চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১৩টি সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। তার এই ব্যাপক দুর্নীতির ফিরিস্তি নিয়ে ইতিপূর্বে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে প্রতিবারই পার পেয়ে যাচ্ছেন। দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নবাগত মহাপরিচালকের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন দপ্তরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, ফায়ার লাইসেন্স রি-অ্যাসেসমেন্ট বা নবায়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ গ্রহণ, চট্টগ্রাম বিভাগে যোগদানের পর ফায়ার সার্ভিসের নষ্ট ও অকেজো সরকারি মালামাল প্রচলিত সরকারি নিয়ম ও নীতিমালা অনুযায়ী নিলামে না তুলে অর্থ আত্মসাৎ লক্ষ্যে খোলা বাজারে গোপনে বিক্রিসহ বিভিন্ন অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে।
পরিবারতন্ত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি চরম বেপরোয়া। নিজের ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে ফায়ার সার্ভিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের সমস্ত ইন্সপেক্টরদের তার ভাইয়ের কাছে কার্যত জিম্মি করে রেখেছেন। এর আগে সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে মে ও জুন ২০২৬ সময়ে তিনি ইন্সপেক্টরদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেন। ওই সময় অগ্নি নিরাপত্তার মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং কোনো ধরনের যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে তিনি অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও চরম তাড়াহুড়ো করে মোট ৪৫২টি ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ইস্যু করেন।
তার বদলি এবং পোস্টিং বাণিজ্যের জালও বেশ বিস্তৃত। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগে কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং নিতে তিনি তৎকালীন ডিজির স্টাফ অফিসার (উপপরিচালক) আরমানকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ প্রদান করেছিলেন। একইভাবে, সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির সুপারিশের ক্ষেত্রেও তার স্বাক্ষর বা সুপারিশ পেতে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ প্রদান করতে হয়; টাকা না দিলে তিনি ফাইল আটকে রাখেন এবং বদলির সুপারিশ করেন না।
টেন্ডার ও কেনাকাটায় দুর্নীতির চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। চট্টগ্রাম বিভাগের ই-জি-পি টেন্ডারের মাধ্যমে রেশনের জন্য সরবরাহকৃত নিম্নমানের ডাল ইউডি হাশেমের মাধ্যমে চাকতাই থেকে ক্রয় করে শহরের বাইরের বিভিন্ন স্টেশনে সরবরাহ করা হয়। এ নিয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানালে তিনি তাদের বদলির ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখেন। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তাদের ম্যানেজ করার পাশাপাশি স্টাফদের প্রতি কেজি ডাল বাবদ ৪০ টাকা করে পরিশোধ করেন। এছাড়া বিগত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিভাগের ১০৫টি ফায়ার স্টেশনের বিভাগীয় কারিগরি কারখানায় বিভিন্ন গাড়ি ও পাম্পের মেরামতের বকেয়া বিল পরিশোধ না করে তিনি নিজের ইচ্ছেমতো নতুন বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। এ সময় বাবুলসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তার সাথে দেখা করতে গেলে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে অগ্রिम ১৫ শতাংশ কমিশন দিতে হবে, কারণ এই টাকা ঢাকা অধিদপ্তরে পৌঁছাতে হয়; অন্যথায় কোনো বিল পরিশোধ করা হবে না।
তার দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির মাশুল দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকেও। সম্প্রতি কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের ইনানী টুপ টুপ রিসোর্টে শনিবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এর ঠিক পূর্বে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি (রহিম ও কামাল) লাইসেন্সের বিষয়ে এডি তৌফিকুলের সাথে দেখা করে ফায়ার সেফটি বা অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরামর্শ চান। ওই প্রতিষ্ঠানে বসে তিনি খাওয়া-দাওয়াও করেন এবং পরবর্তীতে তার রানারের সাথে কথা বলতে বলেন। তার নির্দেশমতো রানার লাইসেন্স বাবদ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করায় প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্স করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। পরবর্তী সময়ে এই অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে সংঘটিত আগুনে ১০টি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যায়।
এর আগে কুমিল্লায় কর্মরতের সময় তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এপিএস কামাল তার ঘনিষ্ট বন্ধু হওয়ার সুবাদে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে মনোহরগঞ্জ নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণকাজে অত্যন্ত নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করেন। তাছাড়া কুমিল্লা ফায়ার স্টেশন মসজিদ নির্মাণের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদ টাকা, রড, সিমেন্ট, বালি, ফ্যান ও টাইলস সংগ্রহ করা হলেও সেই নির্মাণসামগ্রী ও নগদ অর্থের একটি বড় অংশ তিনি নিজের বাড়িতে নিয়ে যান।
এসব চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সাংবাদিকরা এডি মো. তৌফিকুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার কল করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি তার কাছে খুদেবার্তা বা এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এমতাবস্থায় চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের নির্যাতিত ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নবাগত মহাপরিচালকের জোরালো পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























