- আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও লুৎফুজ্জামান বাবরের ভিডিও করে হেনস্তার অভিযোগ,
- মোসাদ্দেক আলী ফালুর ওপর চালান নির্যাতন
- আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও ওবায়দুল কাদেরকেও করেন নির্যাতন
আফজাল নাছের। শ্মশ্রুমণ্ডিত সুন্দর চেহারা। অথচ তিনিই এক-এগারোর অন্যতম ভয়ংকর এক কুশীলব। সে সময়ে যে কয়জন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন এর নেপথ্যে নায়ক আফজাল তাদের মধ্যে অন্যতম। সম্প্রতি এক-এগারোর অন্যতম প্রধান কুশীলব হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও ডিজিএফআইর সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে আরেক কুশীলব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আফজাল নাছেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে একে একে বেরিয়ে আসছে ওয়ান-ইলেভেনের আরো বাকি কুশীলবদের নামও। যে কোনো সময় তারাও গ্রেফতার হতে পারেন, এমনটিই নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
মূলত, এক-এগারোর সময়ের আলোচিত ও বিতর্কিত ডিজিএফআই কর্মকর্তা হিসেবে সম্প্রতি গ্রেফতার হন আফজাল নাসের। ওই সময় তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ
জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার নানা ঘটনার সূত্র ধরে সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) আফজাল নাছের ভূঁইয়ার ভূমিকা নিয়ে আবারও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলা ছাড়াও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কয়েকজনের বক্তব্যে উঠে এসেছে আফজালের অপকর্ম। বিশেষ করে তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে ডিজিএফআইর বিশেষ অভিযানে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন। সে সময় জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে শুরু করে অর্থ আদায় নানা ঘটনার সঙ্গে তার নাম রয়েছে।
এ ছাড়া ওয়ান-ইলেভেনের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বড় ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে তখন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে তার নেপথ্যে যে কয়জন সেনা কর্মকর্তা খলনায়কের ভূমিকায় ছিলেন আফজাল নাছের ছিলেন তাদের অন্যতম। ডিজিএফআইর এই সাবেক কর্মকর্তার নাম মূলত ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্থাটির কর্মকাণ্ড এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা-মামলায় অভিযুক্তদের সহায়তা করার অভিযোগের কারণে আলোচিত হন।
কিন্তু নানান বাস্তবতায় পরবর্তীতে কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কারণ আফজাল নাছের ভূঁইয়া তখন ডিজিএফআইর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।
জানা গেছে, ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১/১১) আমলে তারেক রহমানের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল এসব নির্মমতার পেছনের কারিগর ছিলেন আজকের আফজাল নাছের ভূঁইয়া। ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১/১১) আমলে তারেক রহমানের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে তিনি গুরুতর শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। রিমান্ডে থাকাকালে তাঁকে চোখ বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা এবং শূন্য থেকে সিমেন্টের মেঝের ওপর ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তখনই। এর ফলে মেরুদণ্ডে আঘাত ও নির্যাতনের ফলে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায় এবং তিনি আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। গুরুতর চোটের কারণে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না এবং ব্যথানাশক ওষুধের প্রভাবে তাঁর কিডনিও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন।
২০০৭ সালের এক-এগারোর পরবর্তী সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ওপর নির্যাতনের পেছনেও ডিজিএফআইর এই সাবেক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার সাথে তাকেও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। সূত্র আরো জানায়, হেফাজতে থাকাকালীন কোকোর ওপর অমানসিক-
শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এই নির্যাতনের কারণেই তিনি স্থায়ীভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। নির্যাতনের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ২০০৮ সালে
প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড এবং পরে মালয়েশিয়ায় যান। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। বিএনপি নেতাদের মতে, তার এই অকাল মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না, বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও পরবর্তী সরকারের ‘সম্মিলিত নিপীড়ন ও নির্যাতনের’ ধকল তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে হেনন্তা এবং জোরপূর্বক ভিডিও ধারণের অভিযোগও রয়েছে এই আফজালের বিরুদ্ধে। তাছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ভাইরাল হওয়া ভিডিও ধারণ করেন এই আফজাল। ব্যবসায়ী মোসাদ্দেক আলী ফালুর ওপর চালানো নির্যাতনেও
