। নিষ্ঠার সাথে ২ বছর কাজ শেষ করে তিনি ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে পি. এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব মিসিগানে চলে যান এবং ১৯৬৬ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানে ফেরত এসে ঢাকা আণবিক শক্তি কেন্দ্রে আণবিক বিকিরণ বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ দেন।

১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার স্পন্সরশিপে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি এজেন্সি ভিয়েনাতে যোগ দেন। দীর্ঘ ২৪ বছর চাকরি করেন এবং আণবিক বিকিরণ নিরাপত্তা বিভাগের ডাইরেক্টর এবং প্রধান থাকাকালীন ১৯৯৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এই ২৪টা বছর তিনি বিশ্ববাসীকে নিউক্লিয়ার রিলেটেড সার্ভিস দিয়েছেন। বিষয়টা কতখানি গর্বের, কত বড় অর্জন, কত সম্মানের এটা ঘূর্ণাক্ষরেও আমরা ধারণা করতে পারছি না! পাশের দেশ ইন্ডিয়ার কিংবা মার্কিনমুলুক এর কেউ হলে এই গুণী মানুষের জীবন নিয়ে বায়োগ্রাফি হত, সিনেমা হত, সিরিজ হত! পরবর্তী জেনারেশনকে জানানোর জন্য যে বাংলাদেশ এর একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ কিভাবে নিউক্লিয়ার এনার্জির সর্বোচ্চ স্তরে কাজ করেছেন। ৪০টি দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি আণবিক বিকিরণ নিরাপত্তা বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ডস, কোডস, গাইডস এবং টেকনিক্যাল রিপোর্ট নিয়মাবলি, নীতি, উপদেশবলী বিষয়ক ১৭টি বই প্রস্তুত করেন, যা বিশ্বের প্রায় সব দেশে ব্যবহৃত হয়।

ধর্মপ্রাণ এই মানুষটা ভিয়েনায় মসজিদ নির্মাণে সহায়তাসহ জাতিসংঘ বিল্ডিং-এ জুম্মার নামাজের ব্যবস্থা করেন এবং প্রায় ১২ বছর সেখানে জুম্মার খুতবা দেন। বিজ্ঞান নিয়ে যতখানি জানাশোনা ও দখল- একই রকম ধর্ম নিয়েও। তিনি পবিত্র কোরআনের বিজ্ঞান বিষয়ে এবং ধর্মের উপর তুলনামূলক গবেষণা করেন এবং বহু বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্বন্ধে দেশে-বিদেশে ৪৬টি বিষয়ের উপর বক্তৃতা করেন।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক প্রদান করেন। এই মহান ভাষা সৈনিক এর বক্তব্য থেকে নেওয়া অংশ, “বাংলা ভাষা-মায়ের ভাষার জন্য আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলাম। আমার সহ-সৈনিক কেউ কেউ শহীদ হয়েছেন। ওইসময় আমরা জয়ী হয়েছি। কিন্তু আজ যখন দেখি ভাষার প্রতি অবহেলা তখন সত্যি সত্যি-ই আমি ব্যথীত হই। আমরা চাই, দেশের সর্বত্র যথাযথ বাংলা ভাষার ব্যবহার হউক।”

৯১ বছর বয়সে এই মহান মানুষটা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। মানুষ তার জীবনের চেয়ে বড়, কর্ম মানুষকে বড় করে তোলে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, রোজ রবিবার, বাদ জোহর গুলশান আজাদ মসজিদে উনার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। যে মহান, বীর ভাষা সৈনিক ভাষার জন্য দাঁড়িয়েছিল বুলেটের বিপরীতে। তাঁর শেষ বিদায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার করে সব সম্প্রদায়ের নিকট থেকেই তিনি একটা ফুলেল শ্রদ্ধা, ভক্তি প্রাপ্য। এই বীর ভাষা সৈনিককে তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

      লেখক : মোঃ খোরশেদ আলম

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিআরডিবির মাঠ সংগঠক সাইদুরের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

