কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এখন বিতর্ক ও অস্বস্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার ও প্রকল্প পরিচালক মোঃ নওয়াব আলীকে কেন্দ্র করে একাধিক প্রশাসনিক অনিয়ম, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্ররা এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তদন্তে দেখা গেছে, মোঃ নওয়াব আলী প্রথমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-রেজিস্ট্রার পদে চাকুরীরত ছিলেন। ১৫ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে তিনি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন এবং ২২ মার্চ ২০১১ তারিখ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১ তারিখে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান। অফিস আদেশ নং প্রশাঃ/ইবি-২০১১/৪২৫৮, ২১ মার্চ ২০১১ অনুযায়ী তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া হইতে ছাড়পত্র গ্রহণ করেন। ২৩ মার্চ ২০১১ তারিখে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন এবং বিভিন্ন সময়ে ছুটি নিয়ে ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরি করেন। ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে তিনি পুনরায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। তবে-তৎকালিন সরকারি চাকুরি বিধি (পার্ট-১, বিধি-১৭) অনুযায়ী এই যোগদান অবৈধ। অনুসন্ধানী রিপোর্টে দেখা যায় যে,, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪ হইতে অদ্যবধি তারকর্তৃক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রহণকৃত বেতন ও ভাতা ও অবৈধ। ইউজিসি কর্তৃক গঠিত একটি তদন্ত কমিটি, যার সভাপতি ছিলেন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খান, অন্য দুইজন সদস্যের সঙ্গে মোঃ নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করলেও তা অদ্যবধি বাস্তবায়ন হয়নি।
জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের পর নতুন প্রশাসন নিয়োগপ্রাপ্ত হলে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা পূর্বের সকল দুর্নীতি বিচার করার দাবি জানান। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। চলতি বছরের ২৮ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিগত ১৫ বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবেদন উপদেষ্টার নিকট দাখিলের জন্য নির্দেশনা জারি করে। তবে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়ে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেনি।
ক্যাম্পাসের একাধিক শিক্ষক দাবি করেন, নওয়াব আলী আগের সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছিলেন। ভিসির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকায় নতুন প্রশাসনেরও তিনি আস্থাভাজন। একজন সিনিয়র শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নওয়াব আলী খান আগের সরকারের সময়ে বিশেষ সুবিধায় ছিলেন।
এটা ক্যাম্পাসের সবাই জানে। প্রশ্ন হচ্ছে, পটপরিবর্তনের পরও তিনি কীভাবে একই ক্ষমতায় বহাল থাকলেন?” ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, পটপরিবর্তনের পর প্রায় সকল প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন আনা হলেও প্রকল্প পরিচালকের পদে যোগ্য লোক বিশ্ববিদ্যালয়ে না থাকার অজুহাত দেখিয়ে নওয়াব আলীকে বহাল রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাব-এর সভাপতি প্রফেসর ড. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, “এটি নিয়ে অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে সকল ছাত্রসংগঠন নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে। আমরা শুরু থেকেই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছি। আজও আমরা বলেছি, কোনো ফ্যাসিস্ট যেন পদে না থাকে।” উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র জানায়, নওয়াব আলী ২০২২ সালের ৩০ জুন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি ৫৩৭ কোটি ৭ লক্ষ টাকার মেগা প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন। এই প্রকল্পগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ক্ষমতাশালী অবস্থান ক্যাম্পাসে ব্যাপক প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। ফ্যাসিস্ট শাসনের সময়ে নওয়াব আলী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া বিল তৈরি এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মে তার নাম উঠে এসেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. আলাউদ্দিনের সময়ে নিয়োগ নীতিমালা ভঙ্গ করে তার স্ত্রীকে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও আছে।
জুলাই অভ্যুত্থান বিরোধী কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণের পর ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১তম সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৩০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় এবং ৩৩ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সনদ বাতিল করা হয়। তবে ভাইস চ্যান্সেলর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর আস্থাভাজন হওয়ায় নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফাইল গায়েবের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুসারে, ৬ মার্চ ছুটির দিনে নওয়াব আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফাইলপত্র তিনটি মিনি ব্যাগ ও একটি বড় বস্তায় ভরে ক্যাম্পাসের বাহিরে নিয়ে যান। এ সময়ে প্রধান ফটক ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়। গোপনে প্রধান প্রকৌশলীর গাড়ি ব্যবহার করে তিনি ডরমিটরির সংলগ্ন ২ নম্বর গেট দিয়ে ফাইলপত্র ক্যাম্পাসের বাইরে বের করেন।
দুই বছর আগে তৃতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পের বিলে সোয়া ছয় কোটি টাকার ভুয়া বিলের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। নওয়াব আলীসহ কয়েকজন প্রকৌশলী, কর্মকর্তা এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এতে জড়িত ছিলেন। তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. শেখ আব্দুল সালাম ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। পরবর্তী বছরের ৯ মার্চ জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে নওয়াব আলীসহ সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি এমপ্লয়ি ইফিসিয়েন্সি এন্ড ডিসিপ্লিন রুলস’ অনুযায়ী তদন্ত কমিটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা উল্লেখ করেনি। ফলে প্রশাসন তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। পরবর্তীতে আরও তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট শাস্তির জন্য আরেকটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর পটপরিবর্তনের কারণে ওই কমিটি কোনো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন প্রশাসন নিয়োগপ্রাপ্ত হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা পূর্বের সকল দুর্নীতি বিচার করার জন্য দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের চরম অনিহা এবং স্বার্থসংক্রান্ত কারণে এই দাবিগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। এদিকে চলতি বছরের ২৮ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পের বিগত ১৫ বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবেদন উপদেষ্টার নিকট দাখিলের নির্দেশনা দিয়েছে। তবে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী প্রশাসন এই বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি।
ক্যাম্পাসের একাধিক শিক্ষক দাবি করেন, নওয়াব আলী পূর্ববর্তী সরকারে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে সুবিধাজনক প্রশাসনিক অবস্থানে ছিলেন। ভিসির সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকায় তিনি নতুন প্রশাসনেরও আস্থাভাজন হিসেবে বহাল আছেন। একজন সিনিয়র শিক্ষক বলেন, “নওয়াব আলী খান আগের সরকারের সময়ে বিশেষ সুবিধায় ছিলেন, এটি ক্যাম্পাসের সবাই জানে। প্রশ্ন হচ্ছে, পটপরিবর্তনের পরও তিনি একই ক্ষমতায় বহাল থাকলেন কীভাবে?”
ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যেও এই নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, পটপরিবর্তনের পর প্রায় সকল প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন আনা হলেও প্রকল্প পরিচালকের পদে যোগ্য লোক বিশ্ববিদ্যালয়ে না থাকার অজুহাত দেখিয়ে নওয়াব আলীকে বহাল রাখা হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে ছাত্র-শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও রিসিভ করেননি। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্রদের মধ্যে তীব্র আস্থা ক্ষুণ্ণতা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিমূলক কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, সরকারি নির্দেশনা এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের মাধ্যমে কত সহজেই প্রশাসনিক পদে প্রভাবশালী অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, এই বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















