ঢাকা ০১:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএর মাহবুবুর রহমানের সিন্ডিকেটে জিম্মি গ্রাহকরা বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী ফরহাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সোনাইমুড়ী সাব-রেজিস্ট্রার সিরাজুল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ গোয়াইনঘাটে এলজিইডির ডিজাইন টিমের সড়ক প্রকল্প পরিদর্শন উৎসবমুখর পরিবেশে শাহ্ আলী গার্লস স্কুল শপিং কমপ্লেক্স ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত ময়মনসিংহ খামারবাড়ির উপপরিচালক মোহাম্মদ এনামুল হকের বিদায় সংবর্ধনা পৌরসভা কার্যালয়ে ঢুকে চাঁদা দাবি, হত্যার হুমকি; গ্রেপ্তার ১ পার্বতীপুরে মোস্তফাপুর ইউনিয়ন ভবন পূর্বের স্থানে নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি পাথরঘাটায় গৃহবধূকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ, দুই লাখ টাকা দাবির মামলা বড়লেখায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ গ্রেপ্তার ৭

মিরপুরের আলোক হাসপাতালে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, সেবায় উচ্চমূল্যের অভিযোগ

একের পর এক ভবন জোড়া লাগিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে। রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির হেলথকেয়ার হাসপাতালে একটি ভবনের সঙ্গে আরেকটি ভবন জোড়া লাগানো অবস্থায় দেখা গেছে। একই এলাকার আলোকের অন্য দুটি শাখা হাসপাতালেও বিল্ডিং কোড মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালগুলোর কোথাও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগও উঠেছে।

রোগীদের আশঙ্কা, এসব হাসপাতালে আগুন লাগলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে বিভিন্ন সেবার জন্য উচ্চমূল্য নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রয়েছে আরও নানা অসঙ্গতি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরেজমিন পরিদর্শনে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ৪ ও ৬ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেলের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে অবস্থিত আলোক হাসপাতালের তিনটি শাখা সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটির নাম—আলোক হাসপাতাল লিমিটেড, আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার এবং আলোক হেলথকেয়ার। এর মধ্যে দুটি হাসপাতালে জরুরি বহির্গমনের কোনো ব্যবস্থা নেই বলে দেখা গেছে।

আলোক হেলথকেয়ারে দুটি ভবন জোড়া দেওয়া হয়েছে। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাতায়াতের জন্য নিচতলা ও চতুর্থ তলায় সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হাসপাতালটির একটি ভবন সাততলা এবং অপরটি পাঁচতলা। আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের ভবনটি নয়তলা। আর আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালটি ১০ তলা ভবনে অবস্থিত।

মিরপুর ১০ নম্বরে আলোক হাসপাতালের একটি শাখা। ছবি: আয়নাল হোসেন

মিরপুর-১০ নম্বরে অবস্থিত আলোক হাসপাতালের একটি শাখা।

অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

৪ অক্টোবর মিরপুর-১০ এলাকায় অবস্থিত আলোক হাসপাতাল লিমিটেড ও আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে সরেজমিন ঘুরে বিভিন্ন অসঙ্গতি দেখা যায়। ডায়াগনস্টিক ও জেনারেল হাসপাতালের ছাদের এক পাশে একটি ক্যান্টিন রয়েছে। সেখান থেকেই রোগী ও তাঁদের স্বজনদের খাবার সরবরাহ করা হয়।

হাসপাতালটির সপ্তম তলায় কেবিন রয়েছে। এরপর রয়েছে আইসিইউ, চিকিৎসকদের চেম্বারসহ ডায়াগনস্টিক সেন্টার। রোগী ওঠানামার জন্য কোনো র‍্যাম্প নেই বলে দেখা গেছে। রোগী ও স্বজনদের যাতায়াতে দুটি লিফটই ভরসা। তবে হাসপাতালটির কোথাও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চোখে পড়েনি। আগুন লাগলে নিচে নামার একমাত্র ভরসা খাড়া সিঁড়ি। জরুরি বহির্গমনেরও ব্যবস্থা নেই।

আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের ১০ তলায় নামাজের কক্ষ ও হিসাব বিভাগ রয়েছে। ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা ১৭টি। বাকি ফ্লোরগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন কেবিন। রোগীর স্বজনদের দাবি, কেবিনে রোগী রাখা হলে বাড়তি টাকা আদায় করা যায়। এ কারণে শয্যার তুলনায় কেবিন বেশি রাখা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের উপপরিচালক মনির খান বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। হয়তো আপনার চোখে তা পড়েনি। আপনি একসময় আসেন। আপনাকে আমি নিজে ঘুরিয়ে দেখাব। নকশায় আছে বলেই ভবনগুলো একটির সঙ্গে অপরটির জোড়া লাগানো অবস্থায় রয়েছে। আমাদের হাসপাতালটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান। আমাদের প্রতিষ্ঠানও স্কয়ার, আজগর আলীর মানের। এরপরও তুলনায় অন্যদের চেয়ে খরচ আমাদের এখানে কম।’

মাতৃসেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ওষুধসহ সিজারিয়ান অপারেশনে খরচ ৮ হাজার ৬০০ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মিরপুরে অবস্থিত আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টার হাসপাতালে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সাধারণ শয্যায় থাকা সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যয় ৯০ হাজার টাকা বলে জানা গেছে। কেবিনে থাকলে খরচ আরও ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়বে। নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কোনো বিশেষ চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করাতে চাইলে আরও ৫ হাজার টাকা বেশি লাগে।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে রঙিন আল্ট্রাসনোগ্রাফির খরচ ১ হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে আলোক ডায়াগনস্টিক ও জেনারেল হাসপাতালে এ পরীক্ষার খরচ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এসি কেবিনের ভাড়া প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ টাকা, আর আলোক হাসপাতালে ৫ হাজার টাকা।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সঙ্গে ব্যয়ের তুলনা করা হলে মনির খান বলেন, ‘আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট। আমাদের মানের সঙ্গে আদ্-দ্বীনের তুলনা করলে হবে না।’

আলোক মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতাল। ছবি: আয়নাল হোসেন

আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার

 

রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে রাকিবুল হাসান (৩১) ডেঙ্গু সন্দেহে এই হাসপাতালে আসেন। তিনি চিকিৎসক হারুন-উর-রশিদের পরামর্শ নেন। চিকিৎসক তাঁকে সাতটি পরীক্ষা দেন। এর মধ্যে ছিল ইউরোফ্লুমেট্রি, র‍্যানডম গ্লুকোজ, ক্রনিক আনপ্রেডিকটেবল স্ট্রেস র‍্যান্ডম, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইউরিন আর/ই, এক্স-রে কিউইউবি ডিজিটাল ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি। এসব পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ রোগীর কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা নেওয়া হয়। পরে কমিশন হিসেবে তাঁকে ৮৭০ টাকা ফেরত দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

মিরপুর-১০ নম্বরের বাসিন্দা ইমরান হোসেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে আলোক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ইমরান হোসেন বলেন, আল্ট্রাসনোগ্রাফির ফি ৩ হাজার টাকা বলা হলেও তাঁর কাছ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা রাখা হয়েছে।

 

সিজারিয়ানের খরচ নিয়ে ভিন্ন তথ্য

আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে সিজারিয়ানের ব্যয় সম্পর্কে জানতে কাস্টমার কেয়ার কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি জানতে চান, কোন চিকিৎসকের মাধ্যমে অপারেশন করানো হবে। তখন যেকোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে করালে কত ব্যয় হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতালের যেকোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে অপারেশন করালে ওষুধ ও পরীক্ষা ছাড়া সাধারণ শয্যায় ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হবে।

তিনি আরও জানান, বিভিন্ন পরীক্ষা ও ওষুধের জন্য আলাদা টাকা দিতে হবে। কেবিনে থাকলে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লাগবে। বিশেষ কোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে অপারেশন করালে আরও ৫ হাজার টাকা বেশি দিতে হবে।

কোনো অপারেশনের খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে জানতে চান, কী ধরনের অপারেশন। জরায়ু ক্যান্সারের অপারেশন বলা হলে ওই কর্মকর্তা জানান, ক্যান্সারের ২৯ ধরনের ধরন রয়েছে। রোগী হাসপাতালে এলে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন কী ধরনের অপারেশন প্রয়োজন।

ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা হাসপাতালে আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি পাশের ১০৩ নম্বর কক্ষে থাকা ম্যানেজার সোহেলের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

