ঢাকা ০৫:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দেবীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা; ১১ দিনে ২৩ জনের জেল লি‌বিয়ার সঙ্গে যৌথ ব্যবসায়িক ফোরাম গঠনের প্রস্তাব বাংলাদেশের যুদ্ধের কারণে ঢাকা থেকে ৯৭২ ফ্লাইট বাতিল ইউনূসসহ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে নোটিশ ‘কলকাতায় হামলা চালাবে পাকিস্তান, প্রধানমন্ত্রী চুপ কেন?’ তোপ মমতার ফেনীতে যমুনা টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দুপুরিয়া গ্রামে পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আকবরশাহ থানার অভিযানে চোরাই মালসহ এক চোর গ্রেফতার আকবরশাহ থানার অভিযানে ২০ লিটার চোলাই মদসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার আকবরশাহ থানার বিশেষ অভিযানে ৪ পরোয়ানাভুক্ত গ্রেফতার
সংসদ ভবনে সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারি

গণপূর্তে বহাল তবিয়তে প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ

জাতীয় সংসদ ভবনের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে একের পর এক সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাট এবং এর পেছনে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবের ফলাফল। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম ডিভিশন-৭-এর অধীনস্থ ইএম উপ-বিভাগ-১৩-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ, যিনি একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।

রবিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের অষ্টম দিনে আবারও সাউন্ড সিস্টেমে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলেও শুরু থেকেই মাইকে ত্রুটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংসদ সদস্যরা একে অপরের বক্তব্য স্পষ্টভাবে শুনতে পারছিলেন না, ফলে কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বিষয়টি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরে স্পিকার বাধ্য হয়ে অধিবেশন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের ত্রুটি শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং তা পুরো ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশ্ন তুলে দেয়।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমে নানা ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। কখনো মাইক্রোফোন কাজ করছে না, কখনো শব্দ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অথচ এই সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এত ব্যয়ের পরও কেন বারবার একই ধরনের সমস্যা হচ্ছে—এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত ১২ মার্চ সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে একটি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ, অতিমূল্যে ক্রয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের নামে অযৌক্তিক বিল প্রদানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে বদলি করা হলেও প্রকৃত দায় এড়িয়ে যান উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি এবং কারিগরি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরাসরি তার ওপরই ছিল।

এই অবস্থায় নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে মূল হোতাকে আড়াল করা হচ্ছে। এমনকি দপ্তরের ভেতরে অনেকেই মনে করছেন, নাহিদের পেছনে একটি শক্তিশালী ‘অদৃশ্য শক্তি’ কাজ করছে, যার কারণে তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এক প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্যের আশ্রয়ে থেকে আসিফ রহমান নাহিদ গণপূর্ত অধিদপ্তরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইএম ডিভিশনের বড় বড় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না বললেই চলে; বরং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করা হতো।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টেন্ডার আহ্বানের আগেই ঠিকাদার নির্ধারণ হয়ে যেত এবং পরে সেই অনুযায়ী শর্ত তৈরি করা হতো, যাতে অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে আসিফ রহমান নাহিদ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন দপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলেও নাহিদের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি। অনেক কর্মকর্তা যেখানে আত্মগোপনে চলে গেছেন বা বদলির শিকার হয়েছেন, সেখানে নাহিদ কৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার প্রভাব অটুট থাকা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “সংসদ ভবনের মতো একটি সংবেদনশীল স্থাপনায় যদি সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে এমন অনিয়ম হয় এবং সংশ্লিষ্টরা পার পেয়ে যান, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “এই সিস্টেম কেবল বক্তব্য শোনার জন্য নয়, বরং নিরাপত্তা ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত। এখানে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী পুরো বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সৎ কর্মকর্তারা সেখানে কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন। কেউ কেউ আবার অভিযোগ করেছেন, অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাদের বদলি বা হয়রানির শিকার হতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে দপ্তরের ভেতরে এক ধরনের ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটাতে পারে।

এদিকে, সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটিপূর্ণ ক্রয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্পের আওতায় যে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে, তার মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক নিম্নমানের। অথচ কাগজপত্রে তা উচ্চমূল্যে দেখানো হয়েছে। ফলে সরকার যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি কার্যকারিতার দিক থেকেও সিস্টেমটি ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদ ভবনের মতো একটি স্থাপনায় সাউন্ড সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো। এটি শুধু বক্তব্য প্রচারের জন্য নয়, বরং সমগ্র কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। সেখানে যদি বারবার ত্রুটি দেখা দেয়, তাহলে তা পুরো ব্যবস্থাপনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই পরিস্থিতিতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত পরিচালনা করে, তাহলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, প্রভাবশালী মহলের কারণে এই তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও তা ধামাচাপা পড়ে যায় এবং প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি থেকে বেঁচে যান। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়।

এদিকে, দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। সংসদ ভবনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যদি এমন অনিয়ম হয় এবং তা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে তা দেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।

কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলে শুধু সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারিই নয়, বরং আরও অনেক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। কারণ, একই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারি এখন একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের সর্বোচ্চ আইনসভাকে ঘিরে এমন বিতর্ক যে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়—এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনে কতটা আন্তরিকতা দেখায়। যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায়, তাহলে তা শুধু একটি কেলেঙ্কারির সমাধানই হবে না, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যথায়, এই ঘটনা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দেবীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা; ১১ দিনে ২৩ জনের জেল

সংসদ ভবনে সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারি

গণপূর্তে বহাল তবিয়তে প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ

আপডেট সময় ০২:৩৯:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬

জাতীয় সংসদ ভবনের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে একের পর এক সাউন্ড সিস্টেম বিভ্রাট এবং এর পেছনে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবের ফলাফল। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম ডিভিশন-৭-এর অধীনস্থ ইএম উপ-বিভাগ-১৩-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ, যিনি একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।

রবিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের অষ্টম দিনে আবারও সাউন্ড সিস্টেমে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলেও শুরু থেকেই মাইকে ত্রুটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংসদ সদস্যরা একে অপরের বক্তব্য স্পষ্টভাবে শুনতে পারছিলেন না, ফলে কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বিষয়টি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরে স্পিকার বাধ্য হয়ে অধিবেশন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের ত্রুটি শুধু অস্বস্তিকরই নয়, বরং তা পুরো ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশ্ন তুলে দেয়।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমে নানা ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। কখনো মাইক্রোফোন কাজ করছে না, কখনো শব্দ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অথচ এই সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এত ব্যয়ের পরও কেন বারবার একই ধরনের সমস্যা হচ্ছে—এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত ১২ মার্চ সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে একটি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ, অতিমূল্যে ক্রয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের নামে অযৌক্তিক বিল প্রদানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে বদলি করা হলেও প্রকৃত দায় এড়িয়ে যান উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ রহমান নাহিদ। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি এবং কারিগরি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরাসরি তার ওপরই ছিল।

এই অবস্থায় নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে মূল হোতাকে আড়াল করা হচ্ছে। এমনকি দপ্তরের ভেতরে অনেকেই মনে করছেন, নাহিদের পেছনে একটি শক্তিশালী ‘অদৃশ্য শক্তি’ কাজ করছে, যার কারণে তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এক প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্যের আশ্রয়ে থেকে আসিফ রহমান নাহিদ গণপূর্ত অধিদপ্তরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইএম ডিভিশনের বড় বড় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না বললেই চলে; বরং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করা হতো।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টেন্ডার আহ্বানের আগেই ঠিকাদার নির্ধারণ হয়ে যেত এবং পরে সেই অনুযায়ী শর্ত তৈরি করা হতো, যাতে অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে আসিফ রহমান নাহিদ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন দপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলেও নাহিদের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি। অনেক কর্মকর্তা যেখানে আত্মগোপনে চলে গেছেন বা বদলির শিকার হয়েছেন, সেখানে নাহিদ কৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার প্রভাব অটুট থাকা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “সংসদ ভবনের মতো একটি সংবেদনশীল স্থাপনায় যদি সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে এমন অনিয়ম হয় এবং সংশ্লিষ্টরা পার পেয়ে যান, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “এই সিস্টেম কেবল বক্তব্য শোনার জন্য নয়, বরং নিরাপত্তা ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত। এখানে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী পুরো বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সৎ কর্মকর্তারা সেখানে কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন। কেউ কেউ আবার অভিযোগ করেছেন, অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাদের বদলি বা হয়রানির শিকার হতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে দপ্তরের ভেতরে এক ধরনের ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটাতে পারে।

এদিকে, সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটিপূর্ণ ক্রয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্পের আওতায় যে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে, তার মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক নিম্নমানের। অথচ কাগজপত্রে তা উচ্চমূল্যে দেখানো হয়েছে। ফলে সরকার যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি কার্যকারিতার দিক থেকেও সিস্টেমটি ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদ ভবনের মতো একটি স্থাপনায় সাউন্ড সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো। এটি শুধু বক্তব্য প্রচারের জন্য নয়, বরং সমগ্র কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। সেখানে যদি বারবার ত্রুটি দেখা দেয়, তাহলে তা পুরো ব্যবস্থাপনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই পরিস্থিতিতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত পরিচালনা করে, তাহলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, প্রভাবশালী মহলের কারণে এই তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও তা ধামাচাপা পড়ে যায় এবং প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি থেকে বেঁচে যান। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়।

এদিকে, দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। সংসদ ভবনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যদি এমন অনিয়ম হয় এবং তা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে তা দেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।

কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলে শুধু সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারিই নয়, বরং আরও অনেক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। কারণ, একই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারি এখন একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের সর্বোচ্চ আইনসভাকে ঘিরে এমন বিতর্ক যে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়—এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনে কতটা আন্তরিকতা দেখায়। যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায়, তাহলে তা শুধু একটি কেলেঙ্কারির সমাধানই হবে না, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যথায়, এই ঘটনা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।