বার বার সংবাদের প্রকাশের পরও থামছেনা আজিজ মনিরের দূর্নীতি। ঢাকা ওয়াসায় স্বঘোষিত ‘জাতীয়তাবাদী এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন’-এর নেতা আজিজুল আলম খান ও মনির হোসেন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির যে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে, তার প্রথম প্রকাশ্যে আসার পর এক মাস অতিক্রম করেছে। কিন্তু অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির রিপোর্ট এখনো জনসমক্ষে আসেনি। এতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ওয়াসার প্রকৃত শ্রমিকরা বলছেন—প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অব্যাহত প্রশ্রয়ে আজিজ–মনির চক্র এক প্রকার অঘোষিত ‘কালো সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছে।
ঢাকা ওয়াসা জাতীয়তাবাদী এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের কমিটি নিয়ে বিভেদ থাকায় বিষয়টি এখনো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আজিজুল আলম খান নিজেকে সভাপতি ও মনির হোসেন পাটোয়ারী নিজেকে সাধারণ সম্পাদক দাবি করে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তাদের নেতৃত্বে যেসব কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তাতে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ওয়াসার কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকৃত বিএনপি সমর্থক কর্মচারীদের অভিযোগ, আজিজ ও মনির আওয়ামী শাসনামলে তাকসিম এ. খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে সুবিধা ভোগ করেছেন। আজিজ তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে ছাত্রলীগ নেত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন। আবার মনির হোসেন পাটোয়ারীও আওয়ামীপন্থী পরিচয়ে দীর্ঘদিন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। এখন তারা বিএনপির নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন।
আজিজ–মনির চক্রের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ একের পর এক জমা হচ্ছে।
২৩ অক্টোবর ২০২৪: ওয়াসা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আনিছুজ্জামান খান শাহীন ওয়াসা ভবনে গেলে তাকে ১০ তলা থেকে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেন আজিজ ও মনির। পরবর্তীতে শাহীন এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
১৭ নভেম্বর ২০২৪: দুই উপব্যবস্থাপনা পরিচালক—একে এম সহিদ উদ্দিন (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) ও মো. আকতারুজ্জামান (ফিন্যান্স)–কে ভবন থেকে লাথি-ঘুষি মেরে টেনে হিচড়ে বের করে দেয় আজিজ–মনির বাহিনী।
১ ডিসেম্বর ২০২৪: দৈনিক ঢাকা প্রতিদিন–এর দুই সাংবাদিককে ওয়াসা ভবনে ডেকে নিয়ে নির্যাতন, তাদের ক্যামেরা ও গাড়ি লুট করার চেষ্টা করা হয়। পরে ভিডিও ফুটেজ অনলাইনে প্রকাশ পেলে সারা দেশে নিন্দা ঝড়ে ওঠে।
এমন ঘটনায় কর্মচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই অভিযোগ তুলছেন, “ওয়াসা ভবনে এখন শ্রমিক নয়, সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য চলছে।”
১৭ নভেম্বরের মারধরের ঘটনায় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু ডিসেম্বর শেষে এসেও রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, “উচ্চ পর্যায়ের চাপ” ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।
ওয়াসার এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়লেও প্রশাসন তা প্রকাশ করছে না। এতে প্রমাণ হয়, প্রভাবশালী মহল তাদের পক্ষে রয়েছে।”
১ ডিসেম্বর সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), জাতীয় প্রেসক্লাব ও ক্র্যাব (ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) পৃথক বিবৃতিতে এ ঘটনার নিন্দা জানায়। কিন্তু এখনো মামলার অগ্রগতি হয়নি। ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও রাজনৈতিক চাপের কারণে তা জটিল হয়ে উঠছে।
আজিজ–মনির চক্রের বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং নিয়োগ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
১ সেপ্টেম্বর ২০২৪: ৩০–৪০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
নভেম্বরের মাঝামাঝি: আরও ৯৩ জন নিয়োগ পান।
জনপ্রতি ৮–১০ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ঘুষের টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে নভেম্বরের শেষে ৯৩ জন কর্মীর নিয়োগ স্থগিত করা হয়।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের আত্মীয় এবং ছাত্রলীগের সাবেক নেতা তানবীর আহম্মেদ সিদ্দিকীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
আজিজুল আলম খান একজন রাজস্ব পরিদর্শক, বেতন মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। অথচ তার জীবনযাত্রা মন্ত্রী-এমপিদের থেকেও বিলাসবহুল। রাজধানীর বেইলী রোডে আলিশান বাসা। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট। সিলেটে বাগানবাড়ি ও একাধিক জমি। বিদেশে নিয়মিত ভ্রমণ—সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যাতায়াত।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন পাটোয়ারীও ৩৫ হাজার টাকার চাকরি করেন। কিন্তু তার মালিকানায়—
ঢাকার মিরপুরে ৬ তলা বিলাসবহুল বাড়ি। কুমিল্লায় নির্মাণাধীন বহুতল ভবন। আত্মীয়স্বজনদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এই অস্বাভাবিক সম্পদের বিষয়ে দুদক এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি। তবে সূত্র বলছে, প্রাথমিকভাবে সম্পদ–অসঙ্গতির প্রমাণ মিলেছে।
ওয়াসার প্রকৃত কর্মকর্তা–কর্মচারীরা বলছেন, আজিজ ও মনিরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস কেউ পাচ্ছেন না। একজন কর্মকর্তা বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই হয়রানি, চাকরি হারানো বা শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হয়। তাই সবাই চুপ করে আছে।”
শ্রমিক ইউনিয়নের একজন প্রবীণ নেতা বলেন, “আজিজ–মনির চক্রের কারণে শ্রমিক ইউনিয়নের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার পরিবর্তে এখন শুধু লুটপাট আর সন্ত্রাস।”
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দফতর থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে—“দলকে কলঙ্কিত করে এমন কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া হবে না।”
সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হলেও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিএনপি মনোভাবাপন্ন কর্মচারীরা দাবি করছেন, দল যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে ওয়াসার পরিবেশ আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
ওয়াসার বিভিন্ন দপ্তরে এখনো নিয়োগ বাণিজ্য ও ঘুষ লেনদেন চলছে বলে অভিযোগ। কর্মচারীরা আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়া অব্যাহত থাকলে এই চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এর ফলে ওয়াসার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।
আজিজুল আলম খান ও মনির হোসেন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির একের পর এক অভিযোগ উঠলেও কার্যকর পদক্ষেপের অনুপস্থিতি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ না করা, সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় মামলা না হওয়া এবং কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের তথ্য চাপা রাখার চেষ্টা প্রমাণ করে—ওয়াসার ভেতরে এখনো শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়।
ওয়াসার কর্মচারীরা বলছেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে যারা প্রতিষ্ঠানকে অচল করে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে শ্রমিক আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে পারে। অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃত্ব যদি নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে চায়, তবে আজিজ–মনির চক্রকে দ্রুত বহিষ্কার ও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















