ঢাকা ০৫:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৩ টন সমপরিমাণ যৌন উত্তেজক ওষুধ জব্দ, এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা লালপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬ এর উদ্বোধন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে ‘তুরাপ’ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে মালয়েশিয়া মেয়ের স্বামীর সঙ্গে শাশুড়ী ওমরায় যেতে পারবেন? রামপালে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে অপপ্রচার: সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ ৯৯৯-এ ফোন, ঘরের দরজা ভেঙে শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ’ জামায়াত এমপির ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ৯ যুদ্ধের ডামাডোল পেরিয়ে হজে যাচ্ছেন ৩০ হাজার ইরানি ট্রান্সফর্মার চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল যুবকের

নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামকে ঘিরে ‘আগে কাজ, পরে টেন্ডার’ অভিযোগ

রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ যেন ধীরে ধীরে তার প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র হারিয়ে এক বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত ঠিকাদারি বলয়ে পরিণত হচ্ছে—এমন গুরুতর অভিযোগে এখন উত্তাল পুরো ঠিকাদার মহল। রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে নিয়মনীতি, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থার বদলে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত সম্পর্কই যেন কাজ পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা হয়ে উঠেছে। এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের আগাম কাজ ভাগ করে দেওয়া, পরে লোক দেখানো দরপত্র আয়োজন, ই-জিপি ব্যবস্থাকে কার্যত অকার্যকর করে তোলা এবং কোটি কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ নির্দিষ্ট কয়েকজনের হাতে তুলে দেওয়ার মতো বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।

বঞ্চিত ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ এখন আর একটি স্বাভাবিক সরকারি দপ্তর হিসেবে কাজ করছে না। বরং এটি পরিণত হয়েছে একটি “নিশ্চিত ঠিকাদারি স্বর্গে”, যেখানে কারা কাজ পাবে, কোন কাজ কার ঝুলিতে যাবে—তা দরপত্র আহ্বানের আগেই নীরবে নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে। দরপত্র প্রক্রিয়া সেখানে কেবল নিয়মরক্ষার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। যারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম মেনে ই-জিপিতে অংশগ্রহণ করে আসছেন, যাদের অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ।

গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার জরুরি সংস্কার, মেরামত ও উন্নয়নকাজের জন্য প্রায় ১০ কোটি টাকার বরাদ্দ পেয়েছে। এই বরাদ্দের আওতায় আদালত ভবন, কারাগার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সার্কিট হাউসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ব্যয় না হয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই কাজ শুরু হয়ে যাচ্ছে আগেই, পরে ই-জিপিতে টেন্ডার দেখানো হচ্ছে কেবল কাগজে-কলমে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, তাঁরা নিয়মিত ই-জিপি পোর্টালে দরপত্র জমা দিলেও রহস্যজনকভাবে বারবার বাদ পড়ছেন। কেউ কেউ টেকনিক্যাল কারণে বাতিল হচ্ছেন, কেউ আবার সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পাচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, কাজের ভাগ নাকি আগেই নির্ধারিত থাকে, ফলে দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য ঠিকাদাররা কার্যত ‘ডামি প্রতিযোগী’তে পরিণত হচ্ছেন। একজন ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ লোকদের হাতে কোটি টাকার কাজ তুলে দেওয়া হচ্ছে, আর যারা নিয়ম জানে, কাজ বোঝে, তারা একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের কর্মজীবন ও রাজশাহীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে অভিযোগের প্রেক্ষাপটে। নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও বাবার চাকরিসূত্রে ছোটবেলায় তিনি রাজশাহীতে আসেন এবং এখানেই তাঁর পড়াশোনা সম্পন্ন হয়। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি গণপূর্ত বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। কর্মজীবনের প্রায় ১৬ বছর তিনি রাজশাহীতেই দায়িত্ব পালন করেছেন। মাঝখানে স্বল্প সময়ের জন্য বদলি হলেও সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে আবার রাজশাহীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। অভিযোগকারীদের মতে, এই দীর্ঘ অবস্থানকালে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত যোগাযোগ, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের নেটওয়ার্কই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা সরকারি দপ্তরের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো, আদালত ভবনের সংস্কারকাজে আত্মীয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ভবনের প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার সংস্কারকাজ পেয়েছেন মো. রফিক নামের এক ঠিকাদার। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের স্ত্রীর আপন চাচাতো ভাই। শুধু একটি কাজ নয়, একই ঠিকাদার গণপূর্ত বিভাগের জোন কার্যালয়ের ছাদ সংস্কার ও টাইলস বসানোর আরও দুটি কাজ করছেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া রাশেদুল ইসলামের আরেক নিকটাত্মীয় ফয়সাল কবির রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরের একটি সংস্কারকাজ পেয়েছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে।

