বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের ভাঙন নতুনভাবে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও বরিশাল গণপূর্তে বিতর্ক থামছে না। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করে চলেছেন এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন। অভিযোগের সূত্রে জানা গেছে, তিনি সরকারি দায়িত্বে থাকাকালীন নৌকার ব্যাজ পরতেন এবং নিজেকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পদ ও প্রভাব ধরে রাখতে তিনি নানা কৌশল অবলম্বন করছেন বলে অভিযোগ তুলেছে সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক ঘরানার সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখানোর চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেছেন ঠিকাদাররা। বরিশাল গণপূর্তের ঠিকাদারদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রকল্প পাইয়ে দিচ্ছেন। এতে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষভাবে অভিযোগ উঠেছে যে, খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙে একচেটিয়াভাবে কাজ পাচ্ছে।
একজন সাধারণ ঠিকাদার আব্দুর রহিম জানিয়েছেন, ঝালকাঠিতে থাকার সময় যেমন অনিয়মের অভিযোগ ছিল, বরিশালেও তা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙে কাজ পাচ্ছে। আরেক ঠিকাদার তসলিম মৃধা বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করতেন। এখনো গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিচ্ছেন। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে গণপূর্তে সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেখানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বরিশাল গণপূর্তের একাধিক প্রকল্পের টেন্ডারে ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগে দরপত্র বাতিল করা হলেও পরবর্তীতে যৌথ উদ্যোগ দেখিয়ে একই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এতে টেন্ডারের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদাররা অভিযোগ করেছেন, গণপূর্ত কার্যালয়ে এই বিষয়ে প্রতিবাদ করলে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয় এবং বিরোধিতাকারীদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে একজন ঠিকাদার এটিএম আশরাফুল হক রিপন জানিয়েছেন, তিনি শুধু ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে টেন্ডারে অংশ নিচ্ছে সে প্রশ্ন তুলেছেন, কাউকে লাঞ্ছিত করা হয়নি। অন্যদিকে মো. ফয়সাল আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কয়েকজন ঠিকাদার তার কার্যালয়ে এসে হুমকি দিয়েছেন।
৩২তম বিসিএসের কর্মকর্তা মো. ফয়সাল আলম ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঝালকাঠিতে থাকা অবস্থায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য এবং নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমের অভিযোগে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। একপর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। বরিশালে বদলি হওয়ার পরও ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী অনিয়ম অব্যাহত আছে।
২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ফয়সাল আলম বরিশালের নবগঠিত ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি নিয়েও ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদার মহলে আলোচনা–সমালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই পদ গ্রহণের মাধ্যমে তার প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করা, সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নষ্ট করছে। বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।
একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, বরিশাল গণপূর্তে প্রকল্পে অংশ নিতে হলে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গোপন চুক্তি করতে হয়। এতে সাধারণ ঠিকাদারদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। একজন ঠিকাদার বলেন, আমরা নিয়ম মেনে টেন্ডারে অংশ নিচ্ছি, কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা সত্ত্বেও কাজ পাচ্ছে। এটি সাধারণ ঠিকাদারের জন্য অবিচার।
সংবাদ প্রকাশের আগে মো. ফয়সাল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বরিশাল গণপূর্তে ওঠা এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, বরিশাল গণপূর্তের প্রকল্পগুলোতে ঠিকাদারদের মধ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নেই। নিয়ম ভঙ্গ করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়া হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে স্থানীয় ঠিকাদারদের সুযোগ-সুবিধা সীমিত হচ্ছে। একাধিক প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আগে ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি দেখাতে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে কাজ পেয়েছে। এতে সাধারণ ঠিকাদাররা ক্ষুব্ধ।
এছাড়াও ঠিকাদারদের অভিযোগ, বরিশাল গণপূর্তে তাদের বারবার প্রতিক্রিয়া জানানো সত্ত্বেও অভিযোগের কোনো কার্যকর সমাধান করা হয়নি। বরং অভিযোগ করা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে হুমকি ও দমনচেষ্টা চলছে। একজন ঠিকাদার বলেছেন, “আমরা শুধু সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও নিয়মের সঠিক প্রয়োগ চাই। কিন্তু বরাবর আমাদের প্রতিবাদকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করা এবং টেন্ডারে সুবিধা দেওয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নষ্ট করছে। বিশেষ করে এই ধরনের অভিযোগ যদি দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকে, তবে তা সরকারি প্রকল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে।
বরিশাল গণপূর্তে ঠিকাদারদের অভিযোগের সঙ্গে ফয়সাল আলমের বক্তব্যের পার্থক্যও স্পষ্ট। তিনি দাবি করেছেন, ঠিকাদাররা তার অফিসে এসে হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে ঠিকাদাররা বলছেন, তারা কেবল টেন্ডারের নিয়ম ও শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো ধরনের হুমকি বা লাঞ্ছনের ঘটনা ঘটেনি।
বরিশাল গণপূর্তের অতীত অভিজ্ঞতাও বিষয়টিকে জটিল করেছে। ঝালকাঠিতে থাকার সময়ও তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছিল। তবে আদালত বা দুদক এই অভিযোগের প্রমাণ পায়নি। বরিশালে বদলি হওয়ার পরও ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে।
বরিশাল গণপূর্তের কর্মপরিবেশে এই ধরনের বিতর্ক ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতাকে প্রভাবিত করছে। অনেক ঠিকাদার মনে করেন, প্রকৌশলীর রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার প্রভাব প্রকল্পে অসংগতি এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব। আর তার মাধ্যমে স্থানীয় ঠিকাদারদের অধিকার ও সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা রক্ষা করা যাবে। জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সরকার দ্রুত বিষয়টি যাচাই করবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে, যাতে সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় থাকে।
বরিশাল গণপূর্তের এই বিতর্ক স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নজর কাড়ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের পক্ষে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে এটি সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাবের বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। ঠিকাদাররা জানিয়েছেন, তারা সরকারি প্রকল্পে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও নিয়ম অনুযায়ী কাজ পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
বরিশাল গণপূর্তে প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি রক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এই বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখা ও সাধারণ ঠিকাদারদের অধিকার সুরক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলেছেন, বরিশাল গণপূর্তে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা শুধু সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা নয়, বরং স্থানীয় ঠিকাদারদের আস্থা ও কার্যকর প্রশাসনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















