যশোর সাব-রেজিস্ট্রার আমেনা বেগম’র স্বাক্ষর জাল করে দলিলের নকল বের করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাথে দলিলের নকল কপি উঠালে সরকার যে ফি বাবদ টাকা তা জাল দলিল কারিদের পকেটে যায়।
যেকোন জমির দলিল করার পর নামজারি বা বেচাকেনার জন্য নকল তোলা হয়। সেই দলিলের নকলেই সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল। দলিলের নকলে সিল দেওয়া আছে, অবিকল নকল সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরও দেওয়া আছে সুন্দর মত। ভুক্তভোগীরে বোঝার কোন উপায় নেই। তবে যখনই নামজারির জন্য আবেদন করা হচ্ছে তখন যশোর সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)’র নিকট এসে ঠেক খাচ্ছে। তখনই ভুক্তভোগীদের মাথায় টনক নড়ছে এবং বুঝতে পারছে দলিরের স্বাক্ষর নকল ও জাল।
এদিকে দলিলের নকল উঠাতে সরকারি খরচ ৬’শ থেকে ৯’শ টাকা হলেও সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পরে পড়ে গুণতে হচ্ছে ১৮’শ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। তারপরেও দলিলের স্বাক্ষর নকল ও জাল । আবার নামজারির আবেদন করতে খরচ আসে প্রায় ৫’শ টাকা। জমির নামজারি খতিয়ান প্রয়োজন হলে হতে হয় হয়রানির স্বীকার।
এদিকে দলিলের নকলে সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরের অমিল থাকায় সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারি বা জমি খারিজ আবেদন না মঞ্জুর করছেন। নতুন করে দলিলের নকল উঠাতে আবারও অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের।
এ সমস্ত জালিয়াতির কারণেই সাধারণ মানুষদের মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে সাব- রেজিস্ট্রার অফিস এবং যশোর সদর উপজেলা ভূমি অফিস। সর্বশেষ উপায় খুজে না পেয়ে দারস্থ হচ্ছে দালালের। এভাবেই শহর এবং গ্রামের সহজ সরল সাধারণ মানুষ বড় ধরণের ভোগান্তির শিকার হচ্ছে নিয়মিত সাথে ব্যয় হচ্ছে সময় এবং অতিরিক্ত অর্থ। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ সঠিক প্রতিকার চায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ৮৯১৪ নং দলিলের নকল উঠানো ২০ আগষ্ট ২০২৪ সালে। এ দলিলের নকলে সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল বলে গোল চিহ্ন দিয়ে রাখা। ১৩৭২১ নং দলিলের নকল উঠানো ১০ ফেব্রয়ারি ২০২৫ এখানেও সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল বলে চিহ্নিত করে রেখেছেন যশোর সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)। সদর সাব-রেজিস্ট্রী অফিসের দলিল লেখকের স্বাক্ষর দেওয়া আছে শাহিন আলমের। তার স্বাক্ষরিত নকলের দলিলে সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল বলে প্রমাণ করেছেন অফিস কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা অথচ শাহিন বলছেন এ স্বাক্ষর সঠিক।
ভুক্তভোগী শুভ জানান, আমি নামজারির জন্য আবেদন করছি অথচ এসিলেন্ড স্যার বলছেন দলিলে রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল। কয়েকদিন বিষয়টি নিয়ে খুবই জটিলতায় আছি। তাই আজ সাব-রেজিস্ট্রারকে দলিল দেখাতে আসছি। তিনি দলিলের স্বাক্ষর দেখছেন এবং স্বাক্ষরে কোন ভূল নেই বলে জানিয়েছেন। এসিল্যান্ড আমাদের ভুগান্তিতে ফেলেছেন।
ভুক্তভোগী ইসমাইল হোসেন জানান, আমি ২৪ সালে ৫ শতক জমি কিনেছি। এ জমির দলিলের নকল তুলছি ১৭’শ টাকা দিয়ে। মার্চ মাসে দলিলের নকল দিয়ে নামজারির আবেদনও করছি। ৭ এপ্রিলে শুনানি হলে এসিল্যান্ড স্যার বলছে দলিলে সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল বা নকল করা। এ দলিল দিয়ে নামজারি হবে না। এদিকে এ জমির দলিল করা হয়েছে দলিল লেখক শাহিন আলম’র দিয়ে গত ২৪ সালে আগস্টে। এ দলিলের নকল উঠানোর কথা বললে “দলিল লেখক শাহিন বলেন আমি আছিতো সমস্যা নেই”। পরে দলিল উঠিয়ে দেয়। দলিল লেখক শাহিন’র নিকট এ বিষয়ে বললে তিনি জানান এ স্বাক্ষর সঠিক আছে। ম্যাডামের স্বাক্ষর ৭-৮ রকম হয়। আমরা সাধারণ গ্রামের মানুষ মাঠে কাজ করে একটু জমি কিনছি। অথচ পদে পদে ভোগান্তির শিকার। এ বিষয়ে আমরা সঠিক প্রতিকার চাই।
