সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যার কাজ হচ্ছে কৃষকদের নিয়ে। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠান থেকে কতটা সুবিধা পাচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা? একসময় কৃষকরা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন তার মনোযোগ থাকে সঠিক পরামর্শ পাওয়ার বিষয়ে। সেই পরামর্শ সহজ করে তোলার ক্ষেত্রে খামারবাড়ি কিংবা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানী ঢাকার পাশেই অবস্থিত গাজীপুর জেলা। এ জেলায় এখনো অনেক পরিবার কৃষির উপর নির্ভর করে সংসার চালায়। এ জেলার কৃষকেরা কাঁঠাল, পান, ধান, কলাসহ বিভিন্ন শাক-সবজি ও ফল উৎপাদন করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠায়। এ জেলায়ও কৃষকদের সেবা প্রদানে উপজেলাগুলোয় রয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস ও জেলা পর্যায়ে রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের কার্যালয় বা খামারবাড়ি। তবে কৃষকের সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠলেও এসব উপজেলা কৃষি অফিস ঘিরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, নানা কারণে বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষকরা। নিয়োগ-পদোন্নতিতে দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা, উপজেলায় বরাদ্দে কমিশন আদায়, কর্মকর্তাদের মধ্যে দলাদলি, সেবা দিতে টাকা লেনদেনসহ নানা অনিয়মে ডুবছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দুর্নীতিবাজের দাপটে ভেঙে পড়েছে শৃঙ্খলা। অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সার, বীজ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণও নিতে লাগে সখ্যতা, অর্থ এবং রাজনৈতিক পরিচয়। ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি, বিসিআইসি সার ডিলার, কীটনাশক লাইসেন্সসহ বিভিন্ন লাইসেন্স ও সেবা পেতেও দিতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। তবে এসব অভিযোগ বরাবরের মতো অস্বীকার করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী ২০২২ ও ২৩ অর্থবছরে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষিখাতের (শস্য উৎপাদন, বনায়ন ও মৎস্য) অবদান প্রায় ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এদিকে, কৃষি খাতে সরকারি উল্লেখযোগ্য সেবাগুলো হলো কৃষি উপকরণে ভর্তুকি প্রদান, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ, সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ, সেচ পরিচালনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সেচ যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা বৃদ্ধি, কৃষিজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ফসল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। এ ছাড়াও ঋণ বিতরণ এবং সারাদেশে কৃষক পরিবারকে উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করা, কৃষকদের সার ও বীজ সরবরাহ, কৃষিবিষয়ক পরামর্শ এবং কৃষি খামার প্রদর্শনী করা হয়। তবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তদারকি ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততার কারণে সেবাগুলো পেতে কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষি উদ্যোক্তা জানান, কীটনাশকের লাইসেন্স নিতে তাকে ১৫,০০০ টাকা দিতে হয় কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তাকে। ঘুষের টাকা সময়মতো দিতে না পারায় বার বার ফোন করে তার কাছে টাকা চাওয়া হয়। টেবিল থেকে টেবিলে পার হতে নাকি দিতে হয় নোট।
অনেক কৃষকরা বলছেন, পারিবারিক পুষ্টি বাগান থেকে ফল বাগান প্রদর্শনী, ধান-সরিষা-আদা প্রদর্শনী এসব কাকে দেয় তারাই তা ভালো জানে, তারা এসব জানে না। পরে দেখে এসব কোনো নেতা পেয়েছে কিংবা প্রভাবশালী লোক। মাঠ পর্যায়ে যারা এসব তালিকা করেন তারা এসব তাদের মতো করে করেন। তারা বলছেন, তারা কৃষি অফিসে গেলেই নানা রকম হয়রানির শিকার হন।
