রাজউকের মোবাইল কোর্টে মিটার জব্দ, ভবন মালিকের সঙ্গে রাফিউল-ইলিয়াসের গোপন চুক্তিতে ফের অবৈধ ভবনের কাজ চলমান। রাজধানীর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের মালাকারটোলায় রাজউকের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরও একটি নির্মাণাধীন ভবনে ফের নির্মাণকাজ চলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযানের সময় ভবনটির নির্মাণকাজে বিধিবহির্ভূত ব্যত্যয় চিহ্নিত করে আংশিক অপসারণ, বৈদ্যুতিক সার্ভিস লাইন বিচ্ছিন্ন এবং মিটার জব্দ করা হলেও পরবর্তী সময়ে মিটার ফেরত নিয়ে নির্মাণকাজ চালু করার দাবি করেছেন ভবনটির মালিক আমির হোসেন। আর এখানেই প্রশ্ন উঠেছে, রাজউকের জব্দ করা মিটার কী প্রক্রিয়ায় আবার ভবন মালিকের হাতে গেল?
ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করেছে স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ২০ লাখ টাকার কথিত ‘রফাদফা’র অভিযোগ। অভিযোগের সঙ্গে রাজউকের ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলম ও অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেনের নামও আলোচনায় এসেছে।
মোবাইল কোর্টে ব্যত্যয়, জব্দ হয় মিটার
রাজউক জোন-৭/১-এর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ আগস্ট সূত্রাপুর এলাকায় পরিচালিত মোবাইল কোর্টে ৪, ৫ ও ৬ নম্বর মালাকারটোলা লেনের নির্মাণাধীন ভবনটি পরিদর্শন করা হয়। অভিযানে ভবনটির ব্যত্যয়কৃত অংশের আংশিক অপসারণ করা হয়। একই সঙ্গে একটি বৈদ্যুতিক সার্ভিস লাইন বিচ্ছিন্ন করে সেটি ডিপিডিসির প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তরের তথ্য রয়েছে।
সেদিন মোট ৯টি ভবন পরিদর্শন, ৩টি মিটার জব্দ এবং ৩টি সার্ভিস লাইন বিচ্ছিন্ন করা হলেও সংশ্লিষ্ট নথিতে কোনো জরিমানা আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।
যে ভবনে মোবাইল কোর্টে ব্যত্যয় শনাক্ত হয়েছিল, সেই ভবনের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে কোন প্রক্রিয়ায় কাজ চালু রাখা হলো-এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মিটার গেল কোথায়?
মোবাইল কোর্টের পর নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকার কথা থাকলেও স্থানীয়ভাবে কিছুদিন পর আবার নির্মাণকাজ শুরুর অভিযোগ ওঠে।
ভবন মালিক আমির হোসেনের বক্তব্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, রাজউক জব্দ করা মিটার ফেরত দেওয়ার পর তিনি সেটি এনে আবার নির্মাণকাজ শুরু করেছেন।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট নয়
রাজউক জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেন জানিয়েছেন, ভবনটিতে একবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মিটার জব্দ করা হয়েছিল। ভবন মালিকপক্ষ আবার বিধিবহির্ভূতভাবে নির্মাণকাজ চালালে আইন অনুযায়ী পুনরায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলম মোবাইল কোর্টে অনিয়ম পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে মিটার পুনরায় ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য-এ ক্ষেত্রে আদালতের কোনো আদেশ থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, রাজউক কর্মকর্তাদের কাছে অবৈধ ভবনের অভিযোগ গেলে লোভ দেখিয়ে মোবাইল কোর্ট করা হয়। এরপর গোপন সমঝোতা চুক্তিতে রাজি হলে কোনো জরিমানা করা হয় না ভবন মালিককে। উল্টো তাঁদের আদালতে রিট করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
২০ লাখ টাকার ‘রফাদফা’র অভিযোগ
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, মোবাইল কোর্টের পর ভবনটির বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে প্রায় ২০ লাখ টাকার কথিত সমঝোতা হয়েছে। এই অভিযোগের সঙ্গে ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলম এবং অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেনের নামও আলোচনায় এসেছে।
পাশের ভবন ঝুঁকিতে—লিখিত অভিযোগ
এ ঘটনা শুধু রাজউকের আইন প্রয়োগের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে পাশের ভবনের নিরাপত্তা নিয়েও লিখিত অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৩ এপ্রিল রাজউক জোন-৭ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেন ৬/১ মালাকারটোলা লেনের বাসিন্দা দিলীপ কুমার দাস।
তাঁর অভিযোগ, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণের সময় তাঁদের ভবনের সীমানার একেবারে ঘেঁষে নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। এতে তাঁদের ভবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। নির্মাণকারী পক্ষ তাঁদের উত্তর দিকের তিনটি দেয়াল এবং পশ্চিম দিকের একটি দেয়ালের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে নির্মাণকাজের শব্দে পরিবারের অসুস্থ সদস্যের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথাও উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধু নকশা বা সাইডব্যাকের সম্ভাব্য ব্যত্যয়ের প্রশ্ন নয়; প্রতিবেশী স্থাপনার নিরাপত্তা ও ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও এর সঙ্গে যুক্ত।
থানায় জিডি—বিরোধ গড়িয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্নে
রাজউকে অভিযোগের পাশাপাশি বিষয়টি থানাতেও গড়িয়েছে।
গত ১০ আগস্ট সূত্রাপুর থানায় করা জিডি নং ৫১৮-তে দিলীপ কুমার দাস কয়েকজনের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ করেন। তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও জিডিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) মোঃ রাসেল মোল্লা জানিয়েছেন, দুই পক্ষেরই জিডি রয়েছে এবং উভয় পক্ষের জিডি তদন্তাধীন।
প্রশ্ন উঠেছে, মোবাইল কোর্টে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি একই ভবনে নির্মাণকাজ ফের শুরু হয়, তাহলে আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা কোথায় থেমে গেল?
এদিকে মালাকারটোলার এই ঘটনাটি তাই কেবল একটি ভবনের নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নয়। এটি একই সঙ্গে রাজউকের মোবাইল কোর্টের কার্যকারিতা, জব্দ করা মিটারের ব্যবস্থাপনা, নির্মাণকাজ পুনরায় চালুর অনুমতি এবং মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মোবাইল কোর্টে যদি সত্যিই বিধিবহির্ভূত নির্মাণ শনাক্ত হয়ে থাকে এবং মিটার জব্দ করা হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে সেই মিটার কীভাবে ভবন মালিকের হাতে ফিরল এবং কোন প্রক্রিয়ায় নির্মাণকাজ পুনরায় চলল-এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















