বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জিটিসিএল-এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তাঁর নিয়োগকে কেন্দ্র করে তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখা দেয়। ওই পরিস্থিতির মধ্যে পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সেনা প্রহরায় শাহনেওয়াজ পারভেজ দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর শাহনেওয়াজ পারভেজ রুটিনমাফিক বিএনপিমনা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি, বদলি ও পদোন্নতি আটকে রাখার মতো কর্মকাণ্ড শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঠুনকো অভিযোগে কর্মকর্তাদের ওএসডি করা, এমনকি চাকরিচ্যুত করার উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় স্বার্থ রক্ষায়ও তাঁর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। একই সঙ্গে শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য এবং অবৈধ নিয়োগের নথিভিত্তিক অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়, কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে পেট্রোবাংলায় প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ পান শাহনেওয়াজ পারভেজ। বিদেশি তিন বছরের বিটেক ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে যোগ দিলেও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো ইকুইভ্যালেন্সি সার্টিফিকেট জমা দেননি তিনি, যা পেট্রোবাংলার চাকরিবিধিরও পরিপন্থী বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৩ বছর নিয়মবহির্ভূতভাবে একই বিভাগে, অর্থাৎ কন্ট্রাক্ট বিভাগে কর্মরত থেকে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় প্রায় ১৫০টি নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি করে অনিয়ম ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১ হাজার ৫০০টি অবৈধ সংযোগ থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায় করা হতো বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিন সদস্যের ওই কমিটির সদস্যরা হলেন—জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. আব্দুল মান্নান, সিনিয়র সহকারী সচিব (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-৩ শাখা) সাব্বির আহমেদ এবং পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) এস এম মাহবুব আলম।
গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক রেকর্ডপত্র, নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, লিখিত জবাব এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরেজমিনে নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে শাহনেওয়াজ পারভেজকে সহকারী প্রকৌশলী (পেট্রোলিয়াম) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ভারতে নয় বছর অবস্থান করে তিন বছরের বিটেক ডিগ্রি অর্জন এবং ইক্যুভ্যালেন্ট সার্টিফিকেট ছাড়া চাকরিতে যোগদানের বিষয়টিরও সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্যও রয়েছে। তাঁর দাবি, পেট্রোবাংলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তিনি ১৮ মার্চ ১৯৯৮ তারিখে জিপিও বক্স নম্বর ৮৪৯, ঢাকা-১০০০ বরাবর আবেদন করেন। পেট্রোবাংলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, প্রাপ্ত দরখাস্ত বাছাইয়ের পর বিবেচনাযোগ্য প্রার্থীদের লিখিত/মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
শাহনেওয়াজ পারভেজের দাবি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী তাঁসহ অন্যান্য প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য পেট্রোবাংলা থেকে চিঠি দেওয়া হয়। ওই নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় অনেক প্রার্থী অংশ নেন। বর্তমানে পেট্রোবাংলায় কর্মরত দুইজন মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার কর্মকর্তাও একই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অধীনে সরাসরি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ সাহা, মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা, কৌশল ও রিসোর্সেস মবিলাইজেশন) এবং ফারহানা শাওন, মহাব্যবস্থাপক।
অর্থাৎ শাহনেওয়াজ পারভেজের নিজের বক্তব্য অনুযায়ীও তিনি লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে সহকারী প্রকৌশলী (পেট্রোলিয়াম) পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ‘লিখিত/মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগ’-এর বিষয় উল্লেখ ছিল। তবে নথিতে কী কারণে শুধু মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছিল, তা উল্লেখ নেই।
শাহনেওয়াজ পারভেজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি যে বিটেক ডিগ্রি অর্জন করেছেন তা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির সমতুল্য নয় এবং নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় সমতা বা অ্যাক্রিডিটেশন সার্টিফিকেটও ছিল না।
এ বিষয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্য, তিনি ব্যাচেলর অব টেকনোলজি বা বি.টেক ইন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী, যা চার বছর মেয়াদি এবং বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির সমতুল্য।
তবে তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ভারতের ইন্ডিয়ান স্কুল অব মাইনস, ধানবাদ, ইন্ডিয়ার বিটেক সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং নিয়োগের সময় ওই সার্টিফিকেটের সমতা বা অ্যাক্রিডিটেশন করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালে পেট্রোবাংলা অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনে শাহনেওয়াজ পারভেজ বিনা ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে ফুল দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের ব্যাখ্যা, তিনি পেট্রোবাংলা অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নেন। সভাপতি পদে আর কোনো প্রার্থী না থাকায় পেট্রোবাংলার নির্বাচন কমিশন তাঁর নাম সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করে। আর সরকার যখন যেভাবে কোনো কাজের নির্দেশনা প্রদান করে, সরকারের তথা প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে সেভাবেই তা প্রতিপালন করতে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন বিভিন্ন বড় কোম্পানিতে অবৈধ বাইপাস লাইন দিয়ে মাসে মাসে টাকা আদায়ের জন্য একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনকে একই সঙ্গে ডিএমডি-গাজীপুর, ডিএমডি-ময়মনসিংহ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এবং মহাব্যবস্থাপক-গাজীপুর (অতিরিক্ত দায়িত্ব)—তিতাসের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তা কীভাবে একসঙ্গে অতিরিক্ত দুটি দায়িত্ব পালন করতে পারেন?