নাম-যশ-খ্যাতি টানেনি ভাষা সৈনিক ড. জসিম উদ্দিনকে

আপডেট সময় ০২:১৭:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

নীরবে-নিভৃতে বর্ণাঢ্য জীবন, সংগ্রামী জীবনের অস্তিত্ব ও আভিজাত্য রেখে শেষ নিঃশ্বাস ছেড়ে পরলোকগমন করেছেন এই মহান, মেধাবী ও গুণীজন। গত বুধবার বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যাংককের হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার কৃতি সন্তান, উজ্জ্বল নক্ষত্র, আন্তর্জাতিক পরমাণু বিজ্ঞানী, ভাষা সৈনিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত জাতিসংঘের আণবিক শক্তি কমিশনের কর্মকর্তা ড. জসিম উদ্দিন আহমেদ।

আমাদের বাংলাদেশের সন্তান। বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে যে বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলন। সেই ৫২’র ভাষা আন্দোলনের ভাষা সৈনিক তিনি। সেলুলয়েডের ফিতায় কিংবা আলোক উজ্জ্বল লাইট ক্যামেরায় বা সংবাদপত্রের পাতায় খুব বড়সড়ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এই মানুষটার অর্জন, সাহসের গল্প, বীরত্বের কাহিনী। আজ আমরা যে ভাষায় কথা বলি এই গৌরবময় ভাষার আন্দোলনের জন্য তিনি ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ফ্রন্ট লাইন সংগ্রামে বাংলা ভাষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধ করেন। ভাষা আন্দোলনের কথা আলোচনায় আসলেই সবার প্রথম ভেসে আসে যে কয়টা নাম, তাদের মধ্যে অন্যতম হল সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ প্রমুখ।

৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পিচঢালা পথে একটা মিছিল এগিয়ে আসলো। যে মিছিল বহন করে নিয়ে আসছিল এক একটা বর্ণমালা। বর্ণমালার মিছিল। বাংলা ভাষার নবজন্ম। ১৪৪ ধারা ভেঙে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে অংকিত মানচিত্রে একটা দলিল “বাংলা ভাষা”।

স্লোগান মুখর মিছিলে চালানো হল গুলি, লুটিয়ে পড়লো মিছিলের অগ্রগামী তরুণের দল। রাজপথ রক্তস্নাত। আবুল বরকত যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়। আবুল বরকতের সাথে ফ্রন্ট লাইনে বাম পাশের মানুষটাই ছিল এই ভাষা সৈনিক জসিম উদ্দিন আহমেদ।

আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলে ড. জসিম উদ্দিন ত্বরিত গতিতে বরকতের রক্তাক্ত দেহ কোলে নেন। প্রাণপণে চেষ্টা করেন বরকতকে প্রাণে বাঁচাতে! ভাষার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে লড়াই করে যাওয়া বীর ভাষা সৈনিক জসিম উদ্দিন সবসময়ই থেকেছেন নাম-যশ-খ্যাতি অর্জন থেকে দূরে। কাজকে ভালোবেসে, নিজের মেধা কাজে লাগিয়ে জ্ঞানার্জন করেছেন, বিশ্ববাসীর জন্য সেই জ্ঞান এর বহিঃপ্রকাশ করেছেন কর্মে।

১৯৩১ সালের ১০ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গলিয়ারচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ড. জসিম উদ্দিন আহমেদ। তাঁর পিতা মরহুম ওয়াজ উদ্দিন আহমেদ এবং মাতা রাহাতুন্নেছা। ড. জসিম উদ্দিন আহমেদ ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি এবং ১৯৫৫ সালে পর্দাথ বিদ্যায় এম.এস.সি ডিগ্রি লাভ করেন। ফিজিক্সের মত কঠিন একটা বিষয়কে খুব সহজে ধারণ করে নেন মস্তিষ্কের নিউরন সেলে।

১৯৫৬ সালে ঢাকা সরকারি কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৫৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। আনবিক শক্তি কমিশনের সাথে সাথেই আমেরিকা চলে যান উচ্চশিক্ষার জন্য। ১৯৫৯ সালে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে আণবিক বিকিরণ নিরাপত্তা বিষয়ে এমএসএস ডিগ্রি তারপর পাকিস্তানে ফেরত এসে করাচীর পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশন ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন।

