চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর ছয়টি উপজেলায় বাস্তবায়িত ৫৬২ কোটি টাকার সেচ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নদী থেকে ফসলি জমিতে পানি সরবরাহের লক্ষ্যে স্থাপিত ৮৫০টি সেচ পাম্পের মধ্যে ৩৩৩টির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। অবশিষ্ট ৫১৭টির মধ্যে মাত্র ১৫০টি পাম্প চালু করা সম্ভব হয়েছে, তাও নির্ধারিত জমির তুলনায় অনেক কম এলাকায় সেচ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করে এসব পাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এমন নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।
১৭ নভেম্বর প্রতিবেদনটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের দপ্তরে দাখিল করে তদন্ত কমিটির প্রধান একই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশীদের নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যের কমিটি। প্রতিবেদনে দায়দায়িত্ব নির্ধারণসহ দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির অপর ৪ সদস্য হলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান, উপসচিব মোহাম্মদ শামসুজ্জামান (সদস্য সচিব), পাউবোর ডিজাইন সার্কেল-৪-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ মাজেদুর রহমান এবং পাউবোর ডিজাইন সার্কেল-৩-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোহাম্মদ আব্বাস আলী। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই সময় প্রকল্পের পিডি রাফিউস সাজ্জাদকে তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (চলতি দায়িত্ব) পদ থেকে তার মূল (প্রধান প্রকৌশলী) পদে ফেরত পাঠানো হয়। অথচ বিভাগীয় মামলার তদন্তে প্রকল্প পরিচালক রাফিউস সাজ্জাদসহ ফেনীর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহরিয়ারসহ ১৬ জনকে দায়মুক্তি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন পাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মোল্লা মিজানুর রহমান। মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধানের চেয়ে এক ধাপ নিচের কর্মকর্তা তিনি। তদন্ত প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের বন্যা ও ট্রান্সফরমার চুরিকে দায়ী করে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য প্রতিবেদনটি এখন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তরে আছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফেনীতে মুহুরী সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৫৩৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে ৮৫০টি সেচ পাম্প চালুর সিদ্ধান্ত হয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৫৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। ৯টি প্যাকেজে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র সম্পন্ন হয়। প্রকল্পের সুবিধাভোগী কৃষকদের কাছ থেকে জমির পারিমাণ অনুযায়ী নামমাত্র হিস্যা নিয়ে পানি সরবরাহের পরিকল্পনায় এটি চালু করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ফেনীর পাঁচটি উপজেলা এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। অনিয়ম-দুর্নীতি এবং নিম্নমানের সরঞ্জামাদি সরবরাহের কারণে এখন পর্যন্ত সেচ সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ৩ হাজার হেক্টর জমি। ২০২৪ সালের ৩০ জুন প্রকল্পটি সমাপ্ত দেখিয়ে ৫০৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা ঠিকাদারদের পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে। পরে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তদন্তে ১৬ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে।
তদন্ত কমিটির একজন সদস্য বলেন, নিম্নমানের সরঞ্জামাদি দিয়ে কোনোরকমে কিছু সেচ পাম্প চালু করা হয়। এছাড়া ৩৩৩টি সেচ পাম্পের অনুকূলে বরাদ্দ থেকে ঠিকাদারদের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক রাফিউস সাজ্জাদসহ ১৬ কর্মকর্তা অন্তত ২০০ কোটি টাকা লোপাট করেছেন। পর্যায়ক্রমে এই টাকা এডিবিকে সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে।
১২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ, দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং সার্বিক মতামতে বলা হয়, ‘এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, বর্ণিত প্রকল্পটিতে কখনোই ৮৫০টি স্কিম কমিশনিং করার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। কাগজে-কলমে বুঝে নেওয়া হয়েছে। কনসালটেন্টনির্ভর এ প্রকল্পে কনসালটেন্টরা সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন, যা নৈতিকতাবিরোধী। তাছাড়া প্রকল্পটিতে জনগণের উপকারের কথা চিন্তা করার ছিল। বাস্তবে তা হয়নি। প্রকল্প চালু না করেই সমাপ্ত রিপোর্ট দাখিল করায় বৈদেশিক অর্থের অপচয় করা হয়েছে। সরকারের কাছে অসত্য তথ্য দেওয়া ছাড়াও বহুসংখ্যক কৃষককে বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে সেচ সুবিধা দিলে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন হতো। এর সুফল থেকে দেশকে বঞ্চিত করা হয়েছে।’
মতামতে বলা হয়, ‘কাগজপত্র মোতাবেক শুধু কেনাকাটা ও প্রত্যয়নের বিষয়ে দালিলিক প্রমাণ সুস্পষ্ট। মাঠপর্যায়ের সঙ্গে বিলের প্রত্যয়ন ছাড়া প্রকল্পটির তেমন কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থাপনার জন্য ৩টি কমিটি করা হলেও তারা অনেকেই যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। প্রকল্প পরিচালকরা কনসালটেন্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বা তা করার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এমতাবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকরা, বিল প্রদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা (নির্বাহী প্রকৌশলী) এবং কনসালটেন্টকে দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। অন্যথায় জনগণের কাছে মন্ত্রণালয় তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।
