কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের চাকবৈঠা নতুন পাড়ায় দালান নির্মাণ করে রোহিঙ্গা নারী এলেম খাতুনের বসতবাড়ি গড়ে তোলাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক ও জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করছে, এসব অবৈধ স্থাপনা ও নাগরিকত্ব প্রাপ্তির পেছনে রয়েছে এক প্রভাবশালী ইউপি সদস্যের ছত্রছায়া।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চাকবৈঠা নতুন পাড়ায় একটি দালান নির্মাণ করে সেখানে গত এক বছর ধরে বসবাস করছেন এক রোহিঙ্গা নারী, নাম এলেম খাতুন। নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হলে শুরুতে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত হন। পরে জানান, তিনি প্রথমে চট্টগ্রামে এরপর রামুর খুনিয়াপালং এলাকায় ছিলেন। সেখান থেকে উখিয়ায় এসে বর্তমানে বসতি গড়েছেন।
এলেম খাতুন দাবি করেন তিনি রত্নাপালং ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য- অলি আহমেদের ভাতিজি, ইউপি সদস্য অলি আহমেদ এলেম খাতুনের চাচা দাবি করেন। আরো জানান, বর্তমান বসতভিটাটি অলি আহমেদের সহযোগিতায় ক্রয় করেছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের কাছে রোহিঙ্গা এলেম খাতুনের জমির মালিকানা নিয়েও উঠেছে নানাম প্রশ্ন। জানা গেছে, তিনি স্থানীয় কৃষক আবু সিদ্দিকের নামে জায়গা কিনে সেখানে দালান নির্মাণ করেছেন।
এই প্রসঙ্গে ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অলি আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এলেম খাতুন ও লাল মিয়া নামে আমার কোনো আত্মীয় নেই, আমি তাদের চিনিও না। তবে ফোন কেটে দেওয়ার কিছুক্ষণ পর অলি আহমদের মেয়ের জামাই সাংবাদিককে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়ে জানান, তুমি চাকবৈটা যেখানটায় সংবাদ সংগ্রহে গিয়েছিলে, তারা আমার নিকট আত্মীয়। এরা যদি রোহিঙ্গা হয়, তবে আমিও রোহিঙ্গা।
এই বক্তব্য থেকেই ধারণা করা যায়, এলেম খাতুনের নাগরিকত্ব প্রাপ্তি এবং বসতবাড়ি নির্মাণে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, এলেম খাতুন অলি আহমদ ও তার মেয়ের জামাইয়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চাকবৈঠা এলাকায় জায়গা কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। মূলত চাকবৈটা এলাকাটি সীমান্ত এলাকার পাশাপাশি হওয়ায় রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদের স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের বসবাসের পিছনে ফ্যাসিস সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামিলীগ নেতাদের হাত রয়েছে এমনটা অভিযোগ সচেতন মহলের।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, যাদের ছত্রছায়ায় এলেম খাতুন রাতারাতি বাংলাদেশি পরিচয়ে বসতি গড়ে তুলেছেন, তারাই এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে তাকে বৈধ প্রমাণ করার হুমকি দিয়ে আসছেন।
এলেম খাতুনের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তিনি জানান, তার আইডি কার্ড বর্তমানে বিদ্যুতের মিটার সংগ্রহের জন্য অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে মোবাইলে তার স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি দেখান। তাতে উল্লেখ রয়েছে নাম: এলেম খাতুন, পিতার নাম: ফজর রহমান, এনআইডি নম্বর: ৮৭০ ২৪৩ ২৪৩৯। ঠিকানায় দেওয়া আছে: মহাজন বাড়ি, গ্রাম: বনিক পাড়া, দক্ষিণ কাট্রলী (পার্ট), চট্টগ্রাম কাস্টমস একাডেমি-৪২১৯, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।
তার এনআইডি যাচাই করার জন্য উখিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করলেই জানা যায়, রোহিঙ্গা এলেম খাতুন ২০১৫ সালে চট্রগ্রাম থেকে এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করেন, সেখানে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে দক্ষিণ কাট্রলি, ওয়ার্ড নং-১১, চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশন,
এবিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার মিজানুর রহমান জানান, রোহিঙ্গা এলেম খাতুনের জাতীয় পরিচয় পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রমানিত হলেই এনআইডি কার্ড বাতিল করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এইদিকে তার স্বামী রোহিঙ্গা লাল মিয়া দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে দেশের বাহিরে রয়েছেন। তার নাম লাল মিয়া হলেও পাসপোর্টে রয়েছে ভিন্ন, পাসপোর্টে কক্সবাজারের ঠিকানা দেওয়া রয়েছে, যেখানে নাম উল্লেখ রয়েছে MLAH LAL এবং ডিজিটাল পাসপোর্ট নম্বর: ই-১৬৩৭১০০, জন্ম নিবন্ধন -১৯৮১০৬১৬৯২৩১০২০৬৪.
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত কাটাতারের বাইরে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন দিন দিন জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। অনেক রোহিঙ্গা মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে কাটাতারের বাহিরে এসে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব সংগ্রহ করছে এবং অসাধু ব্যক্তিদের সহযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসতি গড়ে তুলেছে। এইসব রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে তাদের এনআইডি বাতিল করে পূনরায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠানোর জোর দাবি জানান।
তারা আরও জানান, এসব রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ মাদক ও অস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত। এলেম খাতুনের মেয়েও বসতি স্থাপনের কিছুদিনের মধ্যেই পাশাপাশি স্থানীয় চিহ্নিত এক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, এসব ঘটনার ফলে এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি দিন দিন নাজুক হয়ে পড়ছে। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের অবৈধ নাগরিকত্ব, বসতি নির্মাণ এবং অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে ইউপি সদস্য ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে যদি এসব ঘটনা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সরকারের উচ্চমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে স্থানীয়রা।
সৈয়দ হোসাইন শাহীন, কক্সবাজার 
























