রাজধানীর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিল-কমলাপুর এলাকায় এসএ পরিবহনের জমি উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৪৫ বছর ধরে পার্সেল ও কুরিয়ার সেবা দিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটির সেবার পরিসর বাড়াতে সংগৃহীত ৫১.৫৩ শতাংশ জমি নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর জটিলতা। অভিযোগ রয়েছে, অনৈতিক সুবিধা আদ্বায়ে ব্যর্থ হয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একাংশ আদালতের নির্দেশকে উপেক্ষা করে গায়ের জোরে এই জায়গাটির দখল নিয়েছে। কাগজপপত্রে যে জমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন, সেটিকে হুট করেই সরকারি প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখানোর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কাযী স্বার্থ বা প্রভাবশালী মহলের ইশারা কাজ করছে কি না—তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
নথি ও দলিলের তথ্য অনুযায়ী, সিএস রেকর্ড সূত্রে এই এলাকার মোট জমির পরিমাণ ৯.৭৬ একর। এর মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অংশ থেকে সরকার ১৯৮৫ সালে মাত্র ১.২৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে, যা পরবর্তী সময়ে ঢাকা ব্যাংক ও স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়া হয়। শতবর্ষ ধরে মূল মালিকদের অধীনে থাকা অবশিষ্ট জমির একটি বড় অংশ ২০১৯ সালে নিয়ম মেনে ক্রয় করে এসএ পরিবহন। জমি ক্রয়ের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত সরকারের রাজস্ব ও খাজনা-খারিজ পরিশোধ করে আসছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসএ পরিবহনের স্বত্বাধিকারী সালাহউদ্দিন আহমেদ বৈধ আইনি প্রক্রিয়ায় জমিটি কিনলেও রাজউকের দাবি করা দাগ নম্বর ও নকশার সঙ্গে এই জমির প্রকৃত অবস্থানের স্পষ্ট বৈপরীত্য বিদ্যমান। নিজেদের নির্ধারিত সীমানা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না করেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা এবং বুলডোজার চালানোর বিষয়টি রাজউকের পেশাদারত্ব ও উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
আইনি ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজউকের পূর্ববর্তী চেয়ারম্যানের মেয়াদে নথি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলে ভুক্তভোগী পক্ষ হাইকোর্টে রিট আবেদন করে এবং মালিকানা সুনির্দিষ্ট করার লক্ষ্যে জজ কোর্টে মামলা দায়ের করে। দেওয়ানি মামলা চলাকালে সময়ক্ষেপণ করায় আদালত বাদীপক্ষকে হয়রানি না করার বিষয়ে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীতে নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর তড়িঘড়ি করে হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে বিতর্কিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসার আগেই এই ধরনের পদক্ষেপকে আইনের শাসনের ব্যত্যয় বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু বেসরকারি বিনিয়োগকারীর জমিই নয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের রেকর্ডভুক্ত জমিতেও কোনো ধরনের আলোচনা বা আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর ছাড়াই রাজউক উচ্ছেদ অভিযান ও দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠালেও রাজউকের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো কার্যকর জবাব মেলেনি। একটি সরকারি সংস্থার জমি অন্য সরকারি সংস্থা কর্তৃক বেআইনিভাবে দখলের এই চেষ্টা সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করছে।
সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবীদের অভিমত, রাজউকের মূল প্লটের সঠিক সীমানা নির্ধারণ না করে কারো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সম্পত্তি উচ্ছেদ করা সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহারের নামান্তর। অধিকারকর্মীরাও মনে করেন, আদালতের স্থগিতাদেশ ও আইনি পথকে পাশ কাটিয়ে পরিচালিত এই অভিযান দেশের বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। রাজউকের পক্ষ থেকে এই অভিযানকে আইনসম্মত বলে দাবি করা হলেও, ভুল নকশা ও নথির দায় আড়াল করতে বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জমিতে হামলা চালানো হয়েছে কি না—তা নিয়ে সচেতন মহলে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















