বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এক প্রশ্ন ক্রমশ জোরাল হচ্ছে-কেন যুদ্ধক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কিংবা মানবিক সংকটে আজ ভারতের পাশে কেউ নেই?
ভারত একসময় ছিল বিশ্বমঞ্চে নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক। গাঁন্ধির অহিংসার দর্শন, নেহরুর নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ও ভারতীয় সংস্কৃতির সহনশীলতা একে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর ভারত এক ভিন্ন পথে হাঁটতে শুরু করে-একটি উগ্র, আগ্রাসী, আত্মমগ্ন ও বিভাজনপ্রবণ রূপে।
এই রূপান্তরের ফলেই আজ ভারত আন্তর্জাতিক মহলে একঘরে। শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়, সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো, এমনকি বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিশ্বমিডিয়া আজ ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
১. জাতীয়তাবাদের নামে গোঁড়ামি ও আধিপত্যবাদ
ভারতের বর্তমান শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘মেজরিটেরিয়ান ন্যাশনালিজম’-যেখানে সংখ্যাগোষ্ঠীর পরিচয়ই রাষ্ট্রচিন্তার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চেতনা শুধু অভ্যন্তরীণ বিভাজন সৃষ্টি করেনি, বরং প্রতিবেশীদের প্রতিও একরকম অবজ্ঞা ও দমননীতি তৈরি করেছে।
নেপালের নতুন মানচিত্রে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত দ্বন্দ্ব, শ্রীলঙ্কায় তামিল প্রশ্নে হস্তক্ষেপ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার, মালদ্বীপে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব-সব মিলিয়ে ভারতের আচরণ বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণবাদী বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
২. উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাব
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থান শুধু দেশটির সংখ্যালঘুদের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছেই এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC), হিজাব নিষিদ্ধকরণ, ‘লাভ জিহাদ’ আইন কিংবা দিল্লি ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-সবকিছুই ভারতের বহুত্ববাদী পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ফলে ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রতি অনাস্থা বেড়েছে। এমনকি একসময় যারা ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল-সৌদি আরব, কুয়েত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কাতার-তাদের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক আজ জটিল সমীকরণে মিলিয়েছে।
৩. ভুয়া তথ্য, মিডিয়া প্রোপাগান্ডা ও আন্তর্জাতিক নৈতিকতা লঙ্ঘন
ভারতের অনেক প্রভাবশালী মিডিয়া আজ কার্যত সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। বিরোধী কণ্ঠরোধ, সাংবাদিক নিপীড়ন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রোল বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ‘গুজবরাজনীতি’-এসবের কারণে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থান ক্রমাগত নিচে নেমে এসেছে।
বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো, যারা বাকস্বাধীনতাকে সবচেয়ে বড় গৌরব হিসেবে দেখে, তারা ভারতের এই পরিবর্তনে হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
৪. কূটনৈতিক দ্বিচারিতা ও মানবিক প্রশ্নে ভণ্ডামি
ভারত আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে প্রচার করতে চাইলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ফিলিস্তিন সংকটে ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো তো দূরে থাক, বরং ইসরায়েলি আগ্রাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বহু দেশে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এমনকি বহু দশক ধরে ফিলিস্তিনের পক্ষে থাকা ভারত হঠাৎ ইসরাইলের নীরব সমর্থক হয়ে ওঠায় আরব ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে চরমঅবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
আবার রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারত নিজেদের সীমান্তে মানবিক আশ্রয় না দিয়ে বরং বাংলাদেশকেই চাপ দিয়ে চলেছে। মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে কৌশলগত ‘নীরবতা’ বজায় রাখা-এ সবই আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলেছে।
৫. অহংকার ও কূটনৈতিক অসংবেদনশীলতা
বর্তমান ভারতীয় শাসনব্যবস্থা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অদ্ভুত আত্মমগ্নতা ও অসংবেদনশীলতা নিয়ে চলছে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে সহযোগী না মনে করে, প্রতিপক্ষ মনে করে ‘হুমকি’ দেখানো এবং অর্থনৈতিক কিংবা জলে সীমান্ত সমস্যায় একচেটিয়া শক্তি প্রয়োগ ভারতের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক বিরূপতা সৃষ্টি করেছে।
ভারতের এই একাকিত্ব আকস্মিক নয়; এটি তারই এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলাফল। অহংকার, ঘৃণা ও বিভাজনের নীতির মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করতে পারে না।
ভারতের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, নৈতিকতা, সহনশীলতা ও মানবিক কূটনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নচেৎ আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘বিশ্ববন্ধু’র বদলে ‘বিচ্ছিন্ন আত্মমগ্ন রাষ্ট্র’ হিসেবে ভারতই নিজের পথ রুদ্ধ করে তুলবে।
মো: আবু তাহের পাটোয়ারী 

























