বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB)-এর ফ্লাইট অপারেশন ইনস্পেক্টর ক্যাপ্টেন আজিজ আব্বাসি রফিক–এর বিরুদ্ধে লাইসেন্স জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি, ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সেফটি বিভাগ তদন্ত শুরু করেছে। তবে তদন্তে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে যখন জানা যায়, CAAB-এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আজিজকে রক্ষা করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন, যদিও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আজিজ আওয়ামী ঘরানার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং পিতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন।
স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা
তৎকালীন ২০২১ সালে MFSR (Member, Flight Standard & Regulations), CAAB গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরী এম ডি জিয়া উল কবির-এর সরাসরি সহায়তায় ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অধিকতর যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে ক্যাপ্টেন আজিজকে “বিশেষ পরিদর্শক (সিনিয়র ফ্লাইট অপারেশন্স ইনস্পেক্টর)–ফিক্সড উইং” পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরী এম ডি জিয়া উল কবির ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ADC এবং সিভিল এভিয়েশনে দায়িত্ব পালনের সময় বহু দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে পলাতক বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, আজিজের ভগ্নীপতি একজন আইনজীবী, যিনি প্রাক্তন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের ল’ ফার্মে কর্মরত এবং একই সাথে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে নিয়োগপ্রাপ্ত আইনজীবী হিসেবেও কাজ করেন।
এই জবাবদিহিমূলক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ক্যাপ্টেন আজিজ সিভিল এভিয়েশনে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসেন।
CAR ’84 এর ছয়টি বিধি লঙ্ঘনের বিস্তারিত
১. Rule 24(1)(a) – বয়সের শর্ত লঙ্ঘন
CPL অর্জনের জন্য প্রার্থীর বয়স হতে হয় কমপক্ষে ১৮ বছর, কিন্তু আজিজ ১৭ বছর ৬ মাস ১৯ দিনে ফ্লাইট চেক সম্পন্ন করেন — যা স্পষ্ট নিয়ম ভঙ্গ।
২. Rule 24(3)(a)(i) – P1 সময় জালিয়াতি
লগবুকে P1‑সময় ১৫০ ঘণ্টা দেখালেও, ২ ঘণ্টা ডান পাশে ফ্লাই করা হয়েছে — ফলে কার্যকর হিসাব থাকছে শুধু ১৪৮ ঘণ্টা।
৩. Rule 24(3)(a)(ii)(c) – Instrument Instruction Training-এ ঘাটতি (CPL)
আবশ্যিক ১০ ঘণ্টার বিপরীতে পূরণ করেছেন মাত্র ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট।
৪. Rule 26(3)(a)(ii)(A) – PIC সময় স্থানান্তর (ATPL)
অপূর্ণ ও অবৈধ P1 সময়কে PIC হিসেবে গ্রহণ করে ATPL‑এর জন্য আবেদন করা হয়েছে।
৫. Rule 32(2)(b)(ii)(B) – Instrument Flight Time অপর্যাপ্ত
প্রয়োজন ৪০ ঘণ্টা, কিন্তু তিনি রিপোর্ট করেছেন ৩৯ ঘণ্টা ৩০ মিনিট।
৬. Rule 32(2)(c) – Instructional Instrument Training-এ জালিয়াতি (ATPL)
আবশ্যিক ১০ ঘণ্টার বিপরীতে শুধুমাত্র ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট ট্রেনিং করেছেন।
বাবার সম্পৃক্ততা ও স্বার্থসংঘাত
ক্যাপ্টেন আজিজের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ক্যাপ্টেন রফিকুর রহমান—যিনি বর্তমানে আজিজের পিতা— তিনি ছিলেন সরাসরি তত্ত্বাবধায়ক।
যেমনঃ First Solo Flight, 150 NM Cross Country Flight, PPL/CPL/ATPL General & Navigation Check, Instrument ও Night Flying Check, Dash 8 aircraft type training ইত্যাদিতে তার উপস্থিতি নয়, কিন্তু প্রভাব ছিল জোরালো।
এটি একটি প্রকাশ্য conflict of interest এবং প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা‑নির্ভরতায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা ভঙ্গের বিশাল উদাহরণ।
সরকারি ভর্তুকির অর্থ আত্মসাৎ
প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য বরাদ্দ সরকারি ভর্তুকির অর্থে অননুমোদিত অতিরিক্ত বিল উপস্থাপন করে সম্প্রতি টাকা উত্তোলন করেছেন আজিজ।
সরকারি কোষাগার থেকে অনুমোদিত খরচের তুলনায় বেশি টাকা আদায় — যা দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ।
লিগ্যাল নোটিশ চুরি ও বেআইনি জবাব
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং CAAB চেয়ারম্যানকে একটি আইনি নোটিশ প্রেরণ করা হয়েছিল, যেখানে আজিজের বিরুদ্ধে লঙ্ঘনের বিস্তারিত দলিল করা হয়েছিল।
কিন্তু ক্যাপ্টেন আজিজ নিজেই সেই নোটিশ চুরি করে নিজের নামে আইনত উত্তর দান করেন, নিজেকে “হেড অব ব্রাইস সার্ভিস” পরিচয়ে — যা কোনো দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নয় এবং নথি চুরি ও নজিরবিহীন স্বাক্ষর জালিয়াতি নির্দেশ করে।
এটি সরকারি আইন এবং প্রশাসনিক প্রটোকল লঙ্ঘনের চোখে পরার মতো দৃষ্টান্ত, যা সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
এই পুরো প্রতিবেদন বাংলাদেশি এভিয়েশন খাতে নিয়মতান্ত্রিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে যদি এই ঘটনা ব্যর্থ হয়, তাহলে আজিজের মতো আরও অনিয়মকারীরা আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে — যা সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















