ঢাকা ০৫:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৩ টন সমপরিমাণ যৌন উত্তেজক ওষুধ জব্দ, এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা লালপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬ এর উদ্বোধন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে ‘তুরাপ’ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে মালয়েশিয়া মেয়ের স্বামীর সঙ্গে শাশুড়ী ওমরায় যেতে পারবেন? রামপালে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে অপপ্রচার: সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ ৯৯৯-এ ফোন, ঘরের দরজা ভেঙে শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ’ জামায়াত এমপির ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ৯ যুদ্ধের ডামাডোল পেরিয়ে হজে যাচ্ছেন ৩০ হাজার ইরানি ট্রান্সফর্মার চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল যুবকের
সরকারি তেল কোম্পানির আড়াই কোটি টাকা লোপাট

এসএওসিএলে মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেটের ভয়ংকর অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিং চক্র

সরকারি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (এসএওসিএল) ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ চক্রের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। প্রায় আড়াই কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে কোম্পানির এইচআর কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন ও উপ-ব্যবস্থাপক (হিসাব) ও ডিপো ইনচার্জ মোহাম্মদ মাহমুদুল হক। দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি অর্থ লোপাট করেছে।

মামলার এজাহার ও অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮–১৯ অর্থবছরে এসএওসিএলের এলসি সংক্রান্ত লেনদেনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব লেনদেনের পেছনে কোনো বৈধ এলসি খোলা হয়নি কিংবা প্রকৃত সরবরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। কাগজে-কলমে এলসি দেখিয়ে অর্থ ছাড়ের এই প্রক্রিয়াটি ছিল পরিকল্পিত এবং একাধিক ধাপে সাজানো। আর এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হিসাব শাখার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মাহমুদুল হক হিসাব শাখা ও ডিপো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকায় অর্থ ছাড়, চেক ইস্যু, পেমেন্ট ভাউচার প্রস্তুত ও আর্থিক অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে, এইচআর কর্মকর্তা হয়েও আব্দুল্লাহ আল মামুন নিয়মিতভাবে চেক জমাদানকারী হিসেবে সামনে আসেন, যা স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এই অস্বাভাবিক ভূমিকাই তদন্তকারীদের নজর কাড়ে এবং ধীরে ধীরে মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে ভুয়া ও সম্পর্কহীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে চেক ইস্যু করা হয়। গোল্ডেন সিফাত এন্টারপ্রাইজ, আজহার টেলিকম ও মেসার্স মদিনা কোয়ালিটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই অর্থ আত্মসাৎ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসএওসিএলের কোনো বৈধ সরবরাহ চুক্তি বা বাস্তব কার্যক্রম ছিল না। তবুও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি টাকার চেক ইস্যু করা হয় এবং পরে সেই অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর কিংবা নগদে উত্তোলন করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মোট পাঁচটি চেকের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থের মধ্যে তিনটি চেক সরাসরি এসব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা হয় এবং বাকি দুটি চেকের অর্থ নগদে উত্তোলন করা হয়। এই নগদ উত্তোলনের প্রক্রিয়া মানিলন্ডারিংয়ের একটি সুস্পষ্ট আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেক জমা দেওয়ার সময় একই নাম বারবার সামনে এসেছে—আব্দুল্লাহ আল মামুন। একজন এইচআর কর্মকর্তার এমন ভূমিকা প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব লেনদেন কোম্পানির নিয়মিত হিসাব কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছিল। এসএওসিএলের জেভি-০৮ ও জেনারেল লেজারে এসব লেনদেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ হিসাব বইয়ে না তুলে একটি ছায়া আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ লোপাট করা হয়। এতে করে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়মিত অডিট প্রক্রিয়াকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট ভাউচারগুলোতে নিরীক্ষা বিভাগের স্বাক্ষর অনুপস্থিত ছিল। অথচ নিয়ম অনুযায়ী নিরীক্ষা বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো বড় অঙ্কের অর্থ ছাড় হওয়ার কথা নয়। এই অনিয়ম প্রমাণ করে, মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে নিরীক্ষা প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে একটি সমান্তরাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।

দুদকের কর্মকর্তাদের মতে, এই সিন্ডিকেটের কাজ ছিল সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক। প্রথমে এলসি সংক্রান্ত একটি কাগুজে প্রস্তাব তৈরি করা হতো, এরপর সেটিকে হিসাব শাখায় অনুমোদনের পথে নেওয়া হতো। সেই অনুমোদনের ভিত্তিতে চেক ইস্যু করা হতো ভুয়া বা সম্পর্কহীন প্রতিষ্ঠানের নামে। পরে সেই অর্থ নগদে বা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করা হতো। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মামুন ও মাহমুদের ভূমিকা ছিল মুখ্য।

অনুসন্ধানে এসএওসিএলের সাবেক পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেলেও তিনি মৃত্যুবরণ করায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচালনা পর্যায়ের নিরবতা ও তদারকির অভাব ছাড়া এমন একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকা কঠিন।

দুদক মনে করছে, এই মামলার মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির একটি বড় চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেট শুধু অর্থ আত্মসাৎই করেনি, বরং সরকারি অর্থকে মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে আড়াল করার চেষ্টাও করেছে। এ কারণে মামলায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনও যুক্ত করা হয়েছে।

এ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে এসএওসিএলের মতো প্রতিষ্ঠানে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নিরীক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করার দাবি উঠেছে।

দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং সরকারি খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দুর্বলতার প্রতিফলন। মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের একটি দৃষ্টান্তমূলক মামলা হয়ে উঠবে।

বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। আইন অনুযায়ী আদালতের রায়ই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে কে দোষী আর কে নির্দোষ। তবে দুদকের অনুসন্ধান ও মামলার এজাহারে উঠে আসা তথ্যগুলো ইতোমধ্যে এসএওসিএলের ভেতরে গড়ে ওঠা মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেটের কার্যক্রমকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৩ টন সমপরিমাণ যৌন উত্তেজক ওষুধ জব্দ, এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা

সরকারি তেল কোম্পানির আড়াই কোটি টাকা লোপাট

এসএওসিএলে মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেটের ভয়ংকর অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিং চক্র

আপডেট সময় ০৯:০৬:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

সরকারি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (এসএওসিএল) ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ চক্রের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। প্রায় আড়াই কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে কোম্পানির এইচআর কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন ও উপ-ব্যবস্থাপক (হিসাব) ও ডিপো ইনচার্জ মোহাম্মদ মাহমুদুল হক। দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি অর্থ লোপাট করেছে।

মামলার এজাহার ও অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮–১৯ অর্থবছরে এসএওসিএলের এলসি সংক্রান্ত লেনদেনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব লেনদেনের পেছনে কোনো বৈধ এলসি খোলা হয়নি কিংবা প্রকৃত সরবরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। কাগজে-কলমে এলসি দেখিয়ে অর্থ ছাড়ের এই প্রক্রিয়াটি ছিল পরিকল্পিত এবং একাধিক ধাপে সাজানো। আর এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হিসাব শাখার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মাহমুদুল হক হিসাব শাখা ও ডিপো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকায় অর্থ ছাড়, চেক ইস্যু, পেমেন্ট ভাউচার প্রস্তুত ও আর্থিক অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে, এইচআর কর্মকর্তা হয়েও আব্দুল্লাহ আল মামুন নিয়মিতভাবে চেক জমাদানকারী হিসেবে সামনে আসেন, যা স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এই অস্বাভাবিক ভূমিকাই তদন্তকারীদের নজর কাড়ে এবং ধীরে ধীরে মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে ভুয়া ও সম্পর্কহীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে চেক ইস্যু করা হয়। গোল্ডেন সিফাত এন্টারপ্রাইজ, আজহার টেলিকম ও মেসার্স মদিনা কোয়ালিটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই অর্থ আত্মসাৎ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসএওসিএলের কোনো বৈধ সরবরাহ চুক্তি বা বাস্তব কার্যক্রম ছিল না। তবুও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি টাকার চেক ইস্যু করা হয় এবং পরে সেই অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর কিংবা নগদে উত্তোলন করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মোট পাঁচটি চেকের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থের মধ্যে তিনটি চেক সরাসরি এসব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা হয় এবং বাকি দুটি চেকের অর্থ নগদে উত্তোলন করা হয়। এই নগদ উত্তোলনের প্রক্রিয়া মানিলন্ডারিংয়ের একটি সুস্পষ্ট আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেক জমা দেওয়ার সময় একই নাম বারবার সামনে এসেছে—আব্দুল্লাহ আল মামুন। একজন এইচআর কর্মকর্তার এমন ভূমিকা প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব লেনদেন কোম্পানির নিয়মিত হিসাব কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছিল। এসএওসিএলের জেভি-০৮ ও জেনারেল লেজারে এসব লেনদেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ হিসাব বইয়ে না তুলে একটি ছায়া আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ লোপাট করা হয়। এতে করে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়মিত অডিট প্রক্রিয়াকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট ভাউচারগুলোতে নিরীক্ষা বিভাগের স্বাক্ষর অনুপস্থিত ছিল। অথচ নিয়ম অনুযায়ী নিরীক্ষা বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো বড় অঙ্কের অর্থ ছাড় হওয়ার কথা নয়। এই অনিয়ম প্রমাণ করে, মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে নিরীক্ষা প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে একটি সমান্তরাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।

দুদকের কর্মকর্তাদের মতে, এই সিন্ডিকেটের কাজ ছিল সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক। প্রথমে এলসি সংক্রান্ত একটি কাগুজে প্রস্তাব তৈরি করা হতো, এরপর সেটিকে হিসাব শাখায় অনুমোদনের পথে নেওয়া হতো। সেই অনুমোদনের ভিত্তিতে চেক ইস্যু করা হতো ভুয়া বা সম্পর্কহীন প্রতিষ্ঠানের নামে। পরে সেই অর্থ নগদে বা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করা হতো। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মামুন ও মাহমুদের ভূমিকা ছিল মুখ্য।

অনুসন্ধানে এসএওসিএলের সাবেক পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেলেও তিনি মৃত্যুবরণ করায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচালনা পর্যায়ের নিরবতা ও তদারকির অভাব ছাড়া এমন একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকা কঠিন।

দুদক মনে করছে, এই মামলার মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির একটি বড় চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেট শুধু অর্থ আত্মসাৎই করেনি, বরং সরকারি অর্থকে মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে আড়াল করার চেষ্টাও করেছে। এ কারণে মামলায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনও যুক্ত করা হয়েছে।

এ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে এসএওসিএলের মতো প্রতিষ্ঠানে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নিরীক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করার দাবি উঠেছে।

দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং সরকারি খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দুর্বলতার প্রতিফলন। মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের একটি দৃষ্টান্তমূলক মামলা হয়ে উঠবে।

বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। আইন অনুযায়ী আদালতের রায়ই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে কে দোষী আর কে নির্দোষ। তবে দুদকের অনুসন্ধান ও মামলার এজাহারে উঠে আসা তথ্যগুলো ইতোমধ্যে এসএওসিএলের ভেতরে গড়ে ওঠা মামুন–মাহমুদ সিন্ডিকেটের কার্যক্রমকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।