ঢাকা ০৯:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আত্রাইয়ে মহান স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত অস্ত্র-গোলাবারুদসহ সুন্দরবনের ‘করিম শরীফ’ বাহিনীর সদস্য আটক ডিএসসিসির প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয়কে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ গোপালগঞ্জে অবৈধভাবে মজুদ ৩ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ বড়লেখায় বোরো আবাদে পানির তীব্র সংকট জয়পুরহাটে ৩২.৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত, শত হেক্টর জমিতে জমেছে পানি বাগেরহাটে বাস-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে নিহত ১২ ফেনীতে টুইনসফ্টের প্রানবন্ত ইফতার ও ফ্রিল্যান্সিং সাফল্যগাথা হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি দায়বদ্ধ সংসদ পেয়েছি ফেনীতে টুইনসফ্টের প্রানবন্ত ইফতার ও ফ্রিল্যান্সিং সাফল্যগাথা

বড়লেখায় বোরো আবাদে পানির তীব্র সংকট

ভর মৌসুমে সেচ সংকটে দুশ্চিন্তায় কৃষক, অতিরিক্ত খরচেও মিলছে না পর্যাপ্ত সেচ, অকার্যকর নালা ও দুর্বল সেচব্যবস্থায় ভোগান্তি হাওরাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট।

দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং সেচব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় বোরো আবাদের ভর মৌসুমে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানির অভাবে কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর যেসব জমিতে ইতোমধ্যে চারা রোপণ করা হয়েছে, সেখানেও পর্যাপ্ত সেচের অভাবে ফসল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকেরা। অনেক কৃষকের অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকা দিয়েও প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও চারা রোপণের পর জমি শুকিয়ে ফেটে গেছে, আবার কোথাও পানির অভাবে এখনো রোপণই শুরু করা যায়নি। একরপ্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করেও ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না, এমন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বড়লেখায় ৫ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৬৯৫ হেক্টর হাওর এলাকায় এবং নন-হাওর এলাকায় ১ হাজার ৯৩০ হেক্টর। তবে দীর্ঘ খরা ও দুর্বল সেচব্যবস্থার কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা থাকলে অন্তত আরও প্রায় ৩ হাজার ৪ শত হেক্টর জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হতো।

নয়া দিগন্তকে দেয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে বড়লেখার বোরো ধান বিভিন্ন বৃদ্ধির স্তরে রয়েছে। চলতি বছরের ৮ মার্চ পর্যন্ত হাওর এলাকায় বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ জমি কুশি স্তরে, ৫২ শতাংশ পিআই (প্যানিকল ইনিশিয়েশন) স্তরে এবং ৩২ শতাংশ বুটিং স্তরে রয়েছে। অন্যদিকে নন-হাওর এলাকায় প্রায় ৫৫ শতাংশ জমি কুশি স্তরে, ৩৫ শতাংশ পিআই স্তরে এবং ১০ শতাংশ জমি বুটিং স্তরে রয়েছে। বিশেষ করে হাকালুকি হাওর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। হাওরে সেচ সুবিধা দিতে নির্মিত বেশিরভাগ নালা বর্তমানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন নতুন করে নালা খনন বা পুনঃখনন না হওয়ায় অনেক জায়গায় নালা ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। ফলে হাওরের উঁচু অংশে কৃষকদের পাইপের মাধ্যমে দূর থেকে পানি টেনে এনে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি ফসলের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় কৃষক শরিফ উদ্দিন বলেন, মৌসুমের শুরুতে কিছু পানি পাওয়া যায়, কিন্তু পরে আর থাকে না। অনেক টাকা খরচ করে চাষ করি, শেষে যদি পানি না পাই তাহলে সবই লোকসান হয়ে যায়।
কৃষি বিভাগ জানায়, বড়লেখায় বর্তমানে দুটি সৌরচালিত সেচ পাম্প চালু রয়েছে। এর মধ্যে একটি দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের লক্ষীছড়া গ্রামের মাধবছড়া এলাকায় এবং অন্যটি একই ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের নিকুড়ি ছড়া এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। এসব সোলার সেচ পাম্পের মাধ্যমে আশপাশের কিছু জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও বাড়তে পারে। খাল, ছড়া ও নদী পুনঃখনন, নতুন সেচ নালা খনন, এলএলপি (লো লিফট পাম্প), গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন, সোলার সেচ পাম্প চালু এবং সেচ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে আবাদি জমির পরিমাণ ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

