সংবাদ শিরোনাম ::
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেকনিক্যাল ত্রুটি ও কয়লা সংকটে ৩০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ঝালকাঠিতে পৌর কবরস্থান-৫ এর উদ্বোধন বাজেট নয়, এটি প্রচারণার দলিল এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর জুড়ী-বড়লেখা সফর, ১১ দলীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা ও দাফনে অংশ নেবে ২ কোটি মানুষ এআই প্রযুক্তির পোষ্টার প্রদর্শনী ৩১ দফা বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে : আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম অতিরিক্ত আইজিপিসহ পুলিশের ২১ কর্মকর্তাকে বদলি মৌলভীবাজার সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা,কঠোর অবস্থানে বিজিবি নওগাঁয় এক মাদ্রাসা ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার

করিমগঞ্জ-গণরায়ের অপমান, ভাসানীর ভবিষ্যদ্বাণী ও ইতিহাসের ন্যায়ের প্রশ্ন

১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোট ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে বিরল এক গণতান্ত্রিক উদ্যোগ, যেখানে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হবে। ঐ গণভোটে সিলেটবাসীর মতো করিমগঞ্জের জনগণও বিপুলভাবে পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দেয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ফলাফল
সিলেটের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৫.৫ লাখ। ভোট পড়ে প্রায় ৭৫%। ফলাফল অনুযায়ী প্রায় ৫৬.৭% ভোট পড়ে পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) যাওয়ার পক্ষে। করিমগঞ্জ মহকুমার কয়েকটি অঞ্চল ব্যতীত অধিকাংশ অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পূর্ববঙ্গের সঙ্গে সাংস্কৃতিক-ভাষাগত মিল থাকায় এখানকার জনগণও বাংলাদেশে যেতে চেয়েছিল।

তবে বিভাজনের সময় র‌্যাডক্লিফ কমিশন কোনো পূর্বঘোষণা বা ব্যাখ্যা ছাড়াই করিমগঞ্জকে ভারতের আসামের অন্তর্ভুক্ত করে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও প্রশ্ন ওঠে।

ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি ১: মাওলানা ভাসানীর বক্তব্য
“আসাম আমার, ত্রিপুরা আমার, পশ্চিমবঙ্গ আমার-এই অংশগুলো বাংলাদেশের মানচিত্রে না আসা পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা পূর্ণ হবেনা।”
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ১৯৭৩ সালের এক জনসভায়

এই বক্তব্যে ভাসানী শুধু ভৌগোলিক দাবি তোলেননি, বরং একটি সাংস্কৃতিক, ইতিহাস-নির্ভর স্বাধীনতার পূর্ণতার কথা বলেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিধির অংশ, যা বিভাজনের ফলে কৃত্রিমভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি ২: ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকের মন্তব্য
“The result of the Sylhet referendum was clear; yet, certain areas such as Karimganj were excluded due to ‘strategic importance’-a decision more political than popular.”
-Sir Olaf Caroe, British colonial administrator, confidential note, 1948

(উৎস: British Library India Office Records, File No. L/P&J/10/117)

ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি ৩: আসাম প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতা গোপীনাথ বরদলৈয়ের বক্তব্য

“We must ensure that areas like Karimganj remain with Assam for administrative and geographical unity.”
— Gopinath Bordoloi, letter to Jawaharlal Nehru, July 1947
(উৎস: Selected Works of Jawaharlal Nehru, Vol. 3, Oxford University Press)

এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, গণরায় নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থই করিমগঞ্জকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার মূল কারণ ছিল।

করিমগঞ্জ ছিল এবং আজও রয়ে গেছে এক বাঙালি আত্মপরিচয়ের ভূমি, যার জনগণ ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু ভারতের একটি ষড়যন্ত্রময় সীমারেখা তাদের সেই অধিকার কেড়ে নেয়। করিমগঞ্জ তাই শুধু একটি ভূখণ্ড নয়-এটি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রমাণ, যা আজও প্রশ্ন তোলে: “আমার ভোটের দাম কোথায় গেল?”
দুইদিগন্তের মানুষ আজোও কাঁদে আপন নিড়ের খোঁজে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

করিমগঞ্জ-গণরায়ের অপমান, ভাসানীর ভবিষ্যদ্বাণী ও ইতিহাসের ন্যায়ের প্রশ্ন

আপডেট সময় ০৫:১০:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ মে ২০২৫

১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোট ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে বিরল এক গণতান্ত্রিক উদ্যোগ, যেখানে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হবে। ঐ গণভোটে সিলেটবাসীর মতো করিমগঞ্জের জনগণও বিপুলভাবে পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দেয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ফলাফল
সিলেটের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৫.৫ লাখ। ভোট পড়ে প্রায় ৭৫%। ফলাফল অনুযায়ী প্রায় ৫৬.৭% ভোট পড়ে পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) যাওয়ার পক্ষে। করিমগঞ্জ মহকুমার কয়েকটি অঞ্চল ব্যতীত অধিকাংশ অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পূর্ববঙ্গের সঙ্গে সাংস্কৃতিক-ভাষাগত মিল থাকায় এখানকার জনগণও বাংলাদেশে যেতে চেয়েছিল।

তবে বিভাজনের সময় র‌্যাডক্লিফ কমিশন কোনো পূর্বঘোষণা বা ব্যাখ্যা ছাড়াই করিমগঞ্জকে ভারতের আসামের অন্তর্ভুক্ত করে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও প্রশ্ন ওঠে।

ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি ১: মাওলানা ভাসানীর বক্তব্য
“আসাম আমার, ত্রিপুরা আমার, পশ্চিমবঙ্গ আমার-এই অংশগুলো বাংলাদেশের মানচিত্রে না আসা পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা পূর্ণ হবেনা।”
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ১৯৭৩ সালের এক জনসভায়

এই বক্তব্যে ভাসানী শুধু ভৌগোলিক দাবি তোলেননি, বরং একটি সাংস্কৃতিক, ইতিহাস-নির্ভর স্বাধীনতার পূর্ণতার কথা বলেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিধির অংশ, যা বিভাজনের ফলে কৃত্রিমভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি ২: ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকের মন্তব্য
“The result of the Sylhet referendum was clear; yet, certain areas such as Karimganj were excluded due to ‘strategic importance’-a decision more political than popular.”
-Sir Olaf Caroe, British colonial administrator, confidential note, 1948

(উৎস: British Library India Office Records, File No. L/P&J/10/117)

ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি ৩: আসাম প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতা গোপীনাথ বরদলৈয়ের বক্তব্য

“We must ensure that areas like Karimganj remain with Assam for administrative and geographical unity.”
— Gopinath Bordoloi, letter to Jawaharlal Nehru, July 1947
(উৎস: Selected Works of Jawaharlal Nehru, Vol. 3, Oxford University Press)

এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, গণরায় নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থই করিমগঞ্জকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার মূল কারণ ছিল।

করিমগঞ্জ ছিল এবং আজও রয়ে গেছে এক বাঙালি আত্মপরিচয়ের ভূমি, যার জনগণ ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু ভারতের একটি ষড়যন্ত্রময় সীমারেখা তাদের সেই অধিকার কেড়ে নেয়। করিমগঞ্জ তাই শুধু একটি ভূখণ্ড নয়-এটি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রমাণ, যা আজও প্রশ্ন তোলে: “আমার ভোটের দাম কোথায় গেল?”
দুইদিগন্তের মানুষ আজোও কাঁদে আপন নিড়ের খোঁজে।