যশোর সদর উপজেলার টি.সি মোহরার উজ্জল কুমার রায় জানান, অনেক সময় দ্রুত স্বাক্ষর করার কারণে এমনটা হয় তবে এটা সঠিক। তবে এখানে দলিলের নকলে যে স্বাক্ষর তার সাথে আমার ম্যডামের স্বাক্ষরের সাথে কোন মিল নেই। তবে ভূমি অফিস থেকে প্রায় এমন অভিযোগ আসছে এর একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে জনগনের ভোগান্তীর শেষ নেই।
রেকর্ড কিপার ভৈরব চক্রবর্ত্তী জানান, ম্যাডাম অনেক সময় ব্যস্ত থাকে। তাই দ্রুত স্বাক্ষর করে। তবে এখানে দলিলের নকলে যে স্বাক্ষর তার সাথে আমার ম্যডামের স্বাক্ষরের সাথে কোন মিল নেই। আমার রেজিস্ট্রার খাতায় ম্যাডামের স্বাক্ষর আছে আপনি দেখেন কোন মিল আছে কি না। আপনি যে দলিলের নকলে স্যারের স্বাক্ষর দেখাচ্ছেন সে স্বাক্ষর গুলো জাল। কে কিভাবে করছে সেটা আমাদের জানা নেই। তবে এ স্বাক্ষর যে ম্যাডামের স্বাক্ষর না এটা আমি নিশ্চিত। এখানে যা দেখাচ্ছেন তার সাথে কোন মিল নাই।
দলিল লেখক শাহিন আলম জানান, এ দলিলের নকল আমি উঠিয়ে দিয়েছি। নকলে সাব-রেজিস্ট্রারের যে সাক্ষর সেটা সঠিক আছে। অনেক সময় ম্যাডামের সাক্ষর ব্যস্ততার কারণে ৫-৭ রকম হয়। এ সব এসিলেন্ডের কারসাজি। এমন অনেক দলিলের নামজারি না মঞ্জুর করছে।
যশোর সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর অনেক দলিলের নকলে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এ স্বাক্ষর গুলো নকল করা। আজও দুটা দলিলে স্বাক্ষর অমিল পাওয়া গেছে। দলিলের নকলে যে স্বাক্ষর তা সাব- রেজিস্টারের স্বাক্ষরের সাথে কোন মিল নাই। এ বিষয়ে আমরা সাব-রেজিস্ট্রারের নিকট নোটিস করে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জালিয়াতি হতে পারে এ কারণে আমি কয়েকটি স্বাক্ষর ফলক করে আমার সামনে ঝুলিয়ে রাখছি।
যশোর সদর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার আমেনা বেগম’র নিকট এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছেন। স্বাক্ষর দেখাতে চাইলে তিনি দেখাতে চান নাই। পরে আবারও তার সাথে এ বিষয়ে অফিস কক্ষে কথা বলতে চাইলে রেকর্ড কিপার ভৈরব চক্রবর্ত্তী জানান স্যার এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। তারপরও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ফোন রিসিভ করেন নাই। এদিকে হোয়াটসঅ্যাপেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে সেখানেও তিনি কোন কথা বলেননি।
যশোর জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব বলেন, আমাদের অফিস থেকে জাল দলিল বের হয় এমনটা নয়। তবে এর সাথে কেউ না কেউ জড়িত থাকতে পারে। সাব-রেজিস্ট্রারের সাক্ষর জাল করে দলিলের নকল বের করা এটা আইনানুগ অপরাধ। এরা প্রথম অপরাধ করছে স্বাক্ষর জাল করে, তারপরে এটা দলিলের স্বাক্ষর। বিষয়টি অনেক বড় অপরাধ। বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। স্বাক্ষর নকল করে জাল দলিল তৈরির সাথে যারা জড়িত সঠিক প্রমাণ মিললে অফিস নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর দলিল লেখকদের মধ্যে কেউ জড়িত থাকলে তাদের লাইন্সে বাতিল করা হবে। এমনকি তাদের ব্যাক্তিগত কাজ ছাড়া এ অফিসের আশেপাশেও আসা নিষেধ করে দেওয়া হবে। এখানে আমি যে দলিলের নকল গুলো দেখছি সেখানে আমার মনে হচ্ছে যশোর সদর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রারের সাক্ষরের সাথে মিল নাই। এ স্বাক্ষর গুলো কোন ব্যক্তি নকল করছে।
যশোর জেলা প্রশাসক মো.আজাহারুল ইসলাম বলেন, সাব-রেজিস্ট্রারের সাক্ষর জাল মানে ওই দলিলটায় জাল। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে এটা আইনগত অপরাধ। ভুক্তভোগী এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
যশোর জেলা প্রতিনিধি 
























