জাইকার অর্থায়নে জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর দেশে না ফিরে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অথরাইজড অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম (সাইফ)। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি উল্লেখ করে রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে জাপান সরকারের ব্যয় করা অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
এ ঘটনায় জাইকার কাছে রাজউকের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাইফুল ইসলাম ছাড়াও রাজউকের আরও কয়েকজন অথরাইজড অফিসারের বিদেশে গিয়ে দেশে না ফেরার অভিযোগ রয়েছে।
জাইকার চিঠিতে তদন্তের তাগিদ
রাজউক সূত্রে জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) বাংলাদেশ কার্যালয়ের সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ শোজি ইজুমি স্বাক্ষরিত একটি চিঠি রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে অন্য দেশে চলে যাওয়া এবং কর্মস্থলে যোগ না দেওয়াকে আন্তর্জাতিক কর্মসূচির শর্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এ ধরনের আচরণ সরকারি সম্পদের অপচয় ঘটায় এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত পরিচালনা, মো. সাইফুল ইসলামের বর্তমান অবস্থান এবং দেশে না ফেরার কারণ যাচাই করার তাগিদ দিয়েছে জাইকা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত সিভিল সার্ভিস বিধিমালা, চাকরির নিয়ম ও বন্ডের শর্ত অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রশিক্ষণে জাপান সরকারের ব্যয় করা অর্থ পুনরুদ্ধারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং এ বিষয়ে গৃহীত ব্যবস্থা লিখিতভাবে জাইকাকে জানাতে রাজউককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এক বছরের মাস্টার্স কোর্স শেষে দেশে ফেরেননি
রাজউক সূত্রে জানা যায়, জাইকার উন্নয়ন সহায়তা কাঠামোর আওতায় ‘ভূমিকম্প ও সুনামি দুর্যোগ প্রশমন’ বিষয়ক এক বছরের মাস্টার্স কোর্সে অংশ নিতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানে যান রাজউকের অথরাইজড অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম (সাইফ)।
প্রশিক্ষণ শেষে অর্জিত জ্ঞান নিজ প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগানোর কথা থাকলেও কোর্স শেষ করে তিনি দেশে ফেরেননি। একাধিক সূত্রের দাবি, জাইকা তাঁর দেশে ফেরার জন্য গত ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করেছিল। তবে রাজউক বা জাইকাকে কিছু না জানিয়েই তিনি অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান।
এ ঘটনায় প্রশিক্ষণের শর্ত, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে রাজউকের উদ্বেগ
এ বিষয়ে রাজউকের সদস্য (প্রশাসন) মো. শাহীনুর আলম বলেন, “জাইকার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে রাজউকসহ পুরো সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে জন্য আমরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা ভ্রমণের বিষয়ে কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করব। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়েও আলোচনা হয়েছে।”
রাজধানী ঢাকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রাজউকের অথরাইজড অফিসারদের বিদেশে গিয়ে দেশে না ফেরার বিষয়টি সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। রাজউকের একাধিক কর্মকর্তার মতে, নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে ইমারত নির্মাণ তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম
রাজউকের বিদেশে গিয়ে দেশে না ফেরা কর্মকর্তাদের তালিকায় সাইফুল ইসলাম ছাড়াও অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসান, মো. ইমরুল হাসান, শেখ মহাব্বির রনি ও মোহাম্মদ হোসেনের নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ তালিকায় আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম যুক্ত হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব কর্মকর্তার বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা জরুরি।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানাল রাজউক
এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “জাইকা থেকে আমরা চিঠি পেয়েছি। মো. সাইফুল ইসলাম উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে না ফিরে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার বিষয়টি নথিতে উপস্থাপনসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
জাইকার চিঠির পর বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে কতদূর এগোয়, প্রশিক্ষণে ব্যয় করা অর্থ পুনরুদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়—এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















