দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে গঠিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই যদি অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি এমনই এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে বাংলাদেশ পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশনের এক উপপরিচালক নিজামুল হককে ঘিরে। বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি করেছে তীব্র অসন্তোষ ও ভয়ের পরিবেশ।
অভিযোগ অনুযায়ী, নিজামুল হক দীর্ঘদিন ধরে তার পদমর্যাদার সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নানা ধরনের অনিয়ম করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে প্রধান যে অভিযোগগুলো এসেছে তার মধ্যে রয়েছে পুরাতন অফিস মালামাল বিক্রি করে সেই অর্থ আত্মসাৎ করা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে ভুয়া বা অতিরঞ্জিত ভাউচার তৈরি করে টাকা তুলে নেওয়া এবং ব্যক্তিগত কাজে অফিসের সম্পদ ও জনবল ব্যবহার করা। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে সাতক্ষীরা এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে নিজামুল হক এক সহকর্মীর কাছ থেকে অফিসের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে নিজের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি বিক্রি করেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনাটি সহকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দেয়, কিন্তু চাকরি হারানোর ভয় এবং প্রশাসনিক চাপের কারণে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারেননি।
এর পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যে জড়িত থাকা। অভিযোগ রয়েছে, পিরোজপুর অঞ্চলের কয়েকজন কর্মচারীর কাছ থেকে বদলির নামে লক্ষ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে নাসিমা বেগম, রুমু দে, তুনু রানি বিশ্বাস, মন্নান হোসেন, নার্গিস আক্তার, জাহিদ হোসেন এবং মিলেশ নন্দীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট স্থানে বদলি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে বড় অংকের অর্থ নেওয়া হয়।
বরিশাল অঞ্চলেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে সেলিনা বেগম, রিতা রানী, ইয়াকুব হোসেনসহ আরও কয়েকজন কর্মচারীর কাছ থেকে পদোন্নতির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, এসব ক্ষেত্রে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে। তবে এসব কার্যক্রম পুরোপুরি অনিয়মের মাধ্যমে হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
আরও একটি নির্দিষ্ট অভিযোগে বলা হয়েছে, বানারীপাড়া সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবের মাধ্যমে এক লাখ বিশ হাজার টাকার বিনিময়ে পদায়ন করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট চেক নম্বরের উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ওই অর্থ গ্রহণের পর দুইজন কর্মচারীকে স্বরূপকাঠি ও গৌরনদী উপজেলায় পদায়ন করা হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণিত হলে তা হবে সরাসরি ঘুষ গ্রহণের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
অভিযোগ রয়েছে, নিজামুল হক তার ক্ষমতা ব্যবহার করে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বিভিন্ন সময় চাপ সৃষ্টি করেন এবং তাদের ব্যক্তিগত কাজেও ব্যবহার করেন। কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে তাকে বদলি, পদোন্নতি স্থগিত বা অন্যভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে কেউ খোলাখুলি কথা বলতে সাহস পান না।
অভিযোগকারীদের দাবি, হেড অফিসে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাদের ধারণা, নিজামুল হকের প্রভাবশালী আত্মীয় হেড অফিসে থাকার কারণে এসব অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে তারা মনে করছেন, উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
প্রতিষ্ঠানের ভেতরের এই পরিস্থিতি শুধু কর্মপরিবেশকেই প্রভাবিত করছে না, বরং দারিদ্র বিমোচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় লক্ষ্যকেও ব্যাহত করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কারণ, যেখানে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বরাদ্দ অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, সেখানে যদি সেই অর্থই অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়, তাহলে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হন।
অভিযোগকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আরও জানিয়েছেন, এই ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ করা অনেক কর্মী হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং তাদের মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, যদি অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে সৎভাবে কাজ করা কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের আশা, একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তারা এমন একটি পরিবেশ চান যেখানে কেউ ভয়ভীতি ছাড়াই নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
অন্যদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজামুল হকের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন যে এগুলো তার বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তার মতে, কিছু অসন্তুষ্ট ব্যক্তি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, তার কর্মজীবনে তিনি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।
এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে বিষয়টি এখন আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে রয়েছে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি। ফলে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে। বিশেষ করে দারিদ্র বিমোচনের মতো সংবেদনশীল খাতে অনিয়মের প্রভাব আরও গভীর হয়, কারণ এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষরা।
তারা আরও বলেন, অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, উভয় ক্ষেত্রেই তদন্ত জরুরি। যদি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্মান রক্ষা করা প্রয়োজন। আর যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে কঠোর শাস্তির মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অনিয়ম করার সাহস না পায়।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহলে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত তদন্ত শুরু করে বিষয়টির সমাধান করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জনসাধারণও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
সবশেষে বলা যায়, এই অভিযোগগুলো শুধু একটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই অভিযোগগুলোর মোকাবিলা করে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনে কী পদক্ষেপ নেয়। জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং দ্রুত তদন্তই হতে পারে একমাত্র কার্যকর পথ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















