আদি হিন্দুদের বঞ্চিত করে ১২০ কোটি টাকার জমি মাত্র দুই লাখ টাকায় আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘকে (ইসকন) দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এর মধ্যে উত্তরায় এক লাখ টাকায় প্রায় ৫৩ কোটি বাজার মূল্যের ৩৫ কাঠা ও পূর্বাচলে এক লাখ টাকায় ৬৭ কোটি বাজার মূল্যের ৮৩ দশমিক ৩ কাঠা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইসকনকে জমি দিতে স্থানীয় আদি হিন্দুদের মন্দির নির্মাণে জমি বরাদ্দের আবেদন রাজউক থেকে গায়েব করে দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
এশিয়া পোস্টের সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, পূর্বাচল উপশহর গড়তে গাজীপুরের পাঁচটি গ্রামের জমি অধিগ্রহণ করেছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের এসব গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের সাড়ে আট হাজার মানুষের বসতভিটা, জমিজমা ও মন্দিরের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরে অবশ্য ওই প্রকল্পে প্লট দেওয়া হয় আদি বাসিন্দাদের।
এ ছাড়া তাদের উপাসনার জন্য মন্দির এবং মৃত্যুর পর মরদেহ সৎকার বা দাহ করার জন্য শ্মশান নির্মাণে ৮৩ দশমিক ৩ কাঠা জমি নির্ধারণ করে রাজউক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জমি আর পায়নি আদি হিন্দুরা। এক লাখ টাকায় সেই জমি বরাদ্দ গেছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) নামে। এক লাখ টাকায় ইসকনকে দেওয়া জমিটির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৬৬ কোটি টাকা।
এর আগে উত্তরায় আরও সাড়ে ৩৫ কাঠা জমি পায় ইসকন। দুটি মিলিয়ে রাজউকের কাছ থেকে পাওয়া তাদের জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৮ কাঠারও বেশি।
বড়কাউ, বিহাট্টা, হাটখোরা, পারাবারতা ও কেটুন—এই পাঁচ গ্রামে একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৮ থেকে ১০টি মন্দির ছিল। পূর্বাচল প্রকল্পের আওতায় সেগুলো অধিগ্রহণ হয়ে যায়। পরে রাজউক পূর্বাচলের ২৬ নম্বর সেক্টরের ২০১ ও ২০১/১ নম্বর প্লটে মন্দির, উপাসনালয় ও শ্মশানের জন্য মোট ৮৩ দশমিক ৩ কাঠা জমি নির্ধারণ করে। নির্ধারিত সেই জমিতে বড়কাউ শ্রী শ্রী সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটি বছরের পর বছর ধরে দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজাসহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছিল।
নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২১ সালে মন্দির কমিটির তৎকালীন সভাপতি বিপ্লব চন্দ্র বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক সুকুমল বিশ্বাস জমিটি নামমাত্র মূল্যে স্থায়ীভাবে মন্দিরের নামে বন্দোবস্তের জন্য রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেন। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের গাজীপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ঠাকুর দাস মণ্ডলসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ওই আবেদনে সুপারিশ করেন। গাজীপুর-৫ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ চুমকি আলাদাভাবে দ্রুত বন্দোবস্তের জন্য রাজউকের কাছে আবেদন করেন।
এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউকের তরফে কোনো সাড়া মেলেনি। উল্টো মন্দির কমিটি ও সংসদ সদস্যের করা আবেদনপত্র দুটি পরে রাজউক থেকে গায়েব হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মন্দির কমিটির বর্তমান সভাপতি শুভ সরকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা পূর্বাচল শহরের আদি বাসিন্দা। এখানে আমাদের পূর্বপুরুষরা বসবাস করেছেন। সরকার পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য আমাদের বসতভিটা, জমিজমা, মন্দিরের জমি অধিগ্রহণ করেছে। সে সময় কালীগঞ্জ উপজেলার বড়কাউ, বিহাট্টা, হাটখোরা, পারাবারতা ও কেটুন গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় সাড়ে আট হাজার মানুষের জন্য বড়কাউ শ্রী শ্রী সার্বজনীন দুর্গা মন্দির স্থাপন ও শ্মশান তৈরির জমি নির্ধারণ করে রাজউক। তবে ২০২৩ সালে আমাদের আবেদন ও নথিপত্র গায়েব করে ইসকনের নামে জায়গাটির বরাদ্দপত্র জারি করা হয়। ইসকনের কোনো সদস্য এই এলাকার আদি বাসিন্দা নয়, তবুও স্থানীয় আদি বাসিন্দাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জায়গা হরণের চেষ্টা চলছে।’
অস্বাভাবিক গতিতে বরাদ্দ পায় ইসকন
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৩ সালে বড়কাউ শ্রী শ্রী সার্বজনীন দুর্গা মন্দির স্থাপন ও শ্মশান তৈরির জন্য নির্ধারিত জমিতে মন্দির নির্মাণের আবেদন করে ইসকন। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাজউকের ০৩/২০২৩তম সাধারণ সভায় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকার ২৬-২০১-০০৯ নম্বর প্লটটি ইসকনের অনুকূলে বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। জারি করা হয় চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র। এই বরাদ্দের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ১৭ মার্চ মন্দির কমিটির তৎকালীন সভাপতি বিপ্লব চন্দ্র বিশ্বাস প্লটটি বড়কাউ শ্রী শ্রী সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটি বরাবর নামমাত্র মূল্যে বন্দোবস্ত দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে রাজউকে আবেদন করেন। জমির দখল অবশ্য এখনও হস্তান্তর হয়নি। দখল হস্তান্তরের নথি কানুনগো (এস্টেট ও ভূমি-৩) বরাবর পাঠানো হলেও পূর্বাচল প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী দখলপত্রে স্বাক্ষর করেননি।
আদি হিন্দুদের ভাগ দিতে অস্বীকৃতি ইসকনের
পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়লে একপর্যায়ে উভয়পক্ষের অনাপত্তি চেয়ে চিঠি পাঠায় রাজউক। মন্দির কমিটির দাবি ছিল, ৮৩ দশমিক ৩ কাঠার প্লটটির পেছনে পশ্চিম পাশের রাস্তা থেকে ১৬০ ফুট তাদের দেওয়া হোক। কিন্তু ইসকন এতে রাজি হয়নি। তারা প্লট বিভক্ত না করার পক্ষে মত দেয় এবং পরে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে। পিটিশন নম্বর-১৫৪০৮/২০২৩।
এই এলাকার একজন পুরোনো বাসিন্দা মনোরঞ্জন মল্লিক। একসময় বড়কাউ গ্রামে ৯ বিঘা জমিতে তাদের বাড়ি ছিল। সেই জমিসহ সবকিছু সরকার অধিগ্রহণ করেছে। এখন তিনি পরিবার নিয়ে মন্দিরের পাশে থাকেন। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এখানে পাঁচটি গ্রামে হাজার হাজার হিন্দু ছিল। তাদের জন্য মন্দির ছিল ৮-১০টি। এখন পাঁচ গ্রাম মিলে সরকার একটি মাত্র মন্দিরের জায়গা নির্ধারণ করলেও সেটি থেকেও আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। ইসকন নামের যাদের বরাদ্দ দেওয়ার পাঁয়তারা করছে রাজউক, তাদের কেউ স্থানীয় নয়। তাদের কারও বাড়ি রংপুর, কারও দিনাজপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায়। তারা টাকা পয়সা খরচ করে জাল কাগজের মাধ্যমে আমাদের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে।’
