বুড়িচং উপজেলায় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআরও) জোবায়ের হাসানের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ঠিকাদার, সাংবাদিক এবং সচেতন নাগরিকদের দাবি—উক্ত কর্মকর্তা ২০২৪ু২৫ অর্থবছর এবং চলতি অর্থবছরে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য, অস্বচ্ছতা এবং স্বার্থান্বেষী কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, সরকারি প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব, নাম-বেনামের প্রকল্প তালিকা জানতে চাওয়া হলে পিআরও সরাসরি তথ্য প্রদান না করে নিজের পরিচিত একজন গণমাধ্যম কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেন। একাধিক সাংবাদিক ও নাগরিক প্রশ্ন তুলেছেন, “সরকারি প্রকল্পের তথ্য কি একজন সাংবাদিক দেবেন, নাকি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা?” তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে এই আচরণকে দেখা হচ্ছে।
তথ্য গোপনের অভিযোগ
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বহুবার তথ্য চেয়েও তা পাননি। একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা প্রকল্পের ব্যয় ও অনুমোদন সংক্রান্ত তথ্য জানতে চেয়েছি। কিন্তু পিআরও জোবায়ের হাসান তথ্য সরবরাহ না করে নিজের লোক দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
অন্য একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, “সরকারি প্রকল্পে জনগণের টাকার স্বচ্ছ ব্যয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব পিআরও-এর। কিন্তু আমরা দেখছি, তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। আমাদের অনুরোধ উপেক্ষা করা হচ্ছে, এবং প্রকল্পের তথ্য গোপন করা হচ্ছে।”
সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, সরকারি প্রকল্পের তথ্য জনগণের কাছে স্বচ্ছভাবে পৌঁছানো কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে দিকনির্দেশ ও সহযোগিতা দেওয়ার দায়িত্বও সরকারি কর্মকর্তার।
কমিশন বাণিজ্য ও অস্বচ্ছ প্রকল্প অনুমোদন
উপজেলার বেশ কিছু ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, পিআরও জোবায়ের হাসান প্রকল্প অনুমোদন এবং বিল-ভাউচার ছাড়ের ক্ষেত্রে কমিশন বাণিজ্য করেছেন। একাধিক ঠিকাদারের দাবি—যারা কমিশন দিতে অস্বীকার করেছেন, তাদের প্রকল্প স্থগিত বা বাতিল হয়েছে।
একজন ঠিকাদার বলেন, “প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগে বা বিলের অনুমোদন নেওয়ার আগে কমিশন দিতে বাধ্য করা হয়েছে। যারা দিতে অস্বীকার করেছেন, তাদের প্রকল্প আটকে দেওয়া হয়েছে। এটা স্থানীয় উন্নয়নের জন্য বিপজ্জনক।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও অভিযোগ করেছেন, “একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন আচরণ স্থানীয় উন্নয়নের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে। জনগণের কল্যাণের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
সাংবাদিক ও স্থানীয় জনগণের দৃষ্টিকোণ
স্থানীয় সাংবাদিকরা অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে, প্রকল্পের তথ্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও প্রকৃত তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব সরকারি কর্মকর্তার। এক সাংবাদিক বলেন, “আমরা কেবল তথ্য সংগ্রহ করি এবং তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিই। কিন্তু পিআরও জোবায়ের হাসানের এমন আচরণ সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।”
সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা, জনগণের তথ্য অধিকার এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এমন আচরণ উন্নয়ন কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি
বুড়িচং উপজেলার সচেতন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরাও উক্ত অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, “সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া যদি দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ডে আক্রান্ত হয়, তাহলে জনগণের কল্যাণমূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। আমরা চাই, জোবায়ের হাসানের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।”
এক নাগরিক জানান, “উন্নয়ন বাজেট জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করার জন্য বরাদ্দ করা হয়। যদি একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থে তা ব্যবহার করেন, তাহলে পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের দাবি, দায়বদ্ধ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হোক।”
বেনামের অর্থ সম্পদের চাঞ্চল্যকর তথ্য
সম্প্রতি জোবায়ের হাসানের নামে বেনামের অর্থ সম্পদের তথ্য খুঁজতে গিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যা স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। যদিও এই তথ্যের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই হয়নি, তবে স্থানীয় সাংবাদিক ও নাগরিকরা এর স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় একজন নাগরিক বলেন, “যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ রয়েছে, তার সম্পদের উৎস ও প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা অপরিহার্য। এটি না হলে স্থানীয় জনগণের আস্থা হারাবে।”
প্রভাব ও প্রশাসনের দায়িত্ব
এই ঘটনায় শুধু স্থানীয় ঠিকাদার বা নাগরিকরাই উদ্বিগ্ন নন, স্থানীয় প্রশাসনও সতর্ক হয়ে উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে কর্তৃপক্ষকে তদন্ত শুরু করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে জানানো হয়েছে, “অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে। যথাযথ তদন্ত হলে প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আসবে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেন, “উন্নয়ন কার্যক্রমকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখতে হলে এ ধরনের অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জনগণের টাকা সঠিকভাবে ব্যয় না হলে প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে না।”
সরকারের উন্নয়ন নীতি ও স্থানীয় প্রভাব
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থানীয় মানুষের কল্যাণে বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু পিআরও জোবায়ের হাসানের অভিযোগিত কর্মকাণ্ড প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বাভাবিক ধারাকে ব্যাহত করছে। জনগণ মনে করছেন, যদি প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলকতা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে বুড়িচং উপজেলার উন্নয়ন লক্ষ্য ব্যর্থ হবে।
একজন সচেতন নাগরিক বলেন, “সরকারি প্রকল্পের অর্থ জনগণের জন্য বরাদ্দ। যদি তা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে খরচ হয়, তাহলে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা চাই দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করুন।”
সাংবাদিকদের সমর্থন ও তদন্তের আহ্বান
স্থানীয় সাংবাদিকরা প্রকল্পের তথ্য যাচাই ও জনগণকে তা জানানোতে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন। তারা বলেন, “আমরা সাংবাদিক হিসেবে তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেই। কিন্তু কর্মকর্তার সহযোগিতা ছাড়া প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পিআরও জোবায়ের হাসানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রয়োজন।”
বুড়িচং উপজেলায় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জোবায়ের হাসানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা স্থানীয় জনগণ, সাংবাদিক এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সরকারের উন্নয়ন বাজেট থেকে বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা না হলে প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব।
সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে—উক্ত অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন দুর্নীতি-মুক্ত ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক থাকে। স্থানীয় জনগণ আশা করছেন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং প্রকৃত পরিস্থিতি জনগণের সামনে প্রকাশ করবে।
মো. মামুন হোসেন 

























