নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নাওড়া এলাকায় গ্রীন টেলিভিশনের অনুসন্ধান ইউনিটের ওপর ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের দাবি, হামলার পেছনে সরাসরি অবস্থানরত ছিলেন শরিয়ত উল্লাহ, যিনি ওই এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য পরিচিত। তিনি হামলাকারী দলের নেতৃত্ব দেন এবং তার পেছনে ছিলেন নাওড়া এলাকার প্রখ্যাত মাদক সম্রাট খাড়া মোশারফ। হামলার সময় গ্রীন টিভির ক্যামেরাম্যানকে মারধর করা হয়, তার ক্যামেরা ইউনিট ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং সংবাদ সংগ্রহের ভিডিও ফুটেজ ডিলিট করা হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক এবং প্রশাসনিক অমুল্যতার অভিযোগও উঠে এসেছে।
ভয়ঙ্কর এই ঘটনার তথ্য পাওয়ার পর গ্রীন টিভির অনুসন্ধান দল দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। সংবাদকর্মীরা জানান, বাড়ি নম্বর ৬৮/১, নাওড়া মডেল একাডেমির ভেতরে হামলার প্রস্তুতি চলছিল। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই ভবনটি পরিচিত, ভেতরের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদল সশস্ত্র ব্যক্তি ভেতরে অবস্থান নিয়েছিল, যারা হামলার আগে পরিকল্পনা করছিল। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রীন টিভির দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মুখোমুখি হয়।
ক্যামেরাম্যান সরিয়তুল্লাহ্ ঘটনার বর্ণনা দেন, “ভেতরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী অবস্থান করলেও বাইরে দু’জন পাহারাদার ছিল। আমাদের ক্যামেরা দেখেই তারা রুষ্ট হয়। প্রথমে তারা আমাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু করে, এরপর ভেতরে থাকা সন্ত্রাসীরা বাইরে বেরিয়ে আসে।”
সংবাদ সংগ্রহকালে, পুলিশের চোখের সামনেও হামলা চালানো হয়। গ্রীন নিউজের ক্যামেরাম্যানকে ধাক্কা দিয়ে মারধর করা হয়, ক্যামেরা ইউনিট ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলা হয়। হামলার নেতৃত্ব দেন স্থানীয় সন্ত্রাসী শরিয়ত উল্লাহ্। তাকে পেছন থেকে পরিচালনা করেন খাড়া মোশারফ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নাওড়া এলাকায় সন্ত্রাস, মাদক এবং ভূমিদস্যুতার জন্য পরিচিত।
ঘটনার সূত্রপাত ২৮ মার্চের একটি প্রতিবেদনের সঙ্গে জড়িত। ওই দিন গ্রীন নিউজ মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে এক সংবাদ প্রকাশ করে, যেখানে তার মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের তথ্য উঠে আসে। এই সংবাদ প্রকাশের পর, গ্রীন নিউজের একটি অনুসন্ধান দল ফলোআপ খবর সংগ্রহের জন্য আবারও নাওড়া এলাকায় উপস্থিত হয়। সেখানেই মোশারফের সন্ত্রাসী গ্রুপ হঠাৎ করেই হামলা চালায়।
হামলার সময় শরিয়ত উল্লাহ ও তার নেতৃত্বাধীন ১৪–১৫ জনের দল ক্যামেরাম্যানের ওপর আকস্মিকভাবে হামলা চালায়। তাদের হাতে থাকা ক্যামেরা এবং আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয় জনতা এবং পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। রূপগঞ্জ থানার এসআই মফিজুলের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজের উপস্থিতি অস্বীকার করেন।
গ্রীন টিভি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে রূপগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন জানান, ঘটনার তদন্ত শেষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ধীর এবং এই ধরণের হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
ঘটনার পেছনের কাহিনী আরও গভীর। খাড়া মোশারফের বিরুদ্ধে শুধু মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ নয়, তার বিরুদ্ধে রয়েছে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও। আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন অনেকে যারা তার অনিয়ন্ত্রিত যৌন নির্যাতনের শিকার। এছাড়া, তিনি একটি হিন্দু পরিবারকে মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্ট দিয়ে তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি দখল করেছেন। ক্যামেরার সামনে সাক্ষ্য দিতে না চাইলেও স্থানীয়রা আমাদের কাছে জানিয়েছেন, মোশারফের বাহিনী কীভাবে বাড়ির আঙিনায় সীমানা প্রাচীর তৈরি করে সম্পূর্ণ দখল করেছে।
স্থানীয়রা জানান, মোশারফের সন্ত্রাসী গ্রুপের ভয়ে কেউ খোলাখুলি মুখ খুলতে চায় না। পরিচয় গোপন রেখে আমাদের সঙ্গে কথা বলেন বেশ কয়েকজন। স্থানীয়দের মতে, একসময় খাড়া মোশার রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তবে সম্প্রতি তিনি বিএনপির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছেন। এই পরিবর্তনের পর প্রশাসন তার কার্যকলাপে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। ফলে, তার দল আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মোশারফের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে দুদককে অনুসন্ধান করতে হবে। তারা চায়, নাওড়া ও কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাধারণ মানুষকে তার ভূমিদস্যুতা, মাদক, নারী নির্যাতন এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের কবল থেকে মুক্ত করা হোক। স্থানীয়রা বারবার বলেছেন, খাড়া মোশারফকে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা উচিত।
ঘটনার পরপরই, স্থানীয়রা ও সাংবাদিকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ ও ঘটনার বিবরণ প্রচার করেছেন। এই ঘটনার পর নাওড়া এলাকায় সাংবাদিকরা ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে কাজ করছেন। গ্রীন টিভি জানায়, তারা এই হামলার তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তুলে ধরবে যাতে নাওড়া এলাকায় এমন সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ হয়।
