ঢাকা ১০:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নতুন দায়িত্ব পেলেন আসিফ, সারজিস ও মিতু ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সুযোগ নেই, বিচারের মুখোমুখি করতে হবে’ ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে আসতে তরুণদের প্রতি আহ্বান রাষ্ট্রপতির বান্দরবানে পর্যটকবাহী গাড়ি খাদে পড়ে নিহত ২ মেরুল বাড্ডায় রাজউকের ১১ একর জমি বেদখল, ২১ বছরেও উদ্ধারের উদ্যোগ নেই তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১০০ শতাংশের বেশি মন্টিনেগ্রোতে বছরে ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনা তাড়াইল সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত বরগুনায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণের দুই মাসেই ধস একাধিক আবাসিক হোটেল ঘিরে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে নারী পাচার-মাদক কারবারের অভিযোগ
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি

সমবায়ের অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুলের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক মো. নবীরুল ইসলাম (অডিট ও আইন)-এর বিরুদ্ধে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জালিয়াতি, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও শারীরিক নির্যাতনসহ নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

মাগুরা জেলার লক্ষীকোল গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত মো. সহিদুল ইসলামের ছেলে নবীরুল ইসলাম ২০তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সমবায় ক্যাডারে সহকারী নিবন্ধক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নিয়োগের ভিত্তিই ছিল জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি। তিনি তাঁর বাবার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অবৈধভাবে সরকারি চাকরি নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০তম বিসিএস পরীক্ষার আগে তিনি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (বিপিএসসি) জুনিয়র গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় বিপিএসসির তৎকালীন সদস্য মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগ রয়েছে, নবীরুল ইসলাম বিপিএসসির তৎকালীন সদস্য মাহফুজুর রহমানকে বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং তাঁর পিতার মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাই-বাছাইয়ের সময় সঠিক হিসেবে পার করিয়ে নেন। এ ঘটনায় ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা নম্বর-২৪ দায়ের করা হয়। মামলাটি তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো তদন্ত করছিল।

এই অভিযোগের পর তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। ২০০১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ব্যুরোর ইন্সপেক্টর এস এম আকতার হামিদ ভূঁঞা মাদারীপুরের তৎকালীন জেলা সমবায় কর্মকর্তা নবীরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্য প্রদানের জন্য ২০০২ সালের ৫ জানুয়ারি ব্যুরোর প্রধান কার্যালয়ে তলব করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা এস এম আকতার হামিদ ভূঁঞা মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে নবীরুল ইসলামের পক্ষে মিথ্যা ও সাজানো প্রতিবেদন দেন।

 

এ ছাড়া বিপিএসসিতে কর্মরত থাকাকালে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের পাস করানোর নামে ৩ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও ছিল নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগের তদন্তে ২০০২ সালের ২ জুলাই দুর্নীতি দমন ব্যুরোর তৎকালীন উপপরিচালক শামছুল নাহার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেন।

কাফরুল থানার মামলাটি যখন ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে (বিশেষ মামলা নং-৬৯/২) বিচারাধীন ছিল, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলামের প্রভাবে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক শফিউর রহমান স্বাক্ষরিত একটি গোপন চিঠির মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলাটি প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তৎকালীন বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রেজাউল করিম খান (চুন্নু) বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নবীরুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে ক্ষমতার প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নবীরুল ইসলাম একের পর এক লাভজনক পদে পদায়ন পান বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পাওয়ার জন্য সমবায় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মতিউর রহমানকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অথচ ওই পদে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে সাইফুল ইসলামকে পদায়নের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক।

ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নবীরুল ইসলাম ঘুষ ও দুর্নীতির একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রতিদিন সকালে মিরপুরের বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে মিরপুর বা আশপাশের এলাকার এক বা একাধিক সমবায় সমিতি পরিদর্শনে যেতেন। তাঁর অধীনস্থ টেকনিক্যাল কো-অপারেশন অফিসার (টিসিও), সহকারী পরিদর্শক বা পরিদর্শকদের মাধ্যমে প্রতিটি সমিতি থেকে ‘পরিদর্শন ফি’ নামে অবৈধ অর্থ আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, অফিসে এসে তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫টি সমিতির নিবন্ধন অনুমোদন করতেন। এসব নিবন্ধনের জন্য থানা ও মহানগরভিত্তিক সমিতি থেকে ঘুষ নেওয়া হতো। পাশাপাশি সমিতিগুলোকে বেআইনিভাবে ‘মাইক্রোক্রেডিট’ বা ক্ষুদ্রঋণের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের সুযোগ এবং শাখা খোলার অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি শাখার জন্য লাখ টাকা করে ঘুষ আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১১ সালে সিরাজগঞ্জে উপনিবন্ধকের দায়িত্ব পালনকালে সিরাজগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের ৬ শতক জমি অবৈধভাবে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গোপনে জমি বিক্রির অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে নবীরুল ইসলাম ও তৎকালীন আরেক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়। তবে মামলার বিষয়টি গোপন রেখে নবীরুল ইসলাম পদোন্নতি নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকাকালে মাত্র ৭ থেকে ৮ মাসে নবীরুল ইসলাম প্রায় ১ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি সমবায় সমিতির অবৈধ নিবন্ধন দিয়ে মোট ৪৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মিরপুরের বহুমুখী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বেআইনি অ্যাডহক কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে রব ও দেলোয়ার নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে নর্দান রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ‘দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ (ব্যাংক) লিমিটেড’-এর চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন (অব.) আবু জাফরের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া এবং তাঁর অবৈধ কমিটিকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ট্রাস্ট ব্যাংকে পরিচালিত মার্কেন্টাইল ব্যাংকের হিসাব থেকে ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলনের সুযোগ করে দিতে তিনি ১০ থেকে ১২ দিন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিলম্ব করেন এবং পরে একটি নামমাত্র অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিলম্বের সুযোগে সাবেক চেয়ারম্যান আবু জাফর ব্যাংক থেকে ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলন করে এর মধ্যে ২০ লাখ টাকা নবীরুল ইসলামকে ঘুষ হিসেবে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদের তদন্ত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

 

শুধু তাই নয়, মোহাম্মদপুর পি.সি. কালচার হাউজিং সোসাইটির ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে তৎকালীন সাবেক চেয়ারম্যান কুদ্দুসের ছেলের কাছ থেকে নবীরুল ইসলাম তাঁর স্ত্রীর নামে ৩ কাঠার একটি মূল্যবান প্লট নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘যুবক’ নামের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে প্রতিটি ভুয়া সমিতির বিপরীতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে মাত্র ৩ মাসে প্রায় ১৫০টি ভুয়া সমিতির নিবন্ধন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ‘যুবক’ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৎকালীন সময়ে নবীরুল ইসলামের সঙ্গে চাকরি করা একাধিক ব্যক্তি বলেন, নবীরুল ইসলামের দুঃসাহস ও ঔদ্ধত্য এতটাই চরম পর্যায়ে ছিল যে, তিনি সচিবালয় থেকে ফিরে অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সমবায়ীদের সামনে প্রকাশ্যেই দাম্ভিকতার সঙ্গে বলতেন, ‘আর কত পারা যায়! প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা খরচ করতে হয় এবং রেজিস্টার অফিসে ১ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। আমাকে তো এই টাকা আয় করতেই হবে। তা ছাড়া নিজের চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং লাভজনক পোস্টিং নেওয়ার খরচও তো তুলতে হবে।’

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দুর্নীতির বিষয়টি তৎকালীন সচিবের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারার সম্পর্কের কারণে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অসহায় বোধ করতেন। নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে কয়েকটি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলেও তাঁর ইশারায় এবং সাবেক সচিবের নির্দেশে অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তা ও যুগ্ম নিবন্ধক মো. আবুল হোসেনকে দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদ এবং অতিরিক্ত নিবন্ধকের তদন্ত প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হলেও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি বারবার পার পেয়ে যান এবং ক্রমেই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

