বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে দুর্নীতি, ঘুষ ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক এক ঘটনায় প্রশাসনিক অনিয়মের চিত্র যেন নগ্ন রূপে সামনে এসেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহবুবুর রহমান—যিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য পাচার মামলার অন্যতম আসামি—৩৫ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে সম্প্রতি বানিজ্য সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন উঠছে, যে ব্যক্তি আইনের চোখে আসামি, যার জেলে থাকার কথা, তাকে কেনো ও কীভাবে সচিব পদে বসানো হলো? কেবল ঘুষের টাকা নাকি এর পেছনে আরও বড় রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে?
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি বাংলাদেশের নাগরিকদের অন্যতম সংবেদনশীল তথ্যভাণ্ডার। এতে নাগরিকদের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, পারিবারিক তথ্য থেকে শুরু করে বায়োমেট্রিক তথ্যও সংরক্ষিত থাকে।
২০২১-২২ সালে প্রথম প্রকাশ্যে আসে, এই ডাটাবেজ থেকে হাজারো নাগরিকের তথ্য পাচার হয়ে গেছে। বিদেশি হ্যাকার চক্র, মানবপাচারকারী ও আর্থিক প্রতারকরা এই তথ্য ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এমনকি একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, তথ্য পাচারের ফলে জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে।
তদন্তে উঠে আসে, রাষ্ট্রীয় আইসিটি মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশনের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এই পাচার চক্রে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এর ভিত্তিতেই দায়ের হয় বহুল আলোচিত মামলা।
মামলার এজাহারে নাম আসে এক সময়কার ক্ষমতাবান মহল ও আইসিটি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহবুবুর রহমান (৬ নং আসামি)
এই তালিকা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। সাধারণ নাগরিকরা হতবাক হয়ে যায়-যারা নাগরিকের তথ্য সুরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন, তারাই যদি পাচারে জড়িয়ে পড়েন, তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়?
বিতর্কিত অতিরিক্ত সচিব থেকে বানিজ্য সচিব : মাহবুবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে আইসিটি মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছেন। বিভিন্ন প্রকল্পে তার বিরুদ্ধে ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এনআইডি পাচার মামলায় নাম আসার পর তার চাকরি থাকা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, চাকরি হারানোর পরিবর্তে তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। অভিযোগ আছে—সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তিনি আইনের হাত এড়িয়ে যান। আর অবশেষে, ৩৫ কোটি টাকার ঘুষ দিয়ে বানিজ্য সচিব পদে বসেন।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, মাহবুবুর রহমান সচিব হওয়ার জন্য উচ্চ পর্যায়ে ৩৫ কোটি টাকা ঘুষ দেন। এই অর্থ তিন ভাগে ভাগ হয়- ১. রাজনৈতিক মহল, ২. প্রশাসনিক মহল, ৩. মধ্যস্বত্বভোগী লবিস্টদের হাতে।
ঘুষের টাকার বিনিময়ে মামলার অগ্রগতি ধীরগতি করা হয় এবং তাকে পদোন্নতির সুযোগ করে দেওয়া হয়।
এমনকি সচিব পদে বসানোর আগে সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল দপ্তর থেকে “ক্লিয়ারেন্স রিপোর্ট” জোগাড় করতে ঘুষ ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
বাংলাদেশের সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলার আসামি হলে তিনি পদোন্নতির অযোগ্য হবেন। দুর্নীতি বা গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুত করার বিধান রয়েছে।
কিন্তু মাহবুবুর রহমানের ক্ষেত্রে হলো উল্টোটা। তাকে জবাবদিহিতার আওতায় না এনে আরও ক্ষমতাশালী পদে বসানো হলো। এটি কেবল আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক কাঠামোতে ঘুষ-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের উদাহরণ।
জয় ও পলকের ঘনিষ্ঠতা : মাহবুবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আইসিটি প্রকল্পে শত কোটি টাকার বাজেট ব্যবস্থাপনায় তিনি সরাসরি প্রভাবশালী ছিলেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে, যার উল্লেখ আছে একাধিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। এসবের পেছনে জয় ও পলকের ছত্রচ্ছায়া ছিল বলেই অভিযোগ উঠেছে।
অতএব, প্রশ্ন উঠছে- ঘুষই কি একমাত্র হাতিয়ার, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবই তাকে আসামি হয়েও রক্ষা করেছে?
প্রশাসনের ভেতরেও এই নিয়োগ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন- একজন আসামিকে সচিব বানানো হলে সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে যায়। দুর্নীতি করে ধরা পড়লেও শাস্তি নয়, বরং পুরস্কার মেলে-এমন নজির তৈরি হলো। এর ফলে প্রশাসনে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বেন।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “যেখানে আইন পরিষ্কার, সেখানে একজন মামলার আসামিকে সচিব বানানো পুরো প্রশাসনের জন্য লজ্জাজনক। এটি প্রমাণ করে, ঘুষ না দিলে এখন আর কেউ উচ্চপদে উঠতে পারে না।”
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক কর্মকর্তা ড. এম হুমায়ুন কবীর বলেন “এটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর সংকেত। যিনি তথ্য পাচারের মতো মামলার আসামি, তিনি যদি সচিব হন, তবে সাধারণ নাগরিক ন্যায়বিচার কোথায় খুঁজবে? এতে প্রমাণ হয়, দুর্নীতির মূলে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব।”
প্রশাসনিক বিশ্লেষক ড. সেলিনা আখতার মনে করেন- “ঘুষের টাকা ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এখন বাংলাদেশে ক্যারিয়ার গঠনের প্রধান শর্তে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সৎ কর্মকর্তা দূরে সরে যাচ্ছেন, আর প্রশাসনে দুর্নীতিবাজরা শক্তিশালী হচ্ছেন।”
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, এটি কেবল একটি দুর্নীতি নয়, বরং নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন। কারণ, নাগরিকের তথ্য পাচার হয়েছে, অথচ তার দায়ীরা পুরস্কৃত হচ্ছেন।
মাহবুবুর রহমানকে বানিজ্য সচিব করা কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়োগ নয়—এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনের শাসনের ভয়াবহ সংকটের প্রতিচ্ছবি।
যেখানে নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য পাচারের মতো অপরাধের আসামিও ঘুষ ও রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে উচ্চ পদে বসতে পারে, সেখানে আইনের শাসন কার্যত ভেঙে পড়েছে।
প্রশ্ন এখন একটাই- রাষ্ট্র কি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবে, নাকি আইন ও জনগণের আস্থার পক্ষে দাঁড়াবে? এমন ঘটনায় একটাই স্পষ্ট বার্তা যায়—বাংলাদেশে সৎ থাকার চেয়ে ঘুষ দেওয়া ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া পাওয়া অনেক বেশি লাভজনক।
সংবাদ শিরোনাম ::
এনআইডি তথ্য পাচার মামলার আসামি হয়েও পদোন্নতি পেয়ে বানিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৭:৫১:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- ৮৬৬ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















