সরকারি গেজেটভুক্ত ৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি এক মিসকেসের মাধ্যমে একটি জালিয়াতচক্রের হাতে তুলে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড তানজিলা জান্নাত রেটিনা। হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্টের নামে সেনপাড়া পর্বতা মৌজার অধিগ্রহণকৃত প্রায় ১ হাজার একর সম্পত্তি থেকে কলমের এক খোঁচায় ৭৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমি জালিয়াতচক্রকে মোটা অঙ্কের ‘উপঢৌকনের’ বিনিময়ে ‘উপহার’ দিয়েছেন তিনি। ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসে রেকর্ড সংশোধনের মাধ্যমে পাওয়া ওই চক্রের হোতা মো. মোশারফ হোসেন, পিতা-নুরুদ্দিন আহম্মেদ। ঠিকানা ২৬/২ আজিমপুর। মিসকেসের মাধ্যমে সরকারি গেজেটভুক্ত সম্পত্তি হস্তান্তরের এই ঘটনা শুধু বেআইনিই নয়, নজিরবিহীন বলেও মত দিয়েছেন একাধিক আইনজ্ঞ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে সরকার হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মিরপুর এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ৯০/৬৫-৫৬ নম্বর এলএ কেসের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করে, যা দেশ স্বাধীনের পরও বর্ধিত হয়। তখন ৫/৭২-৭৩ নম্বর এলএ কেসের মাধ্যমে আরও কিছু জমি সরকার অধিগ্রহণ করে। মূলত মিরপুরের অধীনস্থ বাউনিয়া, সেনপাড়া পর্বতা, চাকুলি ও দ্বিগুণ মৌজায় এই অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৯০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপনটি গেজেট হিসেবে সরকারি ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত হয়।
এরপর সরকার হাউজিং কাজে সিংহভাগ জমি বরাদ্দ দিলেও কিছু জমি ভবিষ্যৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রেখে দেয়। সময়ের ব্যবধানে সরকারি এই জমি জালিয়াতি ও নানা কৌশলে আত্মসাৎ করার জন্য বেশ কিছু চক্র মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা জাল দলিল, পর্চা, নামজারির কাগজ ও খাজনার রশিদ বানিয়ে কিছু জরিপ ও রেকর্ড কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে নিজেদের নামে রেকর্ড-পর্চা করে নিতে সক্ষম হয়। এদের মধ্যে নুরুদ্দিন আহম্মেদ ও আবদুর রাজ্জাক অন্যতম। তাঁরা কেউই স্থানীয় বাসিন্দা নন। নুরুদ্দিনের বাড়ি রাজধানীর আজিমপুরে আর আবদুর রাজ্জাকের বাড়ি কামরাঙ্গীরচরে। মূলত সরকারি অব্যবহৃত জমি আত্মসাৎ করার জন্য তারা প্রতারণাপূর্বক অনেক সম্পত্তি নিজেদের নামে রেকর্ড করান।
এর মধ্যে নুরুদ্দিন আহম্মেদের ওয়ারিশ দাবিদার পুত্র-কন্যাদের পক্ষে মো. মোশারফ হোসেন গেজেটভুক্ত সরকারি ৭৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমি আত্মসাৎ করার জন্য ১৩/২৬ নম্বর মিসকেসটি দায়ের করা হয়। যে সম্পত্তির সিটি খতিয়ান নম্বর ৫৩৫৯ এবং সিটি দাগ নম্বর ১৯১২৫ ও ১৯১৩০। যা নুরুদ্দিনের ওয়ারিশ মোশারফ গং ২৬৮৫ নম্বর দলিলমূলে মালিকানা দাবি করেন। তারা আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে একটি নোটারি না-দাবি ডিড উল্লেখ করেন, যা এ বছরের ২২ এপ্রিল সম্পাদিত হয়েছে।