শুধু অর্থনৈতিক দুর্নীতিই নয়, নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন ও অমানবিক আচরণেরও অভিযোগ রয়েছে। ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে সমবায় ভবনের প্রধান গেটের বাইরে উত্তর পাশের সীমানাপ্রাচীরের কাছে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের একজন পরিচালককে নিজ হাতে ও সহযোগীদের নিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন ও মারধর করেন নবীরুল ইসলাম বলে অভিযোগ করা হয়।

এ ঘটনায় সমবায় অধিদপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত নিবন্ধক কায়সারুল আলমের (স্মারক নং-৫০/০৭ শি:/২৯২শি:, তারিখ: ১৯/১২/২০০৭) নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলাম, জেলা অডিটর নজিবুল ইসলাম, সহকারী পরিদর্শক নুরুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং গাড়িচালক হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলামকে ঢাকা জেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত, পক্ষপাতদুষ্ট, হিংস্র ও অমানবিক চরিত্রের অধিকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁকে অবিলম্বে পদ থেকে প্রত্যাহার এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল।

একই সঙ্গে যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদের তদন্ত প্রতিবেদনেও দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের অন্তর্বর্তী কমিটি গঠনে বিলম্ব ও অদক্ষতার অভিযোগে নবীরুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগী কর্মকর্তা উপসহকারী নিবন্ধক সাদেকুর রহমান সরকার, পরিদর্শক নূর মোহাম্মদ খান ও রমনা থানা সমবায় কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই সুপারিশ দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১২ সালে রাজশাহীর বিভাগীয় দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে বন্ধকী জমির ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিয়ে সরকার ও সমবায়ের বিপুল সম্পদ বেহাতের সুযোগ করে দেন নবীরুল ইসলাম বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় পরের বছর তৎকালীন বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধক বাধা দিলে তাকেও নবীরুল ইসলাম লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের ধারাবাহিকতা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানাধীন আগারগাঁওয়ে অবস্থিত সমবায় অধিদপ্তরের কার্যালয়ের রিসিপশনের সামনে ও প্রবেশগেটে হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর কোনো সাধারণ সভা বা নির্বাচন না হওয়া ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেড’ (নিবন্ধন নং-৩৪২/২০০০)-এর নবনির্বাচিত কমিটির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম সজীব তাঁর কমিটির নথিপত্র জমা দিতে সমবায় অধিদপ্তরে গেলে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামের সরাসরি উসকানি ও নেতৃত্বে তাঁর সহযোগী ফাতেমা আমিন, আজিজুল হক জাকির এবং সমবায় অধিদপ্তরের অফিস সহকারী সেলিমসহ ১৫ থেকে ২০ জন লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে সাইফুল ইসলাম সজীব ও তাঁর সহযোগীদের অবরুদ্ধ করে মারধর করেন। এতে তাঁরা গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি হামলাকারীরা বাদীর পকেট থেকে জোরপূর্বক নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এই ঘটনায় মো. সাইফুল ইসলাম সজীব বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামকে ১ নম্বর আসামি করে মামলা করেন। মামলায় ফাতেমা আমিন ও আজিজুল হক জাকিরসহ ১৪ জন নামীয় এবং ১০ থেকে ১২ জন অজ্ঞাতনামা সমবায় অধিদপ্তরের কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৮/৩৪১/৩৪২/৩৫৭/৩২৩/৩৭৯/৫০৬/১১৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন বলে জানা গেছে।

তবে এখানে মামলার তারিখ নিয়ে একটি অসঙ্গতি রয়েছে। বর্ণনায় হামলার তারিখ ১৯ আগস্ট ২০২৬ উল্লেখ করা হলেও মামলা দায়েরের তারিখ হিসেবে ২৪ আগস্ট ২০২৩ লেখা হয়েছে। প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট নথি দেখে সালটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত ১৭ বছর পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নবীরুল ইসলাম বদলি-বাণিজ্য, পদোন্নতি-বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ ও লাইসেন্স সিন্ডিকেটসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সরকারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে তিনি অতিরিক্ত নিবন্ধক পদে পদোন্নতি নিয়েছেন।

এতসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমনকি তাঁর কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

একাধিক ভুক্তভোগীর প্রশ্ন, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে, সেখানে নবীরুল ইসলামের মতো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও তিনি কীভাবে এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন?

