এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) ও এলসির মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে ভুয়া রপ্তানি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের ফোকাস অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ৮০ শতাংশ কাপড় সরাসরি রাজধানীর ইসলামপুরে বিক্রি করা হয়েছে। শুল্ককর ফাঁকি দিতে এসব কাপড়ের বিপরীতে কাগজে-কলমে ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুয়া রপ্তানি বৈধ দেখাতে এক দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে অন্য দেশে রপ্তানি দেখানো, এক দেশের বায়ারের বিপরীতে অন্য দেশের নটিফাই পার্টি দেখিয়ে সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি এবং ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে টিটি এনে রপ্তানি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে খোলাবাজারে কাপড় বিক্রি করে ভুয়া সাব-কন্ট্রাক্ট তৈরিরও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অসাধু কিছু বন্ড কর্মকর্তার সহায়তায় এসব রপ্তানির অডিটও সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৭৯০ টন পলিস্টার ফেব্রিক্স বা বোরকার কাপড় আমদানি করে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটির অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বলে জানা গেছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পাঁচ বছরে ৫ হাজার ৮৪৪ টন কাপড় আমদানি
ফোকাস অ্যাপারেলসের আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৪ কেজি বা ৫ হাজার ৮৪৪ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। এসব পণ্যের আমদানি মূল্য ২৭৭ কোটি ৯৭ লাখ ৩ হাজার ৭১ টাকা। এর বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্ককর ১৯১ কোটি ৫৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫৮ টাকা।
২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে বেশি ২২৭টি চালানে ১ হাজার ১০১ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। এসব কাপড়ের বেশিরভাগই পলিস্টার ফেব্রিক্স বা বোরকার কাপড় হিসেবে পরিচিত। কখনো পলিস্টার প্রিন্টেড ফেব্রিক্স, পলিস্টার ও স্যানডেক্সসহ বিভিন্ন নামে একই ধরনের কাপড় বন্ড সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ২৩০টি চালানে ১ হাজার ৪৬৫ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। এর মধ্যে মে মাসে ৩ লাখ ৭ হাজার ১৬৩ কেজি, আগস্টে ২ লাখ ৯০ হাজার ৪৫৫ কেজি এবং এপ্রিলে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯৪ কেজি কাপড় আমদানি করা হয়েছে। এছাড়া জানুয়ারিতে ১ হাজার ৯৩৬ কেজি, ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫০৩ কেজি, জুনে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৬ কেজি, জুলাইয়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩২ কেজি এবং সেপ্টেম্বরে ৪২ হাজার ৭৮৮ কেজি কাপড় আমদানি করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে ১৪৬টি চালানে ১ হাজার ৮৬ মেট্রিক টন, ২০২৩ সালে ৯০টি চালানে ১ হাজার ১৩৯ মেট্রিক টন, ২০২২ সালে ২৪টি চালানে ২৬৪ মেট্রিক টন এবং ২০২১ সালে ২৯টি চালানে ৩৫৭ মেট্রিক টন কাপড় বন্ড সুবিধায় আমদানি করা হয়।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ২০২২ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে ২৯টি চালানে ৩ লাখ ৫৮ হাজার কেজি কাপড় আমদানি হলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০টি চালানে ১১ লাখ ৪০ হাজার কেজিতে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে চালান সংখ্যা আরও বেড়ে যথাক্রমে ১৪৬ ও ২২৭টিতে দাঁড়ায়।
২০২৫ সালে আমদানি করা কাপড়ের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ছিল প্রায় ৬১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০২১ সালে এই মূল্য ছিল ১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই আমদানি আরও বেড়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৩০টি চালানে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার কেজি কাপড় আমদানি করা হয়েছে, যা ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের যেকোনো একক বছরের আমদানির চেয়ে বেশি।
৫২ লাখ কেজি রপ্তানি দেখানো, আমদানি এক দেশ থেকে, রপ্তানি অন্য দেশে
রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণেও অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা কাপড় দিয়ে ৫২ লাখ ১৩ হাজার ৯৫০ কেজি বা ৫ হাজার ২১৩ মেট্রিক টন পোশাক তৈরি করে রপ্তানি দেখানো হয়েছে। তবে এসব রপ্তানি প্রকৃতপক্ষে হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এফওসিতে কাপড় এসেছে চীন থেকে। বিপরীতে রপ্তানি দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, আমদানি করা কাপড়ের বেশিরভাগই পলিস্টার ফেব্রিক্স বা বোরকার কাপড় হলেও রপ্তানি নথিতে ছেলেদের প্যান্ট, মেয়েদের লং ড্রেস, বয়েজ জিপার, টি-শার্ট, বক্সার, মেয়েদের ড্রেস ও জ্যাকেটের মতো বিভিন্ন পণ্যের উল্লেখ রয়েছে।
ভুয়া রপ্তানি কীভাবে দেখানো হয়েছে এবং এসব কাগজপত্রের ভিত্তিতে কীভাবে অডিট সম্পন্ন করা হয়েছে, তা নিয়ে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট কাজ করছে বলে জানা গেছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি স্টক লটের কাগজ ব্যবহার করে ভুয়া রপ্তানি দেখিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় অফ-ডকের কিছু কর্মকর্তা ও কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া এক দেশের বায়ারের বিপরীতে অন্য দেশের নটিফাই পার্টি দেখিয়ে সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি এবং ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে টিটি এনে রপ্তানি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
ভুয়া রপ্তানি ঠেকাতে কাস্টম হাউসগুলোকে চিঠি
বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফোকাস অ্যাপারেলসের ভুয়া রপ্তানি ঠেকাতে দেশের সব কাস্টম হাউসের কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি চালান শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করার পাশাপাশি আমদানি করা কাপড় ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করে রপ্তানি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিঠি দেওয়ার পর থেকে ফোকাস অ্যাপারেলসের রপ্তানি বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি আগের মতো ভুয়া রপ্তানি দেখাতে পারছে না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে ভুয়া রপ্তানি দেখানো হলেও কিছু বন্ড কর্মকর্তা যথাযথ যাচাই না করে অর্থের বিনিময়ে অডিট সম্পন্ন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাব-কন্ট্রাক্ট জালিয়াতির অভিযোগ, ১৯ টন কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগে চলতি বছরের ১৪ জুলাই ফোকাস অ্যাপারেলস ১৯ হাজার ৫০ কেজি কাপড়ের একটি চালান আমদানি করে। বন্ড কমিশনারেট তথ্য পায়, প্রতিষ্ঠানটি এসব কাপড় সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে।
এর পর ২১ জুলাই বন্ড কমিশনারেটের একটি দল প্রতিষ্ঠানের বন্ড গুদামে অভিযান চালায়। অভিযানে দেখা যায়, আল ইয়াসরা টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে একটি সাব-কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে এফওসি সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ১৯ টন কাপড় কারখানা থেকে সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব কাপড়ের প্রযোজ্য শুল্ককর ছিল ৬৯ লাখ ২৪ হাজার ৮৪৭ টাকা। বন্ডের কাপড় অবৈধভাবে অপসারণ ও শুল্ককর ফাঁকির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে, ১৫ জুলাই আমদানি করা ২০ হাজার ৯৮২ কেজি কাপড়ের একটি চালান কার্টিং তদারকির আওতায় থাকায় এখনো শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির পোশাক তৈরির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় বন্ড কর্তৃপক্ষের তৎপরতা বাড়ানোর পর এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া ১৫ এপ্রিল আমদানি করা একটি চালানে ১৬ হাজার ১২১ কেজি কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে ৭০ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৭ টাকা শুল্ককর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খোলাবাজারে বিক্রির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৭০ লাখ ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
একই পরিবারের সদস্যদের নামে আরও একটি বন্ড লাইসেন্স
চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের মার্চে ফোকাস অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেডকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রেজাউল করিম এবং চেয়ারম্যান শিরিন সুলতানা আক্তার। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মো. ইমাম হোসেন ও মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
এই লাইসেন্স দেন তৎকালীন কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। তবে লাইসেন্সের কাগজে উল্লেখ থাকা শর্তগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবে নেই বলে একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তাওয়াক্কুল অ্যাপারেলকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। ওই লাইসেন্সে ম্যানেজিং পার্টনার করা হয়েছে রেজাউল করিমের স্ত্রী ফাহমিদা সুলতানাকে। আবিদা সুলতানাকেও পার্টনার করা হয়েছে। এই লাইসেন্স দেন কমিশনার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান।
দুটি লাইসেন্সেই মো. রেজাউল করিমের মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কর্মকর্তাদের দাবি, এই লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার রেজাউল করিমের
এফওসিতে আমদানি করা কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি এবং ভুয়া রপ্তানি দেখানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফোকাস অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রেজাউল করিম।
তিনি বলেন, তাদের ইম্পোর্ট ও এক্সপোর্টে কোনো অসামঞ্জস্য নেই। বর্তমানে তাদের কোনো এফওসি নেই এবং এফওসির মালও খালাস করা হয়নি। আগে যত এফওসি ছিল, সবগুলোই এক্সপোর্ট হয়েছে এবং সব অডিট সম্পন্ন করা হয়েছে।
২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের প্রথম পর্যন্ত এফওসিতে আমদানি করা পলিস্টার ফেব্রিক্স ইসলামপুরে বিক্রি করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কখনো বিক্রি করেননি।
ভুয়া রপ্তানির অভিযোগও অস্বীকার করে রেজাউল করিম বলেন, তাদের সব ডকুমেন্ট ঠিক আছে এবং বন্ড কর্তৃপক্ষ অডিট করেছে।
সাব-কন্ট্রাক্ট জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো কাগজ জাল করা হয়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