ম্যানেজার সোহেলের সঙ্গে কথা বলার সময় হাসপাতালের বিভিন্ন অসঙ্গতি, বিশেষ করে রোগী ওঠানামার র‍্যাম্প, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র এবং পরীক্ষা, অপারেশন ও কেবিনের অতিরিক্ত ফির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।

জবাবে সোহেল বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে অবশ্যই র‍্যাম্প আছে।’ এরপর তিনি লিফটের পূর্ব পাশে একটি র‍্যাম্প দেখান। তবে সেটি মূলত লিফট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ বলে দেখা যায়।

অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কেন নেই—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবই আছে। কিন্তু অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চুরি হওয়ার কারণে লাগানো হয় না।’

সোহেল আরও বলেন, হাসপাতালের যেকোনো তথ্য জানতে হলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে। এ বিষয়ে উপপরিচালক মনির খানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

 

আলোক হাসপাতাল লিমিটেড। ছবি: আয়নাল হোসেন

আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের শাখা

বিশেষজ্ঞের মত

হাসপাতালে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় এবং বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফি ১০০ টাকার পরিবর্তে ৪০০ টাকা আদায় করছে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া ডেলিভারি বা সিজারিয়ানে কোনোভাবেই ৯০ হাজার টাকা বিল হতে পারে না। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগকে একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে রোগীদের ব্যয় কম থাকে।’

তাঁর মতে, একটি স্বাভাবিক প্রসবে ১২ হাজার টাকার বেশি খরচ হওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে রাতে এক সহকর্মী আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাসপাতালে ফোন করে স্বাভাবিক প্রসব ও সিজারিয়ানের খরচ জানতে চান। তখন হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, স্বাভাবিক প্রসবের খরচ ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা এবং এর জন্য একদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। এ খরচের মধ্যে ওষুধপত্র অন্তর্ভুক্ত নয়। আর সিজারিয়ানের জন্য ওষুধ ছাড়া ৭০ হাজার টাকা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হবে বলে জানানো হয়।

ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের

আলোক হাসপাতালের অসঙ্গতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আলোক হাসপাতাল নিয়ে আরও একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করেছিলেন। সেখানে যেসব অসঙ্গতি রয়েছে, তা আমি সরেজমিন পরিদর্শন করব। এরপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অলোক হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বলেন, ‘রাজধানীর শতকরা ৯০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং ফায়ার আইনের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে। ফায়ার আইনে বলা আছে, সাত তলার ওপরে ভবন হলে সেখানে ফায়ার সেফটি বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বিল্ডিং কোডে বলা আছে, ১০ তলার ওপরে হলে সেফটি অনুসরণ করতে হবে।’

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নারায়ণগঞ্জ বিআরটিএর মাহবুবুর রহমানের সিন্ডিকেটে জিম্মি গ্রাহকরা

মিরপুরের আলোক হাসপাতালে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, সেবায় উচ্চমূল্যের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৩:০৮:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

একের পর এক ভবন জোড়া লাগিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে। রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির হেলথকেয়ার হাসপাতালে একটি ভবনের সঙ্গে আরেকটি ভবন জোড়া লাগানো অবস্থায় দেখা গেছে। একই এলাকার আলোকের অন্য দুটি শাখা হাসপাতালেও বিল্ডিং কোড মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালগুলোর কোথাও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগও উঠেছে।

রোগীদের আশঙ্কা, এসব হাসপাতালে আগুন লাগলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে বিভিন্ন সেবার জন্য উচ্চমূল্য নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রয়েছে আরও নানা অসঙ্গতি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরেজমিন পরিদর্শনে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ৪ ও ৬ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেলের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে অবস্থিত আলোক হাসপাতালের তিনটি শাখা সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটির নাম—আলোক হাসপাতাল লিমিটেড, আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার এবং আলোক হেলথকেয়ার। এর মধ্যে দুটি হাসপাতালে জরুরি বহির্গমনের কোনো ব্যবস্থা নেই বলে দেখা গেছে।

আলোক হেলথকেয়ারে দুটি ভবন জোড়া দেওয়া হয়েছে। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাতায়াতের জন্য নিচতলা ও চতুর্থ তলায় সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হাসপাতালটির একটি ভবন সাততলা এবং অপরটি পাঁচতলা। আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের ভবনটি নয়তলা। আর আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালটি ১০ তলা ভবনে অবস্থিত।

