লালমনিরহাটে স্ত্রীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার দায়ে স্বামী মো. আতিকুল ইসলামকে (৩০) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী জনাকীর্ণ আদালতে বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আতিকুল ইসলাম আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, নিহত মিতু আক্তার লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্দা ইউনিয়নের গোকুন্দা দাড়ারপাড় মুন্সিটারী এলাকার বাসিন্দা। আর দণ্ডপ্রাপ্ত আতিকুল ইসলাম একই এলাকার মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে।
প্রায় দুই বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের পাঁচ মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান ছিল। বিয়ের পর থেকেই পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিতুর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে স্বামী আতিকুলের বিরুদ্ধে।
২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাতে পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে আতিকুল তার স্ত্রী মিতুকে গালিগালাজ করেন। কাজের উদ্দেশ্যে পাবনা যাওয়ার কথা জানালে মিতু বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আতিকুল তার মাথা ও মুখে কিল-ঘুষি মারেন। পরে ঘরের উঠানে থাকা শক্ত প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে মিতুর শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
নির্যাতনের একপর্যায়ে মিতুর মৃত্যু হয়। এরপর রাতেই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান আতিকুল।
পরদিন সকালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মায়ের মরদেহের পাশে পাঁচ মাসের শিশু আতিকা আক্তারের কান্নার শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে ঘরের ভেতরে মিতুর নিথর দেহ দেখতে পান। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে।
পরে নিহতের বাবা মো. ইসলাম বাদী হয়ে লালমনিরহাট সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২৪ সালের ৪ জুলাই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ১৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে আদালত আতিকুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (এপিপি) অ্যাডভোকেট সামসুল আলম মিলন সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করেই এ রায় দিয়েছেন। নারী নির্যাতন ও নৃশংসতার বিরুদ্ধে এ রায় একটি কঠোর বার্তা বহন করবে।
আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির উচ্চ আদালতে আপিল করার আইনগত সুযোগ রয়েছে।
এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে নিহত মিতু আক্তারের পরিবার। অন্যদিকে, মিতুর মৃত্যুর পর মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত সেই শিশুকন্যার জীবনের করুণ অধ্যায়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।
মো. মিজানুর রহমান লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি 


















