বাবার নামে প্রায় ৮ কোটি, মায়ের নামে দেড় কোটি ও নিজ নামে সাড়ে ৫ কোটি টাকার ‘অবৈধ’ সম্পদ অর্জন করেছেন উপ-কর কমিশনার মোসা. তানজিনা সাথী। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ‘অবৈধ’ সম্পদের মালিক তিনি। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), যার দুটিতে আসামি করা হয়েছে তার বাবা-মাকেও।
মঙ্গলবার দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ মামলা তিনটি করেন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি কমিশন মামলাগুলো করার অনুমোদন দিয়েছিল।
মোসা. তানজিনা সাথী এখন ময়মনসিংহ কর অঞ্চলের সার্কেল-১৯ (নেত্রকোণা বৈতনিক) এ কর্মরত।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ৩৬ বিসিএসের তানজিনা সাথী এনআইডিতে তার স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছেন বরিশালের বাকেরগঞ্জ। কিন্তু, বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি নেওয়ার সময় তিনি স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়েছেন বরগুনায়। চাকরি পাওয়ার তিন বছর পর তিনি মা-বাবার নামে টিআইএন নিবন্ধন করেছেন। একটি মামলায় শুধু সাথীকে আসামি করা হয়েছে। এতে অভিযোগ আনা হয়েছে সাথী ৫ কোটি ৬৫ হাজার টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।
অপর একটি মামলায় তার বাবা মোশারফ হোসেন মল্লিক ও তানজিনা সাথীকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে অভিযোগ- সাথী কর অঞ্চল-৯ এর সহকারী কর কমিশনার পদে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তিনি অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৫ টাকা বৈধ করতে তার বাবার নামে এসব অর্থ অর্জন করেছেন। নিজ ভোগ দখলে রেখে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনে সহায়তা করেছেন।
এজাহারে বলা হয়, দুদকের কাছে অভিযোগ ছিল, সাথী কর অঞ্চল-৯ এর কর সার্কেল-১৩৭ ও ১৪২ এবং কর অঞ্চল-৭ এর কর সার্কেল-১৮১ এ কর্তব্যরত থেকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ গ্রহণ করে নিজ, বাবা-মা এবং অন্যান্যদের নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।
দুদক অনুসন্ধানকালে তার বাবা মোশারফ হোসেন মল্লিক এর নামে ৩ লাখ ২৯ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৪ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ পেয়েছে। মোট সম্পদ ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকার।
অনুসন্ধানকালে তার বাবার কোনো দায়-দেনার তথ্য পায়নি দুদক। সে হিসাবে তার বাবার নীট সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। মল্লিকের নামে ২০০২-০৩ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় পাওয়া গেছে ৪ কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার টাকার। ব্যয়সহ তার অর্জিত সম্পদের মূল্য ৮ কোটি ৯৫ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।
মল্লিকের গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১ কোটি ৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা। সে হিসাবে তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ ৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এই সম্পদের বিপরীতে বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি।
দুদকের দাবি- মোশারফ হোসেন মল্লিক এর উৎসবিহীন টাকা তার মেয়ে তানজিনা সাথীর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে উপার্জিত। এ টাকাকে বৈধ করার জন্য আয়কর নথিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়েছেন মল্লিক।
আরেকটি মামলায় সাথীর মা মোসা. রাণী বিলকিস ও মোসা. তানজিনা সাথীকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদক বলছে, এ সব টাকা বৈধ করতে সাথী তার মায়ের নামে অর্জন এবং নিজ ভোগ দখলে রেখে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।
এজাহারে বলা হয়, দুদকের কাছে অভিযোগ ছিল, তানজিনা সাথী সহকারী কর কমিশনার হিসাবে কর অঞ্চল-১ এ থাকাবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে কর সার্কেল-১৩৭ ও ১৪২, কর অঞ্চল-৭ এর কর সার্কেল-১৮১ তে কর্তব্যরত থেকে বিপুল পরিমাণ উৎকোচ গ্রহণ করে নিজ, বাবা-মা এবং অন্যান্যদের নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।
অনুসন্ধানকালে তার মা রাণী বিলকিস এর নামে ৩ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ ও ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। স্থাবর ও অস্থাবর মিলে তার মোট ৩ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। তার ১ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার দায়-দেনা পাওয়া গেছে। দায় বাদে তার নীট সম্পদ ২ কোটি ৬১ লাখ ৯৪ হাজার টাকার। তার ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ব্যয়সহ তার অর্জিত সম্পদের মূল্য ২ কোটি ৭০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
এ সব সম্পদ অর্জনে তার গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১ কোটি ১৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। তার আয়ের থেকে সম্পদের পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। সে হিসাবে সাথীর মা রাণী বিলকিস এর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। ওই সম্পদের বিপরীতে বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি।
রাণী বিলকিস এর উৎসবিহীন এই টাকা তার মেয়ে তানজিনা সাথীর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে উপার্জিত টাকা। এ সব টাকা বৈধ করার জন্য আয়কর নথিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়েছেন তার মা রাণী বিলকিস। দুদকের অভিযোগের বিষয়ে তানজিনা সাথীর বক্তব্য জানতে চেয়ে তার মোবাইলফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া গিয়েছে।
নিজস্ব প্রতিনিধি 
