ঠিকাদারদের দাবি, এসব কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা বা পূর্ববর্তী কাজের রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বরং আত্মীয়তার সম্পর্কই এখানে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের প্রশ্ন, একজন নির্বাহী প্রকৌশলী কীভাবে নিজের নিকটাত্মীয়দের কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্তে জড়িত থাকতে পারেন, যখন সরকারি বিধি ও নৈতিকতা সেখানে স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর কথা স্পষ্টভাবে বলে?

এছাড়াও আরও বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে, রাজশাহীর সার্কিট হাউস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংস্কারকাজ টেন্ডার হওয়ার আগেই নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইয়াসির আরাফাতকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। বঞ্চিত ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কাজের বিষয়ে ভেতরে ভেতরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, এখন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে টেন্ডার দেখানো হবে। তাঁদের দাবি, যাঁদের কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাঁদের অনেকেরই সংশ্লিষ্ট ধরনের কাজে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা নেই। তবুও বিশেষ পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার কারণে তাঁরা একের পর এক কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে রাজশাহীর ঠিকাদার মহলে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন, কারণ তাঁদের আশঙ্কা—প্রতিবাদ করলে ভবিষ্যতে সব ধরনের কাজ থেকে আরও বেশি বঞ্চিত হতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, এখানে এখন অযোগ্যরা রাজা হয়ে গেছে, আর যোগ্যরা দাঁড়িয়ে আছে লাইনের বাইরে। সরকারি কাজের মান নিয়েও আমরা শঙ্কিত। কারণ অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু পরিচয়ের জোরে কাজ পেলে সেই কাজের গুণগত মান বজায় থাকবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের কার্যালয়ে গেলে সেখানে একাধিক ঠিকাদারের উপস্থিতি দেখা যায়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, যারা কাজ পেয়েছে, তারা আগে থেকেই ঠিকাদার এবং ই-জিপি প্রক্রিয়ায় যে যোগ্য, সেই কাজ পায়। গোপন দরপত্র ফাঁস বা আগাম কাজ ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগও তিনি নাকচ করেন। তবে অনিয়ম সংক্রান্ত প্রশ্নে তাঁর আরেকটি বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, “আপনারা আর কোনো নিউজ পান না? শুধু আমাকে পেয়েছেন? আপনি নিউজ করেন, আমার কিছু হবে না।” এই বক্তব্যকে অনেকেই দম্ভপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেছেন এবং মনে করছেন, এতে অভিযোগকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।

অন্যদিকে, তাঁর আত্মীয় ঠিকাদার মো. রফিক বলেন, জরুরি মেরামতকাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় কাজ শুরু হয় আগে, পরে টেন্ডার হয়—এটা নতুন কিছু নয়। তবে আইন ও দরপত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্য দরপত্র আইন ও সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি পরিপন্থী। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আগে কাজ, পরে টেন্ডার’ সংস্কৃতি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতার ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং এটি গুরুতর অনিয়মের শামিল।

উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াও এসেছে এ বিষয়ে। রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল গোফফার বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যে কেউ অংশ নিতে পারেন, আত্মীয় হলেও সেখানে বাধা নেই। তবে গোপন দরপত্র ফাঁস বা অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তাঁর এই বক্তব্যে বঞ্চিত ঠিকাদাররা পুরোপুরি আশ্বস্ত নন। তাঁদের মতে, শুধু ‘খতিয়ে দেখা হবে’ বললেই হবে না, বরং নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করতে হবে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ কি সত্যিই একটি পরিবারের বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ঠিকাদারি আড্ডাখানায় পরিণত হচ্ছে? ই-জিপি ব্যবস্থা কি এখানে কেবল লোক দেখানো নিয়মে পরিণত হয়েছে? কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কি কার্যকর ভূমিকা নেবে, নাকি এসব অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যাবে? বঞ্চিত ঠিকাদারদের পাশাপাশি সচেতন মহলও মনে করছেন, এই অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত না করা হলে শুধু গণপূর্ত বিভাগ নয়, পুরো সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিই এখন জোরালো হয়ে উঠছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৩ টন সমপরিমাণ যৌন উত্তেজক ওষুধ জব্দ, এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা

নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামকে ঘিরে ‘আগে কাজ, পরে টেন্ডার’ অভিযোগ

আপডেট সময় ০৮:২৯:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ যেন ধীরে ধীরে তার প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র হারিয়ে এক বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত ঠিকাদারি বলয়ে পরিণত হচ্ছে—এমন গুরুতর অভিযোগে এখন উত্তাল পুরো ঠিকাদার মহল। রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে নিয়মনীতি, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থার বদলে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত সম্পর্কই যেন কাজ পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা হয়ে উঠেছে। এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের আগাম কাজ ভাগ করে দেওয়া, পরে লোক দেখানো দরপত্র আয়োজন, ই-জিপি ব্যবস্থাকে কার্যত অকার্যকর করে তোলা এবং কোটি কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ নির্দিষ্ট কয়েকজনের হাতে তুলে দেওয়ার মতো বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।

বঞ্চিত ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ এখন আর একটি স্বাভাবিক সরকারি দপ্তর হিসেবে কাজ করছে না। বরং এটি পরিণত হয়েছে একটি “নিশ্চিত ঠিকাদারি স্বর্গে”, যেখানে কারা কাজ পাবে, কোন কাজ কার ঝুলিতে যাবে—তা দরপত্র আহ্বানের আগেই নীরবে নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে। দরপত্র প্রক্রিয়া সেখানে কেবল নিয়মরক্ষার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। যারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম মেনে ই-জিপিতে অংশগ্রহণ করে আসছেন, যাদের অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ।

গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার জরুরি সংস্কার, মেরামত ও উন্নয়নকাজের জন্য প্রায় ১০ কোটি টাকার বরাদ্দ পেয়েছে। এই বরাদ্দের আওতায় আদালত ভবন, কারাগার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সার্কিট হাউসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ব্যয় না হয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই কাজ শুরু হয়ে যাচ্ছে আগেই, পরে ই-জিপিতে টেন্ডার দেখানো হচ্ছে কেবল কাগজে-কলমে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, তাঁরা নিয়মিত ই-জিপি পোর্টালে দরপত্র জমা দিলেও রহস্যজনকভাবে বারবার বাদ পড়ছেন। কেউ কেউ টেকনিক্যাল কারণে বাতিল হচ্ছেন, কেউ আবার সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পাচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, কাজের ভাগ নাকি আগেই নির্ধারিত থাকে, ফলে দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য ঠিকাদাররা কার্যত ‘ডামি প্রতিযোগী’তে পরিণত হচ্ছেন। একজন ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ লোকদের হাতে কোটি টাকার কাজ তুলে দেওয়া হচ্ছে, আর যারা নিয়ম জানে, কাজ বোঝে, তারা একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের কর্মজীবন ও রাজশাহীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে অভিযোগের প্রেক্ষাপটে। নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও বাবার চাকরিসূত্রে ছোটবেলায় তিনি রাজশাহীতে আসেন এবং এখানেই তাঁর পড়াশোনা সম্পন্ন হয়। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি গণপূর্ত বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। কর্মজীবনের প্রায় ১৬ বছর তিনি রাজশাহীতেই দায়িত্ব পালন করেছেন। মাঝখানে স্বল্প সময়ের জন্য বদলি হলেও সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে আবার রাজশাহীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। অভিযোগকারীদের মতে, এই দীর্ঘ অবস্থানকালে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত যোগাযোগ, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের নেটওয়ার্কই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা সরকারি দপ্তরের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো, আদালত ভবনের সংস্কারকাজে আত্মীয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ভবনের প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার সংস্কারকাজ পেয়েছেন মো. রফিক নামের এক ঠিকাদার। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের স্ত্রীর আপন চাচাতো ভাই। শুধু একটি কাজ নয়, একই ঠিকাদার গণপূর্ত বিভাগের জোন কার্যালয়ের ছাদ সংস্কার ও টাইলস বসানোর আরও দুটি কাজ করছেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া রাশেদুল ইসলামের আরেক নিকটাত্মীয় ফয়সাল কবির রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরের একটি সংস্কারকাজ পেয়েছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে।