অভিযোগের বিষয়ে সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘প্রাক্কলনের বাইরে নিম্নমানের ও কম থিকনেসের পানি সঞ্চালন পাইপ ব্যবহারের ফলে সহজে ভেঙে যায়। কয়েকটি স্কিমে মাটি খনন করে পাইপ চেক করার চেষ্টা করা হয়। ডিস্ট্রিবিউশন পাইপের প্রকৃত লে-আউট (বিন্যাস) না থাকায় পাইপ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিম্নমানের ইটের তৈরি ছোট আকারের এয়ারভেন্ট তৈরি করা হয়, যে কারণে পানি উপচে পড়ে। এছাড়া প্রাক্কলনের বাইরে নিম্নমানের ইট ও কনস্ট্রাকশন সামগ্রী দিয়ে পাম্পহাউজ নির্মাণ এবং নিম্নমানের ইট দিয়ে হেডার ট্যাংক নির্মাণ, নিম্নমানের ফিটিংস, ওয়্যারিং ও স্যাকশন পাইপ সংযুক্ত করা হয়।’ প্রকল্পের ঠিকাদারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের সরঞ্জামাদি সরবরাহের প্রমাণ পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণের এক স্থানে বলা হয়, ‘প্রকল্পের ঠিকাদারের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত হয়েছিল, যা নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট। প্রয়োজনে সে প্রতিবেদন অবলোকন করা যেতে পারে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একটি সেচ স্কিমও পরিপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ছিল না, যেমন : কাভারেজ এরিয়া প্রতি সেচ পাম্পের অনুকূলে ২০ হেক্টর থাকলেও বাস্তবে ৭-৮ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছায়নি। কমিটির সদস্যরা সরেজমিন ৫৯১টি সেচ স্কিম বন্ধ অবস্থায় পেয়েছেন। অস্বাভাবিক হারে ট্রান্সফরমার চুরির বিষয়টিও তুলে ধরেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।
জানা যায়, শুরু থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৪ জন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে পাউবো থেকে অবসরে গেছেন। তারা হলেন মো. শাহাবুদ্দিন, রফিকুল আলম ও রিয়াজুল আলম।
প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, রাফিউস সাজ্জাদ পিডি হিসাবে যোগদান করেই প্রকল্পটির সর্বনাশ করেন। তিনি টেন্ডার আহ্বান করে ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করেন। প্রতিটি প্যাকেজের কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করে কমিশন বাণিজ্য হাতিয়েছেন। প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছেন। কাজের অগ্রগতির চেয়ে অতিরিক্ত বিল দিয়ে কমিশন নিয়েছেন। যে সাবস্টেশন বসাতে খরচ হওয়ার কথা ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা, সেখানে ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পছন্দের ঠিকাদারকে। প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি মূল্যে জার্মানির একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়। ঠিকাদারসহ এদের ধরতে পারলে সাগরচুরির তথ্য পাওয়া যাবে।
অভিযুক্তরা কে কোথায় : বিতর্কিত প্রকল্প পরিচালক রাফিউস সাজ্জাদ ছাড়াও ১৫ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। কয়েকজন এখনো ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে কর্মরত। এছাড়া ওই সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে পাউবোর কোয়ালিটি কন্ট্রোলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাছির উদ্দিন, গঙ্গা ব্যারাজ সমীক্ষা প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কোহিনূর আলম, কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহরিয়ার, গাজীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির উদ্দিন, কুমিল্লা প্রধান প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে কর্মরত এসডিই আবুল কাশেম, কুমিল্লায় সহকারী প্রকৌশলী অলক দাস, ফেনীর সোনাগাজীর এসও আবু হাসান, মানিক মিয়াইজয়া উদ্দিন ও লুৎফুর রহমান, নোয়াখালীর এসও কামরুল হাসান, ফেনীর এসও আবু মুসা রকি এবং ফেনীর এসও আব্দুল বারী।
অনিয়ম-দুর্নীতির নথিপত্র পাননি এডিজি : প্রকল্পে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির নথিপত্র না পাওয়া নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন পাউবোর বিভাগীয় মামলার তদন্ত কমিটির প্রধান পাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মোল্লা মিজানুর রহমান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোমবার তিনি বলেন, ‘আমরা অফিশিয়ালি জানি তারা অপরাধী। কিন্তু কাগজে-কলমে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ করা যায়নি। আসলে পাইলট প্রকল্পটি ফেনীতে নেওয়াই ছিল ভুল। ওই এলাকার সঙ্গে এই প্রকল্প যায় না। আগের তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানে কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তারা শুধু লিখে গেছেন। সাপোর্টিং কাগজ নেই। এর আগেও দুবার তদন্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, সব কাগজ আমরা সংগ্রহ করেছি। কিছুই পাইনি। কিন্তু ডকুমেন্ট ছাড়া তো কিছুই করা যায় না। এলাকার লোকজন সাপোর্ট করে না। সেখানে জোর করে একটা কাজ করলে ভালো হয় নাকি? টেনিক্যাল কিছু ফল্ট (প্রযুক্তিগত সমস্যা) আছে। যেমন : বিদ্যুতের লাইন থাকার পরও প্যারালাল আরেকটা লাইন নেওয়া হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, একটা খাম্বায় ৩টি করে ট্রান্সমিটার দেওয়া হয়েছে। লোকেশনগুলো হচ্ছে রিমোট এলাকায়। মাঠ ও জঙ্গলের ভেতরে যেখানে মানুষের কোনো উপস্থিতি নেই। একেকটি স্থানে ৩/৪ বার করে ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
আপনি যা বললেন এসব কি অনিয়ম-দুর্নীতির মধ্যে পড়ে না-প্রশ্ন করা হলে মিজানুর রহমান বলেন, ‘চুরি হলে উনি (পিডি) কী করবে বলেন? কোনটা কীভাবে ঠেকাবে। ডিজাইন (নকশা) করেছেন তো অন্য লোক। তারা তো (প্রকল্পের কর্মকর্তারা) ডিজাইন করেননি। তারা তো কর্মচারী।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক রাফিউস সাজ্জাদ বলেন, তদন্তে আসলে কিছুই পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ আছেন যারা আমার বিরোধিতা করছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো অপরাধ করিনি।
স্টাফ রিপোর্টার 