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে চাকরি নেওয়া চিহ্নিত জালিয়াত নবীরুল ইসলামের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত।’

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন দায়িত্ব পেলেন আসিফ, সারজিস ও মিতু

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি

সমবায়ের অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুলের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট সময় ০৬:৫৯:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক মো. নবীরুল ইসলাম (অডিট ও আইন)-এর বিরুদ্ধে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জালিয়াতি, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও শারীরিক নির্যাতনসহ নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

মাগুরা জেলার লক্ষীকোল গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত মো. সহিদুল ইসলামের ছেলে নবীরুল ইসলাম ২০তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সমবায় ক্যাডারে সহকারী নিবন্ধক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নিয়োগের ভিত্তিই ছিল জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি। তিনি তাঁর বাবার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অবৈধভাবে সরকারি চাকরি নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০তম বিসিএস পরীক্ষার আগে তিনি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (বিপিএসসি) জুনিয়র গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় বিপিএসসির তৎকালীন সদস্য মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগ রয়েছে, নবীরুল ইসলাম বিপিএসসির তৎকালীন সদস্য মাহফুজুর রহমানকে বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং তাঁর পিতার মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাই-বাছাইয়ের সময় সঠিক হিসেবে পার করিয়ে নেন। এ ঘটনায় ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা নম্বর-২৪ দায়ের করা হয়। মামলাটি তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো তদন্ত করছিল।

এই অভিযোগের পর তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। ২০০১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ব্যুরোর ইন্সপেক্টর এস এম আকতার হামিদ ভূঁঞা মাদারীপুরের তৎকালীন জেলা সমবায় কর্মকর্তা নবীরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্য প্রদানের জন্য ২০০২ সালের ৫ জানুয়ারি ব্যুরোর প্রধান কার্যালয়ে তলব করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা এস এম আকতার হামিদ ভূঁঞা মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে নবীরুল ইসলামের পক্ষে মিথ্যা ও সাজানো প্রতিবেদন দেন।

 

এ ছাড়া বিপিএসসিতে কর্মরত থাকাকালে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের পাস করানোর নামে ৩ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও ছিল নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগের তদন্তে ২০০২ সালের ২ জুলাই দুর্নীতি দমন ব্যুরোর তৎকালীন উপপরিচালক শামছুল নাহার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেন।

কাফরুল থানার মামলাটি যখন ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে (বিশেষ মামলা নং-৬৯/২) বিচারাধীন ছিল, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলামের প্রভাবে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক শফিউর রহমান স্বাক্ষরিত একটি গোপন চিঠির মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলাটি প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তৎকালীন বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রেজাউল করিম খান (চুন্নু) বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নবীরুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে ক্ষমতার প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নবীরুল ইসলাম একের পর এক লাভজনক পদে পদায়ন পান বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পাওয়ার জন্য সমবায় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মতিউর রহমানকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অথচ ওই পদে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে সাইফুল ইসলামকে পদায়নের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক।

ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নবীরুল ইসলাম ঘুষ ও দুর্নীতির একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রতিদিন সকালে মিরপুরের বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে মিরপুর বা আশপাশের এলাকার এক বা একাধিক সমবায় সমিতি পরিদর্শনে যেতেন। তাঁর অধীনস্থ টেকনিক্যাল কো-অপারেশন অফিসার (টিসিও), সহকারী পরিদর্শক বা পরিদর্শকদের মাধ্যমে প্রতিটি সমিতি থেকে ‘পরিদর্শন ফি’ নামে অবৈধ অর্থ আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, অফিসে এসে তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫টি সমিতির নিবন্ধন অনুমোদন করতেন। এসব নিবন্ধনের জন্য থানা ও মহানগরভিত্তিক সমিতি থেকে ঘুষ নেওয়া হতো। পাশাপাশি সমিতিগুলোকে বেআইনিভাবে ‘মাইক্রোক্রেডিট’ বা ক্ষুদ্রঋণের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের সুযোগ এবং শাখা খোলার অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি শাখার জন্য লাখ টাকা করে ঘুষ আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১১ সালে সিরাজগঞ্জে উপনিবন্ধকের দায়িত্ব পালনকালে সিরাজগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের ৬ শতক জমি অবৈধভাবে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গোপনে জমি বিক্রির অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে নবীরুল ইসলাম ও তৎকালীন আরেক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়। তবে মামলার বিষয়টি গোপন রেখে নবীরুল ইসলাম পদোন্নতি নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকাকালে মাত্র ৭ থেকে ৮ মাসে নবীরুল ইসলাম প্রায় ১ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি সমবায় সমিতির অবৈধ নিবন্ধন দিয়ে মোট ৪৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মিরপুরের বহুমুখী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বেআইনি অ্যাডহক কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে রব ও দেলোয়ার নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে নর্দান রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ‘দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ (ব্যাংক) লিমিটেড’-এর চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন (অব.) আবু জাফরের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া এবং তাঁর অবৈধ কমিটিকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ট্রাস্ট ব্যাংকে পরিচালিত মার্কেন্টাইল ব্যাংকের হিসাব থেকে ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলনের সুযোগ করে দিতে তিনি ১০ থেকে ১২ দিন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিলম্ব করেন এবং পরে একটি নামমাত্র অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিলম্বের সুযোগে সাবেক চেয়ারম্যান আবু জাফর ব্যাংক থেকে ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলন করে এর মধ্যে ২০ লাখ টাকা নবীরুল ইসলামকে ঘুষ হিসেবে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদের তদন্ত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

 

শুধু তাই নয়, মোহাম্মদপুর পি.সি. কালচার হাউজিং সোসাইটির ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে তৎকালীন সাবেক চেয়ারম্যান কুদ্দুসের ছেলের কাছ থেকে নবীরুল ইসলাম তাঁর স্ত্রীর নামে ৩ কাঠার একটি মূল্যবান প্লট নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘যুবক’ নামের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে প্রতিটি ভুয়া সমিতির বিপরীতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে মাত্র ৩ মাসে প্রায় ১৫০টি ভুয়া সমিতির নিবন্ধন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ‘যুবক’ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৎকালীন সময়ে নবীরুল ইসলামের সঙ্গে চাকরি করা একাধিক ব্যক্তি বলেন, নবীরুল ইসলামের দুঃসাহস ও ঔদ্ধত্য এতটাই চরম পর্যায়ে ছিল যে, তিনি সচিবালয় থেকে ফিরে অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সমবায়ীদের সামনে প্রকাশ্যেই দাম্ভিকতার সঙ্গে বলতেন, ‘আর কত পারা যায়! প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা খরচ করতে হয় এবং রেজিস্টার অফিসে ১ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। আমাকে তো এই টাকা আয় করতেই হবে। তা ছাড়া নিজের চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং লাভজনক পোস্টিং নেওয়ার খরচও তো তুলতে হবে।’

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দুর্নীতির বিষয়টি তৎকালীন সচিবের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারার সম্পর্কের কারণে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অসহায় বোধ করতেন। নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে কয়েকটি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলেও তাঁর ইশারায় এবং সাবেক সচিবের নির্দেশে অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তা ও যুগ্ম নিবন্ধক মো. আবুল হোসেনকে দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদ এবং অতিরিক্ত নিবন্ধকের তদন্ত প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হলেও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি বারবার পার পেয়ে যান এবং ক্রমেই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

শুধু অর্থনৈতিক দুর্নীতিই নয়, নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন ও অমানবিক আচরণেরও অভিযোগ রয়েছে। ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে সমবায় ভবনের প্রধান গেটের বাইরে উত্তর পাশের সীমানাপ্রাচীরের কাছে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের একজন পরিচালককে নিজ হাতে ও সহযোগীদের নিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন ও মারধর করেন নবীরুল ইসলাম বলে অভিযোগ করা হয়।