মিরপুর ১০ নম্বরে আলোক হাসপাতালের একটি শাখা। ছবি: আয়নাল হোসেন

মিরপুর-১০ নম্বরে অবস্থিত আলোক হাসপাতালের একটি শাখা।

অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

৪ অক্টোবর মিরপুর-১০ এলাকায় অবস্থিত আলোক হাসপাতাল লিমিটেড ও আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে সরেজমিন ঘুরে বিভিন্ন অসঙ্গতি দেখা যায়। ডায়াগনস্টিক ও জেনারেল হাসপাতালের ছাদের এক পাশে একটি ক্যান্টিন রয়েছে। সেখান থেকেই রোগী ও তাঁদের স্বজনদের খাবার সরবরাহ করা হয়।

হাসপাতালটির সপ্তম তলায় কেবিন রয়েছে। এরপর রয়েছে আইসিইউ, চিকিৎসকদের চেম্বারসহ ডায়াগনস্টিক সেন্টার। রোগী ওঠানামার জন্য কোনো র‍্যাম্প নেই বলে দেখা গেছে। রোগী ও স্বজনদের যাতায়াতে দুটি লিফটই ভরসা। তবে হাসপাতালটির কোথাও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চোখে পড়েনি। আগুন লাগলে নিচে নামার একমাত্র ভরসা খাড়া সিঁড়ি। জরুরি বহির্গমনেরও ব্যবস্থা নেই।

আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের ১০ তলায় নামাজের কক্ষ ও হিসাব বিভাগ রয়েছে। ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা ১৭টি। বাকি ফ্লোরগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন কেবিন। রোগীর স্বজনদের দাবি, কেবিনে রোগী রাখা হলে বাড়তি টাকা আদায় করা যায়। এ কারণে শয্যার তুলনায় কেবিন বেশি রাখা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের উপপরিচালক মনির খান বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। হয়তো আপনার চোখে তা পড়েনি। আপনি একসময় আসেন। আপনাকে আমি নিজে ঘুরিয়ে দেখাব। নকশায় আছে বলেই ভবনগুলো একটির সঙ্গে অপরটির জোড়া লাগানো অবস্থায় রয়েছে। আমাদের হাসপাতালটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান। আমাদের প্রতিষ্ঠানও স্কয়ার, আজগর আলীর মানের। এরপরও তুলনায় অন্যদের চেয়ে খরচ আমাদের এখানে কম।’

মাতৃসেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ওষুধসহ সিজারিয়ান অপারেশনে খরচ ৮ হাজার ৬০০ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মিরপুরে অবস্থিত আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টার হাসপাতালে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সাধারণ শয্যায় থাকা সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যয় ৯০ হাজার টাকা বলে জানা গেছে। কেবিনে থাকলে খরচ আরও ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়বে। নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কোনো বিশেষ চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করাতে চাইলে আরও ৫ হাজার টাকা বেশি লাগে।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে রঙিন আল্ট্রাসনোগ্রাফির খরচ ১ হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে আলোক ডায়াগনস্টিক ও জেনারেল হাসপাতালে এ পরীক্ষার খরচ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এসি কেবিনের ভাড়া প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ টাকা, আর আলোক হাসপাতালে ৫ হাজার টাকা।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সঙ্গে ব্যয়ের তুলনা করা হলে মনির খান বলেন, ‘আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট। আমাদের মানের সঙ্গে আদ্-দ্বীনের তুলনা করলে হবে না।’

আলোক মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতাল। ছবি: আয়নাল হোসেন

আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার

 

রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে রাকিবুল হাসান (৩১) ডেঙ্গু সন্দেহে এই হাসপাতালে আসেন। তিনি চিকিৎসক হারুন-উর-রশিদের পরামর্শ নেন। চিকিৎসক তাঁকে সাতটি পরীক্ষা দেন। এর মধ্যে ছিল ইউরোফ্লুমেট্রি, র‍্যানডম গ্লুকোজ, ক্রনিক আনপ্রেডিকটেবল স্ট্রেস র‍্যান্ডম, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইউরিন আর/ই, এক্স-রে কিউইউবি ডিজিটাল ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি। এসব পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ রোগীর কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা নেওয়া হয়। পরে কমিশন হিসেবে তাঁকে ৮৭০ টাকা ফেরত দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