এ বিষয়ে বড়লেখা উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং সেচ সুবিধা সীমিত থাকায় কিছু এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে উঠান বৈঠক, কৃষক সভা, লিফলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আগামী দিনে বৃষ্টিপাত হলে সেচের চাপ অনেকটাই কমে আসবে এবং ফলনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে এমন সেচ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বড়লেখায় খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

আত্রাইয়ে মহান স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত

বড়লেখায় বোরো আবাদে পানির তীব্র সংকট

আপডেট সময় ০৮:২১:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

ভর মৌসুমে সেচ সংকটে দুশ্চিন্তায় কৃষক, অতিরিক্ত খরচেও মিলছে না পর্যাপ্ত সেচ, অকার্যকর নালা ও দুর্বল সেচব্যবস্থায় ভোগান্তি হাওরাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট।

দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং সেচব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় বোরো আবাদের ভর মৌসুমে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানির অভাবে কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর যেসব জমিতে ইতোমধ্যে চারা রোপণ করা হয়েছে, সেখানেও পর্যাপ্ত সেচের অভাবে ফসল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকেরা। অনেক কৃষকের অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকা দিয়েও প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও চারা রোপণের পর জমি শুকিয়ে ফেটে গেছে, আবার কোথাও পানির অভাবে এখনো রোপণই শুরু করা যায়নি। একরপ্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করেও ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না, এমন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বড়লেখায় ৫ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৬৯৫ হেক্টর হাওর এলাকায় এবং নন-হাওর এলাকায় ১ হাজার ৯৩০ হেক্টর। তবে দীর্ঘ খরা ও দুর্বল সেচব্যবস্থার কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা থাকলে অন্তত আরও প্রায় ৩ হাজার ৪ শত হেক্টর জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হতো।

নয়া দিগন্তকে দেয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে বড়লেখার বোরো ধান বিভিন্ন বৃদ্ধির স্তরে রয়েছে। চলতি বছরের ৮ মার্চ পর্যন্ত হাওর এলাকায় বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ জমি কুশি স্তরে, ৫২ শতাংশ পিআই (প্যানিকল ইনিশিয়েশন) স্তরে এবং ৩২ শতাংশ বুটিং স্তরে রয়েছে। অন্যদিকে নন-হাওর এলাকায় প্রায় ৫৫ শতাংশ জমি কুশি স্তরে, ৩৫ শতাংশ পিআই স্তরে এবং ১০ শতাংশ জমি বুটিং স্তরে রয়েছে। বিশেষ করে হাকালুকি হাওর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। হাওরে সেচ সুবিধা দিতে নির্মিত বেশিরভাগ নালা বর্তমানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন নতুন করে নালা খনন বা পুনঃখনন না হওয়ায় অনেক জায়গায় নালা ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। ফলে হাওরের উঁচু অংশে কৃষকদের পাইপের মাধ্যমে দূর থেকে পানি টেনে এনে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি ফসলের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় কৃষক শরিফ উদ্দিন বলেন, মৌসুমের শুরুতে কিছু পানি পাওয়া যায়, কিন্তু পরে আর থাকে না। অনেক টাকা খরচ করে চাষ করি, শেষে যদি পানি না পাই তাহলে সবই লোকসান হয়ে যায়।
কৃষি বিভাগ জানায়, বড়লেখায় বর্তমানে দুটি সৌরচালিত সেচ পাম্প চালু রয়েছে। এর মধ্যে একটি দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নের লক্ষীছড়া গ্রামের মাধবছড়া এলাকায় এবং অন্যটি একই ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের নিকুড়ি ছড়া এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। এসব সোলার সেচ পাম্পের মাধ্যমে আশপাশের কিছু জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও বাড়তে পারে। খাল, ছড়া ও নদী পুনঃখনন, নতুন সেচ নালা খনন, এলএলপি (লো লিফট পাম্প), গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন, সোলার সেচ পাম্প চালু এবং সেচ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে আবাদি জমির পরিমাণ ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

এ বিষয়ে বড়লেখা উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং সেচ সুবিধা সীমিত থাকায় কিছু এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। বোরো ধানে ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে উঠান বৈঠক, কৃষক সভা, লিফলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আগামী দিনে বৃষ্টিপাত হলে সেচের চাপ অনেকটাই কমে আসবে এবং ফলনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে এমন সেচ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বড়লেখায় খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।