এ ঘটনায় সমবায় অধিদপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত নিবন্ধক কায়সারুল আলমের (স্মারক নং-৫০/০৭ শি:/২৯২শি:, তারিখ: ১৯/১২/২০০৭) নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলাম, জেলা অডিটর নজিবুল ইসলাম, সহকারী পরিদর্শক নুরুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং গাড়িচালক হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলামকে ঢাকা জেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত, পক্ষপাতদুষ্ট, হিংস্র ও অমানবিক চরিত্রের অধিকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁকে অবিলম্বে পদ থেকে প্রত্যাহার এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল।

একই সঙ্গে যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদের তদন্ত প্রতিবেদনেও দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের অন্তর্বর্তী কমিটি গঠনে বিলম্ব ও অদক্ষতার অভিযোগে নবীরুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগী কর্মকর্তা উপসহকারী নিবন্ধক সাদেকুর রহমান সরকার, পরিদর্শক নূর মোহাম্মদ খান ও রমনা থানা সমবায় কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই সুপারিশ দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১২ সালে রাজশাহীর বিভাগীয় দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে বন্ধকী জমির ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিয়ে সরকার ও সমবায়ের বিপুল সম্পদ বেহাতের সুযোগ করে দেন নবীরুল ইসলাম বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় পরের বছর তৎকালীন বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধক বাধা দিলে তাকেও নবীরুল ইসলাম লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের ধারাবাহিকতা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানাধীন আগারগাঁওয়ে অবস্থিত সমবায় অধিদপ্তরের কার্যালয়ের রিসিপশনের সামনে ও প্রবেশগেটে হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর কোনো সাধারণ সভা বা নির্বাচন না হওয়া ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেড’ (নিবন্ধন নং-৩৪২/২০০০)-এর নবনির্বাচিত কমিটির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম সজীব তাঁর কমিটির নথিপত্র জমা দিতে সমবায় অধিদপ্তরে গেলে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামের সরাসরি উসকানি ও নেতৃত্বে তাঁর সহযোগী ফাতেমা আমিন, আজিজুল হক জাকির এবং সমবায় অধিদপ্তরের অফিস সহকারী সেলিমসহ ১৫ থেকে ২০ জন লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে সাইফুল ইসলাম সজীব ও তাঁর সহযোগীদের অবরুদ্ধ করে মারধর করেন। এতে তাঁরা গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি হামলাকারীরা বাদীর পকেট থেকে জোরপূর্বক নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এই ঘটনায় মো. সাইফুল ইসলাম সজীব বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামকে ১ নম্বর আসামি করে মামলা করেন। মামলায় ফাতেমা আমিন ও আজিজুল হক জাকিরসহ ১৪ জন নামীয় এবং ১০ থেকে ১২ জন অজ্ঞাতনামা সমবায় অধিদপ্তরের কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৮/৩৪১/৩৪২/৩৫৭/৩২৩/৩৭৯/৫০৬/১১৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন বলে জানা গেছে।

তবে এখানে মামলার তারিখ নিয়ে একটি অসঙ্গতি রয়েছে। বর্ণনায় হামলার তারিখ ১৯ আগস্ট ২০২৬ উল্লেখ করা হলেও মামলা দায়েরের তারিখ হিসেবে ২৪ আগস্ট ২০২৩ লেখা হয়েছে। প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট নথি দেখে সালটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত ১৭ বছর পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নবীরুল ইসলাম বদলি-বাণিজ্য, পদোন্নতি-বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ ও লাইসেন্স সিন্ডিকেটসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সরকারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে তিনি অতিরিক্ত নিবন্ধক পদে পদোন্নতি নিয়েছেন।

এতসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমনকি তাঁর কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

একাধিক ভুক্তভোগীর প্রশ্ন, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে, সেখানে নবীরুল ইসলামের মতো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও তিনি কীভাবে এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন?

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে চাকরি নেওয়া চিহ্নিত জালিয়াত নবীরুল ইসলামের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত।’