এসিল্যান্ড তানজিলা জান্নাত রেটিনা ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসের আদেশ দেন গত ৬ মে। আদেশের ভেতরেই স্ববিরোধী তথ্য রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, সিএস ও এসএ দাগ দিয়ে ৯০/৬৫-৬৬ ও ৫/৭২-৭৩ নম্বর এলএ কেসের মাধ্যমে হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্টের নামে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জমি আবার তিনটি খতিয়ানের মাধ্যমে ঢাকা সিটি জরিপে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হয়েছে। সেই জরিপে ৫৩২১, ৫৩৫৯ ও ৫৪২১ নম্বর খতিয়ানে উল্লিখিত জমির খাজনা ১৪২৮ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে দেওয়ানি বিষয়ক সিনিয়র আইনজীবী মনির হোসেন বলেন, ‘এসিল্যান্ড একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদধারী। তাই তিনি সরকারের অধিগ্রহণকৃত এক ইঞ্চি জমিও কোনো মিসকেস বা বিবিধ আদেশের মাধ্যমে ব্যক্তির নামে রায় দিতে পারেন না। গেজেটভুক্ত সম্পত্তি নিয়ে কীভাবে মিসকেস চালানো হলো, সেটাই বড় প্রশ্ন। শুধু আদালত থেকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে তার পরিপ্রেক্ষিতে মিসকেস রুজু করে তা আপিল করতে পারেন একজন এসিল্যান্ড।’
সরকারি সম্পত্তি কীভাবে মোশারফ হোসেন গংয়ের পক্ষে বিবাদীর নামে কর্তন করে রেকর্ড সংশোধনের আদেশ দেওয়া হলো, তা জানার জন্য সরেজমিনে মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেল-সংশ্লিষ্ট সেনপাড়া পর্বতা ভূমি অফিসে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে গিয়ে জানা যায়, যেকোনো মিসকেসের রায় দিতে হলে সংশ্লিষ্ট সহকারী ভূমি কর্মকর্তা বা উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা ছাড়াও কানুনগো-সার্ভেয়ারের সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসের ক্ষেত্রে সেটা মানা হয়নি।
উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উক্ত মিসকেসের উল্লিখিত জমি সরকারের অধিগ্রহণকৃত—এমন মতামত দেওয়ার পরও তা ব্যক্তির নামে রায় দেওয়া হয়েছে।’
মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেল ও সেনপাড়া পর্বতা তহশিল অফিস সূত্রে জানা গেছে, মো. মোশারফ গং ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসের রায় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে নামজারি করার জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। কিন্তু সরকারি গেজেটভুক্ত সম্পত্তি হওয়ায় তহশিল থেকে তার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। উক্ত মিসকেস ও নামজারি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মোহাম্মদপুর এসিল্যান্ড এবং সেনপাড়া পর্বতা তহশিল অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বলেও একটি সূত্র জানায়।
স্থানীয় লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব গেজেটভুক্ত সরকারি সম্পত্তির জাল কাগজপত্র তৈরি করছে সংঘবদ্ধ প্রতারক জালিয়াতচক্র। এদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভূমি অফিসের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তা না হলে এসব সরকারি সম্পত্তির খাজনা নেওয়া হয় কীভাবে? একেকটি খাজনার রসিদ কাটার জন্য জালিয়াতরা ২০-৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিয়ে থাকে। মিরপুরের বর্ষীয়ান বাসিন্দা নুরুল হক বলেন, বর্তমানে জালিয়াত ও ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য অনেক বেড়েছে। তারা অসৎ ভূমি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলেমিশে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার জমি আত্মসাৎ করে ফেলছে। এর মধ্যে সরকারের অধিগ্রহণকৃত গেজেটভুক্ত সম্পত্তিও বাদ যাচ্ছে না।
এসব বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড তানজিলা জান্নাত রেটিনার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়ার পর ফোন ধরেন তিনি। তবে এ-সংক্রান্ত প্রশ্ন শোনার পর ‘খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি’ বলে কল কেটে দেন। এরপর বহুবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