এছাড়া গ্যাস রেশনিং করে কোটি কোটি টাকা আয়ের অভিযোগও উঠেছে শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে একদিকে কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া এবং অন্যদিকে অন্য প্রতিষ্ঠানের গ্যাসের চাপ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। একইভাবে বিভিন্ন কোম্পানির বকেয়া গ্যাস বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্যাস বিপণন নীতিমালা উপেক্ষা করে টাকার বিনিময়ে কিস্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে ফ্যাক্টরি পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাঁকে ‘কিস্তি পারভেজ’ নামে ডাকেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, গ্যাস বিপণন নীতিমালা ২০১৪-এর ধারা ৮.৫.২ অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন করা গ্রাহকের বকেয়া বিল কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। কোনো গ্রাহকের বকেয়া জমে গেলে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে বকেয়া আদায়ের স্বার্থে এবং বন্ধকালীন শ্রমিক অসন্তোষ পরিহারের বিষয়টি বিবেচনা করে সারচার্জসহ মাঝে মাঝে কেস-টু-কেস ভিত্তিতে কিস্তি প্রদান করা হয়।
শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী পেট্রোবাংলা ও কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে মো. আনোয়ার হোসেন একটি লিখিত অভিযোগে মোট ১৬টি অভিযোগ করেন বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—চাকরিতে কোনো ধরনের লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগদান, ভারতে নয় বছর অবস্থান করে তিন বছরের বিটেক ডিগ্রি অর্জন এবং ইক্যুভ্যালেন্ট সার্টিফিকেট ছাড়া চাকরিতে যোগদান, ২৩ বছর পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে কর্মরত থাকা, গ্যাস সঞ্চালন ও বিপণনের অভিজ্ঞতা না থাকা, সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে জিটিসিএল ও তিতাস গ্যাসের এমডি পদে পদায়িত হওয়া, সেট বাংলা নামে একটি কোম্পানিকে শত কোটি টাকার অবৈধভাবে কাজ প্রদান, শত কোটি টাকার অবৈধ শিল্প সংযোগ প্রদান, বিনা ভোটে পেট্রোবাংলা অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়া, দুই কর্মকর্তাকে বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে হয়রানি করা, পিএসসি বিডিং রাউন্ডের মডেল তৈরিতে অনিয়ম, এসএস-৪ ও এসএস-৯ ব্লক ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসিকে এককভাবে প্রদান এবং কোরিয়ান কোম্পানি দাইয়ুকে এককভাবে কাজ প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগ।
দ্বিতীয় পর্যায়ে গত ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে পেট্রোবাংলা ও ১৩টি কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে মো. নূর হোসেন নামে একজন সচিব জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। ওই অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে পূর্বের অভিযোগের সঙ্গে আরও কিছু অভিযোগ সংযোজন করা হয় বলে জানা গেছে।
নতুন অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—এলডি প্রদানের মাধ্যমে ৩৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ ফেরত, হুন্দাই কোম্পানিকে ১৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ, সিস্টেম লসের নামে হাজার কোটি টাকার গ্যাস চুরি, গ্যাস রেশনিং করে কোটি কোটি টাকা আয়, একই ব্যক্তিকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, বকেয়া গ্যাস বিল কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা এবং সার্ভিস লাইন বন্ধ করে টাকা আদায়ের অভিযোগ।
এদিকে দেশে চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যেও তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রান্নার চুলার দুর্ভোগ থেকে শুরু করে ভারী শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম—দেশজুড়ে গ্যাস সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে ২ হাজার ১১৪ থেকে ২ হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।
এই ঘাটতির ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ২০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ ও সার সংকটও সৃষ্টি হয়েছে। আকস্মিক এই গ্যাস সংকটের পেছনে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, এলএনজি আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির কথা বলা হলেও তিতাস গ্যাসের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়মকেও সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ উঠেছে।
তিতাস সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তিতাসের আওতাভুক্ত এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি বা ২ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ মিলছে ১৫০ কোটি বা ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুটেরও কম। বিতরণ নেটওয়ার্কের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস পাচ্ছেন না। চাপের চরম ঘাটতির পাশাপাশি পাইপলাইনের ছিদ্র ও ফাটল দিয়ে পানি ঢোকার কারণেও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
শিল্প ও আবাসিক খাতে এই সংকটের মধ্যে তিতাস গ্যাসের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য এবং অবৈধ নিয়োগের নথিভিত্তিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শাহনেওয়াজ পারভেজ চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জিটিসিএল-এর এমডি পদ থেকে তিতাস গ্যাসের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপক বাধা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় প্রায় ১৫০টি নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি করে অনিয়ম ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি অবৈধ সংযোগ থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায় করা হতো বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে।
শুধু তিতাস নয়, এর আগে পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সাগরে অফশোর বিডিং রাউন্ডের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতি ভেঙে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নিরুৎসাহিত করা এবং ভারতের একটি কোম্পানিকে একক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সাবেক চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার, সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে পদোন্নতি গ্রহণ এবং সহকর্মীদের হয়রানির অভিযোগও সামনে এসেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে একাধিক তদন্ত পরিচালিত হলেও রহস্যজনক কারণে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ বা দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এবং তিতাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে নানা অভিযোগ দিয়েছে এবং সেসব অভিযোগের তদন্তও হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা তাঁর জানা নেই বলে জানান তিনি।
অভিযোগকারীদের দাবি, গ্যাস সংকট, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং তিতাসের অভ্যন্তরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়গুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহক এবং বৈষম্যবিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তদন্ত করে তিতাসের এমডির অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানানো হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