ঠিকাদারদের দাবি, এসব কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা বা পূর্ববর্তী কাজের রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বরং আত্মীয়তার সম্পর্কই এখানে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের প্রশ্ন, একজন নির্বাহী প্রকৌশলী কীভাবে নিজের নিকটাত্মীয়দের কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্তে জড়িত থাকতে পারেন, যখন সরকারি বিধি ও নৈতিকতা সেখানে স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর কথা স্পষ্টভাবে বলে?

এছাড়াও আরও বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে, রাজশাহীর সার্কিট হাউস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংস্কারকাজ টেন্ডার হওয়ার আগেই নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইয়াসির আরাফাতকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। বঞ্চিত ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কাজের বিষয়ে ভেতরে ভেতরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, এখন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে টেন্ডার দেখানো হবে। তাঁদের দাবি, যাঁদের কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাঁদের অনেকেরই সংশ্লিষ্ট ধরনের কাজে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা নেই। তবুও বিশেষ পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার কারণে তাঁরা একের পর এক কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে রাজশাহীর ঠিকাদার মহলে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন, কারণ তাঁদের আশঙ্কা—প্রতিবাদ করলে ভবিষ্যতে সব ধরনের কাজ থেকে আরও বেশি বঞ্চিত হতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, এখানে এখন অযোগ্যরা রাজা হয়ে গেছে, আর যোগ্যরা দাঁড়িয়ে আছে লাইনের বাইরে। সরকারি কাজের মান নিয়েও আমরা শঙ্কিত। কারণ অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু পরিচয়ের জোরে কাজ পেলে সেই কাজের গুণগত মান বজায় থাকবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের কার্যালয়ে গেলে সেখানে একাধিক ঠিকাদারের উপস্থিতি দেখা যায়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, যারা কাজ পেয়েছে, তারা আগে থেকেই ঠিকাদার এবং ই-জিপি প্রক্রিয়ায় যে যোগ্য, সেই কাজ পায়। গোপন দরপত্র ফাঁস বা আগাম কাজ ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগও তিনি নাকচ করেন। তবে অনিয়ম সংক্রান্ত প্রশ্নে তাঁর আরেকটি বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, “আপনারা আর কোনো নিউজ পান না? শুধু আমাকে পেয়েছেন? আপনি নিউজ করেন, আমার কিছু হবে না।” এই বক্তব্যকে অনেকেই দম্ভপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেছেন এবং মনে করছেন, এতে অভিযোগকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।

অন্যদিকে, তাঁর আত্মীয় ঠিকাদার মো. রফিক বলেন, জরুরি মেরামতকাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় কাজ শুরু হয় আগে, পরে টেন্ডার হয়—এটা নতুন কিছু নয়। তবে আইন ও দরপত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্য দরপত্র আইন ও সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি পরিপন্থী। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আগে কাজ, পরে টেন্ডার’ সংস্কৃতি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতার ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং এটি গুরুতর অনিয়মের শামিল।

উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াও এসেছে এ বিষয়ে। রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল গোফফার বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যে কেউ অংশ নিতে পারেন, আত্মীয় হলেও সেখানে বাধা নেই। তবে গোপন দরপত্র ফাঁস বা অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তাঁর এই বক্তব্যে বঞ্চিত ঠিকাদাররা পুরোপুরি আশ্বস্ত নন। তাঁদের মতে, শুধু ‘খতিয়ে দেখা হবে’ বললেই হবে না, বরং নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করতে হবে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ কি সত্যিই একটি পরিবারের বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ঠিকাদারি আড্ডাখানায় পরিণত হচ্ছে? ই-জিপি ব্যবস্থা কি এখানে কেবল লোক দেখানো নিয়মে পরিণত হয়েছে? কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কি কার্যকর ভূমিকা নেবে, নাকি এসব অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যাবে? বঞ্চিত ঠিকাদারদের পাশাপাশি সচেতন মহলও মনে করছেন, এই অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত না করা হলে শুধু গণপূর্ত বিভাগ নয়, পুরো সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিই এখন জোরালো হয়ে উঠছে।