বাংলাদেশ তখনো স্বাধীন হয়ে উঠেনি। পাকিস্তানি শাসকের হাতে কব্জা বাংলাদেশ। সেইসময় তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকায় বদলি হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্র স্থাপন করার দায়িত্ব পালন করেন। নিষ্ঠার সাথে ২ বছর কাজ শেষ করে তিনি ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে পি. এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব মিসিগানে চলে যান এবং ১৯৬৬ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানে ফেরত এসে ঢাকা আণবিক শক্তি কেন্দ্রে আণবিক বিকিরণ বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ দেন।

১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার স্পন্সরশিপে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি এজেন্সি ভিয়েনাতে যোগ দেন। দীর্ঘ ২৪ বছর চাকরি করেন এবং আণবিক বিকিরণ নিরাপত্তা বিভাগের ডাইরেক্টর এবং প্রধান থাকাকালীন ১৯৯৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এই ২৪টা বছর তিনি বিশ্ববাসীকে নিউক্লিয়ার রিলেটেড সার্ভিস দিয়েছেন। বিষয়টা কতখানি গর্বের, কত বড় অর্জন, কত সম্মানের এটা ঘূর্ণাক্ষরেও আমরা ধারণা করতে পারছি না! পাশের দেশ ইন্ডিয়ার কিংবা মার্কিনমুলুক এর কেউ হলে এই গুণী মানুষের জীবন নিয়ে বায়োগ্রাফি হত, সিনেমা হত, সিরিজ হত! পরবর্তী জেনারেশনকে জানানোর জন্য যে বাংলাদেশ এর একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ কিভাবে নিউক্লিয়ার এনার্জির সর্বোচ্চ স্তরে কাজ করেছেন। ৪০টি দেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি আণবিক বিকিরণ নিরাপত্তা বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ডস, কোডস, গাইডস এবং টেকনিক্যাল রিপোর্ট নিয়মাবলি, নীতি, উপদেশবলী বিষয়ক ১৭টি বই প্রস্তুত করেন, যা বিশ্বের প্রায় সব দেশে ব্যবহৃত হয়।

ধর্মপ্রাণ এই মানুষটা ভিয়েনায় মসজিদ নির্মাণে সহায়তাসহ জাতিসংঘ বিল্ডিং-এ জুম্মার নামাজের ব্যবস্থা করেন এবং প্রায় ১২ বছর সেখানে জুম্মার খুতবা দেন। বিজ্ঞান নিয়ে যতখানি জানাশোনা ও দখল- একই রকম ধর্ম নিয়েও। তিনি পবিত্র কোরআনের বিজ্ঞান বিষয়ে এবং ধর্মের উপর তুলনামূলক গবেষণা করেন এবং বহু বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্বন্ধে দেশে-বিদেশে ৪৬টি বিষয়ের উপর বক্তৃতা করেন।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক প্রদান করেন। এই মহান ভাষা সৈনিক এর বক্তব্য থেকে নেওয়া অংশ, “বাংলা ভাষা-মায়ের ভাষার জন্য আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলাম। আমার সহ-সৈনিক কেউ কেউ শহীদ হয়েছেন। ওইসময় আমরা জয়ী হয়েছি। কিন্তু আজ যখন দেখি ভাষার প্রতি অবহেলা তখন সত্যি সত্যি-ই আমি ব্যথীত হই। আমরা চাই, দেশের সর্বত্র যথাযথ বাংলা ভাষার ব্যবহার হউক।”

৯১ বছর বয়সে এই মহান মানুষটা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। মানুষ তার জীবনের চেয়ে বড়, কর্ম মানুষকে বড় করে তোলে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, রোজ রবিবার, বাদ জোহর গুলশান আজাদ মসজিদে উনার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। যে মহান, বীর ভাষা সৈনিক ভাষার জন্য দাঁড়িয়েছিল বুলেটের বিপরীতে। তাঁর শেষ বিদায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার করে সব সম্প্রদায়ের নিকট থেকেই তিনি একটা ফুলেল শ্রদ্ধা, ভক্তি প্রাপ্য। এই বীর ভাষা সৈনিককে তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

      লেখক : মোঃ খোরশেদ আলম

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ।