নিজস্ব প্রতিবেদক
গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রভাব, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কথিত পার্সেন্টেজ বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের একের পর এক অভিযোগ উঠছে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসেরকে ঘিরে। বর্তমানে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারকারী প্রকৌশলীদের মধ্যে আবু নাসের অন্যতম।
অভিযোগ রয়েছে, ইতোপূর্বে বদরুল আলম নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হলে ঢাকা সার্কেল-১-এর অতিরিক্ত দায়িত্বও বাগিয়ে নেন আবু নাসের। দুটি সার্কেলের দায়িত্বে থেকেও পোস্টিং, পদোন্নতি, নিয়োগ ও লটারিসহ অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাঁদের দাবি, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পার্সেন্টেজ বাণিজ্য, ঘুষ ও দুর্নীতিকে তিনি এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যা এখন গণপূর্তের অভ্যন্তরে আলোচনার বিষয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত গণপূর্ত সম্পদ ডিভিশনের দায়িত্বে থাকার সময় আগারগাঁওয়ের পিএসসি ভবনসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ বরাদ্দ এনে কথিত ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে পিপিআর লঙ্ঘন করে এপিপির অধিকাংশ কাজ এলটিএমের পরিবর্তে সাজানো ওটিএম পদ্ধতিতে পছন্দের ঠিকাদারদের পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব কাজের বিপরীতে বরাদ্দের ১০ শতাংশ পর্যন্ত উৎকোচ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের মাধ্যমেও প্রভাববলয় তৈরি করেন আবু নাসের। নিজ উদ্যোগে এলেনবাড়ি পূর্ত অফিস কম্পাউন্ডে বঙ্গবন্ধু কর্নার এবং পিএসসি অফিস চত্বরে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি বা মূর্তি নির্মাণের মাধ্যমে সরকারের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। কথিত এসব উন্নয়নকাজের নামে বরাদ্দের অর্থ ইচ্ছেমতো ব্যয় দেখিয়ে বড় অংশ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এরপর পদোন্নতি নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে বগুড়ায় পোস্টিং পান আবু নাসের। সেখানে এপিপির কাজ এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমতি দিয়ে প্রায় কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। সে সময় একজন নারী কর্মকর্তা বগুড়া ডিভিশনের দায়িত্বে থাকায় ডিভিশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিল প্রদানসহ সামগ্রিক কার্যক্রমে আবু নাসের প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বগুড়া সার্কেল অফিসে অল্প সময় অফিস করলেও কথিত মিটিং-ফিটিংয়ের নামে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. ফারজানা আখতারকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার। এমনকি ঢাকা থেকে ঠিকাদার ডেকে এনে তাঁদের নামে আবু নাসের নিজেই ব্যবসা করতেন বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ড. ফারজানা ও ড. আবু নাসেরকে ঘিরে সে সময়ে বগুড়া গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনাও ছড়িয়ে পড়ে বলে জানা গেছে।
জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে আবু নাসের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর দায়িত্বে আসেন। অন্যদিকে ড. ফারজানাকে জয়পুরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পিপিআরবহির্ভূতভাবে এপিপির কাজে সার্কেল থেকে অনুমোদিত কয়েকটি ওটিএম টেন্ডারের মধ্যে রয়েছে ১১১১৭৮১, ১১১৯৩১৬, ১১১৩০৭৯, ১১১১৫৬৩, ১১১১৫৫৮, ১১১১৫৫৯, ১১১১৫৬০, ১১১১৫৭০, ১১১১৫৬৭, ১১১১৫৬৯, ১১১১৫৬১, ১১১১৫৬৪, ১১১১৫৬৫, ১১১১৫৬৬, ১০৮১৫৪৬, ১১০০৭৯০, ১১০২০২৮, ১০৯১৯৭৩, ১০৯১৯৭৪, ১০৯১৯৭৫, ১০৯১৯৭৬, ১০৯১৯৭৭, ১০৯১৯৭৮, ১০৯১৯৭৯, ১০৮২১৫৯, ১০৮০২৩৫, ১০৮০২৩৬, ১০৬৯১৩১, ১০৭০৮৭৪, ১০৭০৮৭৫, ১০৭০৮৭৬, ১০৭১২৬৫, ১০৪৩২৪৮, ১০২৯৫৯৬ এবং ১০১৮১৫৯।
বগুড়ায় দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি প্রাক্কলন করে লুটপাটের পরিকল্পনা করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের (শজিমেক) তিনটি গ্যালারিতে ২৪টি এসি বসানোর ঘটনা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৪টি এসি স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৭৩ লাখ ১৪ হাজার ৫২০ টাকা। অথচ এসব এসি চালু করতে নতুন সাবস্টেশন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৬ কোটি ৭৫ লাখ ২৪ হাজার ৭৪১ টাকা। মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে আপত্তি তুললে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কথিত লুটপাটের পুরো পরিকল্পনাটি সাজানো হয়েছিল তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসেরের নেতৃত্বে।
শজিমেকের অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হল নির্মাণ প্রকল্পের জেনারেটর সরবরাহ নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। গণপূর্তের ই-জিপি দরপত্র অনুযায়ী, সেখানে ২৫০ কেভিএ ক্ষমতার জেনারেটর সরবরাহ করার কথা ছিল। এর জন্য বরাদ্দ ছিল ৯ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১২০ কেভিএ ক্ষমতার জেনারেটর বলে অভিযোগ।
অর্থাৎ, দরপত্রে নির্ধারিত ক্ষমতার চেয়ে ১৩০ কেভিএ কম ক্ষমতার জেনারেটর সরবরাহ করেও পুরো বরাদ্দের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এ ঘটনায় আবু নাসেরের যোগসাজশ ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
শুধু শজিমেক নয়, বগুড়া জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, জেলার বিভিন্ন মডেল মসজিদ, এপিবিএন ব্যারাক বিল্ডিং, সিজেএম আদালত ভবন, আনসার ও ভিডিপি অস্ত্রাগার, বিভিন্ন থানা ভবন, তাঁতবোর্ড বেসিক সেন্টার এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদপ্তর ভবনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজেও ব্যাপক জাল-জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব প্রকল্পের অনিয়মে আবু নাসেরের নেতৃত্ব ও প্রভাব ছিল।
অভিযোগের আরও গুরুতর অংশ হলো, লাভজনক কাজগুলো করাতে ঢাকা থেকে ঠিকাদার ডেকে এনে আবু নাসের চৌধুরী নিজেই বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে কাজের অনুমোদন এবং বিল প্রদানের প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এতগুলো প্রকল্প, টেন্ডার, প্রাক্কলন ও সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়গুলো এখন নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি রাখে। বিশেষ করে উল্লিখিত টেন্ডার আইডিগুলোর ই-জিপি নথি, দরপত্রের ধরন, প্রাক্কলন, অনুমোদন, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট অডিট ও তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রকৌশলী ড. আবু নাসেরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই এবং তাঁর বক্তব্য নেওয়া জরুরি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। সরকারি অর্থের ব্যবহার, টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