মিরপুর-১০ নম্বরের বাসিন্দা ইমরান হোসেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে আলোক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ইমরান হোসেন বলেন, আল্ট্রাসনোগ্রাফির ফি ৩ হাজার টাকা বলা হলেও তাঁর কাছ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা রাখা হয়েছে।

 

সিজারিয়ানের খরচ নিয়ে ভিন্ন তথ্য

আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে সিজারিয়ানের ব্যয় সম্পর্কে জানতে কাস্টমার কেয়ার কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি জানতে চান, কোন চিকিৎসকের মাধ্যমে অপারেশন করানো হবে। তখন যেকোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে করালে কত ব্যয় হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতালের যেকোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে অপারেশন করালে ওষুধ ও পরীক্ষা ছাড়া সাধারণ শয্যায় ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হবে।

তিনি আরও জানান, বিভিন্ন পরীক্ষা ও ওষুধের জন্য আলাদা টাকা দিতে হবে। কেবিনে থাকলে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লাগবে। বিশেষ কোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে অপারেশন করালে আরও ৫ হাজার টাকা বেশি দিতে হবে।

কোনো অপারেশনের খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে জানতে চান, কী ধরনের অপারেশন। জরায়ু ক্যান্সারের অপারেশন বলা হলে ওই কর্মকর্তা জানান, ক্যান্সারের ২৯ ধরনের ধরন রয়েছে। রোগী হাসপাতালে এলে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন কী ধরনের অপারেশন প্রয়োজন।

ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা হাসপাতালে আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি পাশের ১০৩ নম্বর কক্ষে থাকা ম্যানেজার সোহেলের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

ম্যানেজার সোহেলের সঙ্গে কথা বলার সময় হাসপাতালের বিভিন্ন অসঙ্গতি, বিশেষ করে রোগী ওঠানামার র‍্যাম্প, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র এবং পরীক্ষা, অপারেশন ও কেবিনের অতিরিক্ত ফির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।

জবাবে সোহেল বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে অবশ্যই র‍্যাম্প আছে।’ এরপর তিনি লিফটের পূর্ব পাশে একটি র‍্যাম্প দেখান। তবে সেটি মূলত লিফট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ বলে দেখা যায়।

অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কেন নেই—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবই আছে। কিন্তু অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চুরি হওয়ার কারণে লাগানো হয় না।’

সোহেল আরও বলেন, হাসপাতালের যেকোনো তথ্য জানতে হলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে। এ বিষয়ে উপপরিচালক মনির খানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

 

আলোক হাসপাতাল লিমিটেড। ছবি: আয়নাল হোসেন

আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের শাখা

বিশেষজ্ঞের মত

হাসপাতালে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় এবং বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফি ১০০ টাকার পরিবর্তে ৪০০ টাকা আদায় করছে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া ডেলিভারি বা সিজারিয়ানে কোনোভাবেই ৯০ হাজার টাকা বিল হতে পারে না। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগকে একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে রোগীদের ব্যয় কম থাকে।’

তাঁর মতে, একটি স্বাভাবিক প্রসবে ১২ হাজার টাকার বেশি খরচ হওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে রাতে এক সহকর্মী আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাসপাতালে ফোন করে স্বাভাবিক প্রসব ও সিজারিয়ানের খরচ জানতে চান। তখন হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, স্বাভাবিক প্রসবের খরচ ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা এবং এর জন্য একদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। এ খরচের মধ্যে ওষুধপত্র অন্তর্ভুক্ত নয়। আর সিজারিয়ানের জন্য ওষুধ ছাড়া ৭০ হাজার টাকা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হবে বলে জানানো হয়।

ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের

আলোক হাসপাতালের অসঙ্গতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আলোক হাসপাতাল নিয়ে আরও একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করেছিলেন। সেখানে যেসব অসঙ্গতি রয়েছে, তা আমি সরেজমিন পরিদর্শন করব। এরপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অলোক হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বলেন, ‘রাজধানীর শতকরা ৯০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং ফায়ার আইনের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে। ফায়ার আইনে বলা আছে, সাত তলার ওপরে ভবন হলে সেখানে ফায়ার সেফটি বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বিল্ডিং কোডে বলা আছে, ১০ তলার ওপরে হলে সেফটি অনুসরণ করতে হবে।’