উত্তরায় ৫২ কোটির সাড়ে ৩৫ কাঠা পেয়েছে ইসকন
পূর্বাচলের আগেই উত্তরায় জমি পেয়েছে ইসকন। ২০১৩ সালের ৬ অক্টোবর সম্প্রসারিত উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্পের আবাসিক এলাকা ১৭-ই নম্বর সেক্টরের অ্যাভিনিউ ৬ নম্বর সড়কে সাড়ে ৩৫ কাঠার একটি প্লট মাত্র এক লাখ এক টাকা প্রতীকী মূল্যে ইসকনের নামে চূড়ান্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই জমির বাজার মূল্য কাঠাপ্রতি প্রায় দেড় কোটি টাকা। সে হিসাবে এক লাখ টাকায় ইসকনকে দেওয়া ৩৫ কাঠা জমির বাজার মূল্য প্রায় ৫২ কোটি টাকা। এই জমিতে এখন ইসকন রাধাবর্মন টেম্পল নামে মন্দির গড়ে উঠেছে। একই সংস্থাকে একবার জমি দেওয়ার পর আবার দেওয়ার এই নজিরকে নিয়মবিরুদ্ধ বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
এক প্রতিষ্ঠানকে দুইবার জমি দেওয়ার সুযোগ নেই
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ইসকন একটি সংঘ। এটি আমাদের দেশের সাধারণ মূলধারার হিন্দুদের মতো নয়। সরকারের কোনো আবাসিক এলাকায় মসজিদ, মন্দির, গির্জা সেই এলাকার আয়তন ও ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা অনুযায়ী নির্ধারণ হয়। কিন্তু রাষ্ট্র ও রাজউকের আইন অনুযায়ী একটি সংঘকে একবার জমি বরাদ্দ দিলে আরেকবার বরাদ্দ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উত্তরা প্রকল্পে জমি দেওয়ার পরে আবার যদি পূর্বাচলে দেওয়া হয়, তবে সেটি অনধিকার চর্চা করা হয়েছে। এখানে বাহ্যিক কোনো চাপেই হোক আর অতি উৎসাহেই হোক, এই বরাদ্দে দুর্নীতি হয়েছে।’
যা বলছে ইসকন
ইসকনের পক্ষ থেকে অবশ্য তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরের হিসাবরক্ষক নটবর গিরিধারী দাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ইসকন কারও জমি দখল করে না। মূলত দেবোত্তর বা দানকৃত জমিতেই ইসকন মন্দির ও শিক্ষামূলক কাজ করে। পূর্বাচলের জায়গাটি বর্তমানে যারা আদি বাসিন্দা দাবি করছে, তারাই স্বপ্রণোদিত হয়ে দিয়েছে। এখন এই এলাকার উন্নয়ন হচ্ছে, জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা এসব দাবি করছে।’
একই মন্দিরের ভূমি ও আইন বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিন্ময় দাস বলেন, ‘যারা আদি বাসিন্দা দাবি করছে, তাদের সবাইকে সরকার প্লট দিয়েছে। সেখানে কোনো মন্দির ছিল না, তাই সরকার আমাদের একটি মন্দিরের জায়গা দিয়েছে। এখন তাদের অনেকে নিজেদের জমি-প্লট বিক্রি করেছে, আবার অনেকের প্লট থাকার পরেও নামমাত্র একটি দুর্গা মন্দির নির্মাণ করে মন্দিরের জায়গা দখল করে বসতি বানিয়ে ফেলছে। নিজেদের জমির টাকায় তারা ভারতে বাড়ি কিনেছে। তারা মূলত সরকারের সঙ্গে প্রতারণা করছে। আর আমাদের মন্দিরে যারা বসবাস করে, তাদের কোনো জমিজমা, সম্পদ, স্ত্রী কিছুই নেই। তারা শুধু সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার জন্য সেখানে আছেন। আমরা এটির সব অর্থ পরিশোধ করেছি।’
জানেন না রাজউক চেয়ারম্যান
বিষয়টি নিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ সম্পর্কে কিছু জানে না বলে জানান। তিনি বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমার জানা ছিল না। কাগজপত্র দেখে জেনে মন্তব্য করতে হবে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