মোশারফ ও তার গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্থানীয় মানুষের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, ভূমি দখল, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং নারী নির্যাতন। অনেক সাক্ষী জানিয়েছেন, তারা মোশারফের উপস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে ভয় পান। এমনকি উচ্চস্বরে কথা বললেও পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন।

হামলার সময় ব্যবহৃত অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কৌশল স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিতরে অবস্থানরত সন্ত্রাসীরা দমনের জন্য প্রস্তুত ছিল। ক্যামেরাম্যান ও সাংবাদিকরা বলছেন, হামলার পরিকল্পনা সুপরিকল্পিত ছিল। তারা হামলার সময় যথাযথ সুরক্ষা পাননি, ফলে এটি এক ধরনের নাশকতার ঘটনা।
স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা এবং পুলিশি উপস্থিতির অস্বীকার অভিযোগ স্থানীয়দের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি সক্রিয় ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর হামলার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ঘটনার পর, গ্রীন টিভি দল পুনরায় নাওড়া এলাকায় সংবাদ সংগ্রহে গিয়েছিল, তবে তারা আরও সতর্ক। তারা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং মোশারফের অপরাধের সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছেন। স্থানীয়রা বলেছেন, “আমরা চাই মোশারফকে আইনের আওতায় আনা হোক। আমরা আর তার ভয় দেখানোর শিকার হতে চাই না।”
মোশারফের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ একমাত্র গ্রীন টিভি রিপোর্টে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, বহুবার তিনি সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছেন। অনেকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তার অপরাধমূলক কার্যক্রম প্রকাশ করার চেষ্টা করেছে, তবে তার দমনাত্মক আচরণের কারণে অনেকেই মুখ বন্ধ রেখেছে।
এই ঘটনায় বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে তরুণ ও শিক্ষিত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় তৈরি করার চেষ্টা সম্পর্কে। সংবাদ অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও তার প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। নাওড়া মডেল একাডেমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও, তার অন্তর্বর্তী প্রভাব এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করছে।
স্থানীয়রা গ্রীন টিভিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন, কারণ তারা তাদের ভয়কে প্রকাশের সুযোগ দিচ্ছে। তবে তারা আশঙ্কা করছেন, মোশারফ ও তার বাহিনী আবারও হামলা চালাতে পারে। স্থানীয়দের মতে, সরকারের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং মোশারফকে গ্রেপ্তার করা।
এছাড়া, স্থানীয়রা দুদককে অনুরোধ জানিয়েছেন, মোশারফের সম্পদ ও অবৈধ ব্যবসার বিস্তারিত অনুসন্ধান করতে। কারণ তারা বিশ্বাস করেন, এই সম্পদ ও অবৈধ কার্যক্রমের কারণে মোশারফ আরও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।

গ্রীন টিভি জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার পর নাওড়া এলাকায় নিয়মিতভাবে অনুসন্ধান চালাবে। তারা জানিয়েছে, “আমরা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত করার জন্য সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখব। আমাদের লক্ষ্য, নাওড়া এলাকার মানুষ যেন আর সন্ত্রাসী গ্রুপের ভয়ে বসবাস করতে না হয়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, খাড়া মোশারফের বাহিনী বিভিন্ন সময় নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। তাদের বাড়ি দখল, মানসিক নির্যাতন ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। গ্রীন টিভির অনুসন্ধান রিপোর্টে এসব ঘটনা বিস্তারিত উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে আসে, প্রশাসন যদি দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে খাড়া মোশারফের সন্ত্রাসী কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি পাবে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, “আমরা চাই সরকারের সঙ্গে পুলিশের যৌথ পদক্ষেপ হোক। আমাদের এলাকার মানুষ যেন আর তার ভয়ে দমিত না হয়।”
এই হামলার পর, নাওড়া এলাকায় সাংবাদিকরা সতর্ক হয়ে কাজ করছেন। তারা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলছে, হামলার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করছে এবং ঘটনার সমস্ত প্রমাণ সংরক্ষণ করছে। তাদের লক্ষ্য, মোশারফ ও তার বাহিনীকে আইনের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ করা।
স্থানীয়রা আশা করছেন, নাওড়া এবং কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ যেন নিরাপদভাবে জীবনযাপন করতে পারে। তারা চাচ্ছে, খাড়া মোশারফ ও তার সন্ত্রাসী গ্রুপকে দমন করা হোক। গ্রীন টিভি জানিয়েছে, তারা এই ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করবে এবং সঠিক কর্তৃপক্ষকে দেবে।
সর্বশেষ, স্থানীয়রা ও সাংবাদিকরা একত্রিতভাবে মোশারফের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা চাচ্ছেন, রূপগঞ্জ থানার পুলিশ ও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, প্রশাসনের সক্রিয় পদক্ষেপ ছাড়া মোশারফের সন্ত্রাস থামানো সম্ভব নয়।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি 
























