বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ডিপো ব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পদে পদায়ন, সাম্প্রতিক বদলি এবং চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা চলছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে জোয়ারসাহারা বাস ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে কামরুজ্জামান প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সুসম্পর্কের মাধ্যমে তিনি উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতেন।
সম্প্রতি কামরুজ্জামানকে খুলনা বাস ডিপোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পদায়নকে কেন্দ্র করে বিআরটিসির অভ্যন্তরে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ ডিপো ও ইউনিটে পদায়নের ক্ষেত্রে সব সময় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগ রয়েছে, কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে কামরুজ্জামান একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন-এসব পদায়নের ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনিক বিবেচনাই কাজ করেছে, নাকি রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো প্রভাবও ছিল, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো অনুসন্ধান বা তদন্তের ক্ষেত্রে কামরুজ্জামানের ব্যক্তিগত তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রের বিস্তারিত প্রকাশ না করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও রক্ষা করা জরুরি।
কামরুজ্জামানের বাড়ি কুমিল্লায় হওয়ায় অতীতে তিনি সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য শেখ সেলিমের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি বিআরটিসির বড় বড় ডিপোতে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন।
এ ছাড়া সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং জামালপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের সঙ্গে কামরুজ্জামানের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ওই ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে বিআরটিসির সাবেক চেয়ারম্যানকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে পছন্দের পদায়ন আদায় করতেন। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত বা প্রামাণ্য সরকারি নথি প্রকাশ্যে আসেনি।
বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, কামরুজ্জামানকে খুলনা বাস ডিপোর দায়িত্ব দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। তাদের দাবি, এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত করা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং পদায়ন নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
তবে কামরুজ্জামানকে ঘিরে বিতর্কের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে কেন্দ্র করে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। রাষ্ট্রায়ত্ত বিআরটিসি সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা একটি অভিযোগ এবং বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নথির বরাত দিয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে বিভিন্ন খাতে ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি অপচয়, ক্ষতি ও চুরির অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া বিল, জ্বালানি ও ফেরি ব্যয়ের গরমিল, অগ্রিম ভাতা, টিএ/ডিএ, মাইলেজ এবং হিসাব-সংক্রান্ত অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থের ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব আদায়, জ্বালানি, বায়ু, জমা-রাজস্বসহ বিভিন্ন খাতে এবং নির্ধারিত ব্যয় নির্বাহের নামে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযোগকারী বিআরটিসির কেন্দ্রীয় স্টোর অফিসার মো. মোস্তাকিজুর রহমানের দাবি, জ্বালানি, গ্যারেজ, টুলস ও ফেরিসহ বিভিন্ন খাতে এবং প্রথম মাইলেজ ভাতা, দৈনিক ভাতা ও বিবিধ ব্যয়ের নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলনের ঘটনায় প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অপচয়, ক্ষতি ও চুরি হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সময়ের তদন্ত প্রতিবেদন ও নথিপত্রে ৪৩০ পাতারও বেশি তথ্য সংযুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগটি কেবল মৌখিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ নথিও জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব নথির সত্যতা, হিসাবের গরমিলের প্রকৃতি এবং প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
এই অভিযোগে চিহ্নিত ব্যক্তিদের মধ্যে মো. কামরুজ্জামানের নামও এসেছে। প্রকাশিত অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদনে তার চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে দায়িত্ব পালনের সময় নিয়ে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সেখানে সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর ডিপো ইনচার্জ হিসেবে ছিলেন। ফলে তার পদবি ও দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট সময়কাল বিআরটিসির বদলি আদেশ, দায়িত্ব হস্তান্তর নথি ও অফিসিয়াল রেকর্ড থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিআরটিসির সরকারি ওয়েবসাইটের একটি নাগরিক সেবা-সংক্রান্ত পাতায় চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর জন্য মো. কামরুজ্জামানকে ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ডিপোটির সরকারি যোগাযোগের তথ্যও দেওয়া রয়েছে।
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে জ্বালানি তেল, ফেরি বিল, গ্যারেজ শ্রমিকের মজুরি, মাইলেজ বিল, দৈনিক ভাতা এবং টিএ/ডিএর নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে ডিপোর রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পণ্যবাহী ট্রাক কাগজে ‘খালি’ দেখানোর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে অনিয়ম করা হয়েছে। সেখানে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর সাবেক ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামানকে ঘিরে অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের প্রকৃত দায় ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন।
এদিকে, বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে আগের সরকারের সময়ের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং তারা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত—এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিআরটিসির সরকারি ওয়েবসাইটেও আব্দুল লতিফ মোল্লাকে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিআরটিএ ও বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রভাব শুধু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে সরকারি সম্পদ, যাত্রীসেবা এবং জনআস্থার প্রশ্নও জড়িত। বিশেষ করে বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ডিপোর দায়িত্ব বণ্টন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়।
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো নিয়ে দুদকে অভিযোগ, ৪৩০ পাতার বেশি নথির দাবি, ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ এবং কামরুজ্জামানকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন কেবল একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে ব্যক্তিগত বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে পদায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পাওয়ার অভিযোগেরও প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান দরকার।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