এই সেনা কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে বিতর্ক শুধু বিএনপিকে ঘিরে নয়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন দুই শীর্ষ নেতা আব্দুল জলিল ও ওবায়দুল কাদেরকেও নির্যাতন, জিজ্ঞাসাবাদেও জড়িত ছিলেন বিতর্কিত এ সেনা কর্মকর্তা। তখনকার নানান বর্ণনায়ও কর্নেল আফজালের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। এদিকে রাজনৈতিক নেতাদের নির্যাতনের পাশাপাশি তাদের থেকে অর্থ আদায়েরও অভিযোগ পাওয়া গেছে এ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াকিল উদ্দিনকে আটক রেখে কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। ২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থার সময় বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের বিষয়ে তাঁর নাম উঠে আসে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তিনি ডিজিএফআইর লেটারহেডে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি লিখে
আদায়কৃত অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়াও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা-মামলায়ও আফজাল নাছেরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পুরনো। এ মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে- গ্রেনেড হামলার মূল পরিকল্পনাকারী মাওলানা তাজউদ্দিনকে দেশত্যাগে সহায়তা করেছিলেন তৎকালীন ডিজিএফআই কর্মকর্তারা। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, লে. কর্নেল আফজাল (তৎকালীন মেজর) এবং অন্য কর্মকর্তারা তাজউদ্দিনকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা এবং পরে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিলেন।
শুধু তাই নয়, তিনি ডিজিএফআইর অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন পরিচালক বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে ২০০৭-০৮ সালের ঘটনাপ্রবাহে বিতর্কিত
ভূমিকা পালন করেছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি পান। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা এবং উচ্চ আদালতে রিট পিটিশনও দায়ের করা হয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেনের সময় ডিজিএফআইর অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটে কর্মরত ছিলেন আফজাল। যার প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিন। এই আমিনের নেতৃত্বে আফজাল গ্রেপ্তার, নির্যাতনসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন।
আলোচনা এসেছে এমজিএইচ গ্রুপের সিইও আনিস আহমেদ গোর্কিকে নিয়ে। সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের দাবি, তাকে তিন থেকে চার মাস অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয় এবং পরে বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে অপারেশনটি পরিচালনা করেছিল তৎকালীন কর্নেল আফজালের অধীনস্থ একটি দল।
ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তীতে কর্নেল আফজালের ইউনাইটেড গ্রুপে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়া নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে গ্রুপটির অ্যাডমিন অফিসার হিসেবে কর্মরত তিনি। একই গ্রুপের পরিচালক হাসান মাহমুদ রাজার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল সিনা ইবনে জামালীর নামও পুরনো বিতর্কে ঘুরে এসেছে। বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে সাম্প্রতিক একটি হত্যা মামলার পর। গত বছরের জুলাইয়ে রাজধানীর শাহজাদপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বাহাদুর হোসেন মনির। ক্ষমতার পালাবদলের পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর নিহতের বাবা গুলশান থানায় যে হত্যা মামলা করেন, তাতে নাম আসে কর্নেল (অব.) আফজালের।
ইউনাইটেড গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা হাসান মাহমুদ রাজা এবং গ্রপের চেয়ারম্যান ও এমডি মঈনউদ্দিন হাসান রশিদের নামও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। মামলার পর থেকে কর্নেল আফজালকে ঘিরে ওয়ানইলেভেনের পুরনো অভিযোগগুলো আবার সামনে আসছে। জানা যায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এক-এগারোর সরকারের সময় নির্যাতনের অন্যতম হোতা ছিলেন আফজাল নাছের যে স্থানে তারেক রহমানকে নির্যাতন করা হয় সেখানে সশরীর উপস্থিত ছিলেন ডিজিএফআই-এর সাবেক এই কর্মকর্তা। আফজাল নাছেরের এসব অপকর্মের অভিযোগে ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর তাকে বরখাস্ত করা হয়। তার বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে। তিনি ১৯৮৪ সালের ৪ জুলাই কমিশন্ড কর্মকর্তা হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