এদিকে, টিআইবি’র খানা জরিপের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায় কৃষি খাত থেকে সেবা গ্রহণকারী খানার ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হয়েছে, যা গ্রামাঞ্চলের খানার ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ও শহরাঞ্চলের খানার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। সেবাগ্রহীতা খানাগুলো যে ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে, তার মধ্যে তথ্য প্রদানে অসহযোগিতা, স্বজনপ্রীতি, সময়মতো পরামর্শ না দেওয়া, নিন্মমানের সার/বীজ প্রাপ্তি, ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ এবং সময়মতো সার/বীজ/কীটনাশক সরবরাহ না পাওয়া উল্লেখযোগ্য।
অনুসন্ধান বলছে, কাজ পেতে ঘুষ যে কেবল সাধারণ মানুষকে দিতে হয় তা নয়, প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও বাদ যান না। আবার ঠিকঠাক তদবির করতে পারলে বিনা ঘুষেই কাজ সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ ঘুষ ছাড়া কাজ করতে চাইলে প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য থাকা চাই। ঘুষ না দিলে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলে সেবা পাবেন না, এমনটি মেনেই নিয়েছেন গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলার শত শত কৃষক। পছন্দের লোক কিংবা টাকা খরচ করলেই পাওয়া যায় সার ও কীটনাশক লাইসেন্স, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও বরাদ্দ।
আইএমইডি নামে এক সংস্থার সমীক্ষা প্রতিবেদনেও দেখা যায়, প্রায় ৭৪ শতাংশ কৃষক বলেন ভর্তুকি পাওয়ার যোগ্যদের তালিকায় নাম ওঠাতে তারা অসুবিধায় পড়ছেন। প্রায় ৪৩ শতাংশ কৃষক বলেছেন, তারা অর্থ দেওয়ার পরও যন্ত্রপাতি পেতে বেগ পেয়েছেন। প্রায় ৬ শতাংশ কৃষকের দাবি, তারা নিম্নমানের সরঞ্জাম পেয়েছেন। ৩২ জেলার ১ হাজার ৮২৪ কৃষকের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে আইএমইডি। হাওড় ও উপকূলীয় এলাকার ৭০ শতাংশ এবং সমতলে ৫০ শতাংশ ভর্তুকিমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি গরিব কৃষকদের দেওয়ার কথা। অভিযোগ রয়েছে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের ভর্তুকির সুবিধায় ভাগ বসাচ্ছেন অসাধু কর্মকর্তা, যন্ত্র সরবরাহকারী কিছু কোম্পানী ও স্থানীয় দালাল। ভর্তুকির যন্ত্রের জন্য ঘুষ, যন্ত্রের দাম বাড়িয়ে কৃষকের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায়, ভুয়া উপকারভোগী বানিয়ে পুরো যন্ত্রের টাকা আত্মসাৎ, প্রকৃত কৃষকের বদলে অন্যকে যন্ত্র দেওয়া, মানহীন যন্ত্র সরবরাহ, যন্ত্র বিতরণে প্রভাবশালীদের প্রভাব, নষ্ট হলে কোম্পানিগুলোর বিক্রয়োত্তর সেবা না দেওয়া, এক যন্ত্র কয়েকবার বিক্রি করে একাধিকবার ভর্তুকি নেওয়াসহ রয়েছে নানা অভিযোগ।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের প্রকৃত কৃষকেরা ভর্তুকির সুবিধা পান না। বরং অনেকে টাকা জমা দিয়ে যন্ত্রের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করে বিফল হয়েছেন। অথচ প্রকৃত কৃষকের বাইরে রাজনৈতিক দালাল ও অসাধু কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যন্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে কৃষি ভর্তুকি ও বরাদ্দ। প্রকৃত কৃষকরা সরকারি ভর্তুকি পান না। কাকে দিচ্ছেন তারা এসব তারাই ভালো জানেন।
এসব অভিযোগ নিয়ে কথা বলার জন্য গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে যাওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায় নি। একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলেও পাওয়া যায়নি তাকে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মচারী জানান, গাজীপুর জেলায় বিভিন্ন উপজেলায় এবং জেলা অফিসে অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন যারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে গাড়ি-বাড়ি সব করেছেন। এসব অবৈধ উপার্জনের ভাগ উপজেলা থেকে জেলা পর্যায়ে সকল টেবিলে যায়। এসব বলে লাভ নেই।
গাজীপুর প্রতিনিধি 

























