প্রকল্প বরাদ্দের ২ শতাংশ ঘুষ না দিলেই আটকে যায় ঠিকাদারদের বিল। ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ খন্দকারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। তাঁর কারণেই বন্ধ রয়েছে তিনটি বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজ। ধীরগতিতে চলছে চারটি বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজ। এক বছর আগে টেন্ডার হলেও শুরু হয়নি একটি বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ। ঢাকার প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে বরাদ্দ আনতেও ঠিকাদারের কাছ থেকে এই প্রকৌশলী টাকা নিয়ে থাকেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম আনিছুজ্জামানের সুপারিশে ২০২৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থেকে বদলি হয়ে ত্রিশালে যোগদান করেন প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ খন্দকার। ওই সংসদ সদস্যের কার্যকালে নিজেকে আওয়ামী লীগ পরিবারের একজন দাবি করে অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের কর্মচারীদের।
ত্রিশাল উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) রয়েছেন তিনজন উপসহকারী প্রকৌশলী। তা সত্ত্বেও প্রকল্প কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন বাদশা মিয়া নামে এক উপসহকারী প্রকৌশলী। তিনি সরকারি কর্মকর্তা নন, অর্থায়নকারী সংস্থা নিয়োজিত। ময়মনসিংহ অঞ্চলে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে (এমআরআরআইডিপি) নিয়োজিত তিনি। তাঁর চাকরিবিধি অনুযায়ী এর বাইরে কোনো কাজের দায়িত্বে থাকতে পারেন না। অথচ গত ৩০ জুন তাঁর প্রকল্পের মেয়াদকাল শেষ হলেও তাঁকে দিয়েই করানো হচ্ছে উপজেলার ৬০ শতাংশ কাজ। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ-দুর্নীতির বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবেই তাঁর স্বাক্ষরে বিল উত্তোলনসহ সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক উপসহকারী প্রকৌশলী জানান, প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ খন্দকারের সব ঘুষ লেনদেনের কাজ করেন তাঁর একান্ত বিশ্বস্ত প্রকল্প কর্মকর্তা বাদশা মিয়া। তাঁর কাছে গেলেই যেন মেলে সব সমস্যার সমাধান। তাই স্থানীয় ঠিকাদারদের কাছে তিনি ‘জিনের বাদশা’ নামে পরিচিত।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, বরাদ্দের ২ শতাংশ কমিশন না দিলে বিল আটকে দেন প্রকৌশলী শফিউল্লাহ। তাঁর ঘুষকাণ্ডের কারণেই বন্ধ রয়েছে দাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নওধার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ধলিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজ। ধীরগতিতে কাজ চলছে কাজিরকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেওপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাঁঠাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ও গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজ। এ ছাড়া এক বছর আগে টেন্ডার হলেও গুজিয়াম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ শুরুই হয়নি। এই কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার কারণে ২০২২ সালে শুরু হওয়া উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন ও হলরুম নির্মাণকাজেও কোনো অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক লাখ টাকা পেয়েও খুশি নন উপজেলা প্রকৌশলী। যে কারণে বছরখানেক আগে টেন্ডার হওয়া গুজিয়াম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ঠিকাদারের।
পৌর শহরের নওধার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পুরাতন ভবনে শিক্ষকদের বসার জন্য একটি কক্ষ ও দুটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। বছরখানেক ধরে নির্মাণাধীন ভবনের কাজ বন্ধ থাকায় শ্রেণিকক্ষ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে ক্লাস-পরীক্ষা।
প্রধান শিক্ষক সিদ্দিক মিয়া জানান, কাজ শেষ না হওয়ায় খোলামেলা পড়ে থাকে। এতে রাতের বেলায় মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয় বিদ্যালয়টি। শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি ওয়াশরুমের জরুরি দরকার। তাই দ্রুত কাজ শেষ করতে বহুবার ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তারা। তাতে কোনো লাভ না হওয়ায় ৭-৮ মাস আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকৌশলী বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন, কিন্তু কোনো প্রতিকার মেলেনি। তবে ঠিকাদার সাজ্জাদুল ইসলাম বাবু জানিয়েছেন তিনি খুব দ্রুতই কাজ শুরু করবেন।
দাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনের গ্রেড বিম ও তার ওপর কলামের (পিলারের) রড বাঁধার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে চার মাস ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে ঠিকাদার খাইরুল ইসলামের ভাষ্য, ভ্যাট আইটিসহ বরাদ্দ এক কোটি ২৮ লাখ টাকা। ৪০ লাখ টাকার কাজ শেষ, কিন্তু বিল দিয়েছে ২১ লাখ। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ঘুষের টাকা দিইনি বলে উপজেলা প্রকৌশলী বিল অনুমোদন করছেন না। তিনি প্রতিটি কাজে বরাদ্দের টু পারসেন্ট কমিশনের টাকা না পাওয়া পর্যন্ত হয়রানি চালিয়ে যান। আমার মতো অবস্থা অনেকেরই। ঘুষ দিচ্ছেন না বলে বিল পাচ্ছেন না।’
ঠিকাদার তাজুল ইসলাম জানান, গুজিয়াম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজ পেয়েছেন তিনি। এলজিইডির ঢাকা অফিস থেকে বরাদ্দ অনুমোদন ও কমিশন বাবদ উপজেলা প্রকৌশলী নিয়েছেন এক লাখ টাকা। এরই মধ্যে এক বছর অতিবাহিত হলেও কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন না তিনি। এ ছাড়া কৈতরবাড়ী সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের কাজ শেষ হয়েছে এক বছর আগে, অথচ চূড়ান্ত বিল দেননি। বরাদ্দের দুই শতাংশ ঘুষ না দিলেই প্রকল্প কাজে বাগড়া দেন প্রকৌশলী।
নির্মাণকাজে অগ্রগতি নেই কেন? এই প্রশ্নের জবাবে কাজিরকান্দা এবং দেওপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিকাদার জিয়া উদ্দিন শাহীন বলেন, সমস্যার কারণে এক বছর কাজ বন্ধ ছিল। দুই শতাংশ ঘুষের বিষয় স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে পার্সেন্টিসের ঝামেলা শেষ। কাজ শুরু করেছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার জানান, প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ খন্দকার ত্রিশালে যোগদানের পর আজ পর্যন্ত কোনো ঠিকাদার বরাদ্দের দুই শতাংশ না দিয়ে বিল পাননি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ খন্দকার। তিনি বলেন, ‘কোনো ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নিইনি। ফান্ড (বরাদ্দ) নেই, তাই বিল দিতে পারছি না। ফান্ড এলেই ধারাবাহিকভাবে বিদ্যালয়গুলোর কাজ চলবে।’ ফান্ড আনার নামে ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করে তিনি বলেন, এসব ভুয়া আলাপ।
মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্প কর্মকর্তা বাদশা মিয়াকে দিয়েই কীভাবে উপজেলার ৬০ শতাংশ কাজ করাচ্ছেন? জবাবে উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, ‘বাদশার মেয়াদ শেষ হয়নি। আর কম-বেশি সবাইকে দিয়েই কাজ করানো হচ্ছে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















