চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান, মাস্টার অপারেটর ও সিবিএ নেতা আরিফুল ইসলাম, উৎপাদন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) উত্তম চৌধুরী এবং এমটিএস বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহজাহান কবিরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার জালিয়াতি, ভুয়া হাজিরা দেখানো, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মিজান-আরিফ-উত্তম-শাহজান চক্র গড়ে তুলে সিইউএফএলে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাট চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন সিইউএফএলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অভিযোগে মিজান-আরিফ-উত্তম-শাহজান চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, সিইউএফএলের ইজিপি নির্দেশিকা অমান্য করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টেন্ডার আহ্বান করেন এমডি মিজানুর রহমান। এরপর পছন্দের ঠিকাদারকে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার কাজ ২ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সরকারের ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) কর্তৃপক্ষ ওই টেন্ডার বাতিল করে। পরে নতুন করে ইজিপি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে সরকারের ৫৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সিইউএফএলের এমটিএস বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহজাহান কবির কারখানার আশপাশে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিজ এলাকায় তিনি বিঘার পর বিঘা জমি কিনেছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া অচল পরিবহন পুলের গাড়ি সচল দেখিয়ে ভুয়া জ্বালানি খরচ দেখানো এবং কারখানা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও চোরাই বাজারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিক্রির মাধ্যমে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, এমডি মিজানুর রহমানের মদদে মাস্টার অপারেটর ও সিবিএ নেতা আরিফুল ইসলাম গত দুই বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। বিষয়টি আড়াল করতে হাজিরা খাতায় ‘ব্যাকডেটে’ ভুয়া স্বাক্ষর করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাজুয়াল ছুটির নথিও তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।
লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ২০২২ সাল থেকে সিবিএ নির্বাচন বন্ধ রেখে কারখানার সাধারণ শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে পছন্দের লোকজনকে নিয়ে পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে অভিযুক্তরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, আনোয়ারার চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিয়ম ভেঙে সংলগ্ন বাজারের দোকানপাট ও আবাসিক ভবনে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অনুমতি নেই বলে জানা গেছে। ফলে এই বিদ্যুৎ বিক্রির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়া বাজারের শতাধিক দোকান ও বাসাবাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে সিইউএফএলের বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব সংযোগ থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল আদায় হয় বলে জানা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিল বকেয়া রেখেও বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় অভিযোগের তীর এমডি মিজানুর রহমান, মাস্টার অপারেটর আরিফুল ইসলাম এবং উৎপাদন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) উত্তম চৌধুরীর দিকেও। অভিযোগে বলা হয়েছে, সিইউএফএল থেকে তিনটি মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। পরে ওই সংযোগ ব্যবহার করে বাজারের বিভিন্ন দোকান ও বসতঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সংঘবদ্ধ চক্রটি প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিইউএফএলের কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য একটি ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। সেখানে দুটি স্টিম টারবাইন জেনারেটর (এসটিজি) ইউনিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ের নীতিমালা-২০০৭ অনুযায়ী, নিজস্ব ব্যবহারের জন্য স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাইরে সরবরাহ বা বিক্রি করতে হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রয়োজন। তবে নিয়মকানুনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে উত্তম চৌধুরী, শাহজাহান কবির, এমডি মিজানুর রহমান ও সিবিএ নেতা আরিফুল ইসলাম প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, এমডি মিজানুর রহমান ভোলা জেলার চরপাতা গ্রামে একটি দোতলা বাড়ি এবং নরসিংদী জেলায় একটি সাততলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাঁর নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নিজ গ্রামেও তিনি বিপুল পরিমাণ জায়গা-জমি কিনেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মিজানুর রহমান তাঁর স্ত্রীর নামে কোটি কোটি টাকার এফডিআর করেছেন। দুর্নীতির অর্থ বৈধ করার উদ্দেশ্যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের নামেও ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, মাস্টার অপারেটর আরিফুল ইসলামও নিজ গ্রামে পাকা ভবন এবং ঢাকায় নামে-বেনামে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি গ্রামের বাড়িতে জায়গা-জমি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন। তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামেও এফডিআর করা হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া এমটিএস বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহজাহান কবিরও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নিজ এলাকায় তিনি বিঘার পর বিঘা জমি কিনেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সিইউএফএলের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অভিযোগ রয়েছে, সিইউএফএলে আরিফুল ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর জুলুম চালানো হচ্ছে। সিবিএ নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রবিউল ইসলাম খান ও এমরান খানকে সম্প্রতি বিসিআইসিতে তদবির করে অন্যত্র বদলি করিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাধারণ শ্রমিকদের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি প্রশ্রয় ও যোগসাজশের কারণেই আরিফুল ইসলাম এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। কারখানার এমডি মিজানুর রহমান নিজেই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকায় আরিফের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে পুরো সিন্ডিকেটকে পাহারা দিচ্ছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ শ্রমিক-কর্মচারীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, “ইচ্ছা থাকলেও কিছু করার নেই। তিনি কারখানার অঘোষিত সিবিএ নেতা। তাঁকে বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সমীহ করেন। তাঁরা ফোন করে তাঁর খোঁজখবর নেন।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “আরিফের কর্মস্থলে না আসার বিষয়টি আমি কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে বলেছেন, কিছু বিষয় দেখেও না দেখার ভান করতে হয়। তাই অপারগ হয়ে মেনে নিচ্ছি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিইউএফএলের সিবিএ নেতা ও মাস্টার অপারেটর আরিফুল ইসলাম বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করছি। কিছুদিন আগে ১১ জনকে অফিসার পদে এবং প্রায় ১০০ জন শ্রমিককে পদোন্নতির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। তাঁরা খুশিমনে যা দিয়েছেন, তা গ্রহণ করেছি। আরও অনেকে এখনো কিছু দেননি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি মাঝে মাঝে জরুরি কাজে বিমানে করে ঢাকায় যাই। চাকরিজীবনে আমরা ৩৬ জন বন্ধু মিলে জায়গা কিনে ঢাকার বাড্ডায় একটি ১০ তলা ভবন নির্মাণ করছি। সেখানে আমার একটি ফ্ল্যাট আছে। আর কিছু নেই আমার।”
সিইউএফএলের প্রধান রসায়নবিদ ও উৎপাদন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান উত্তম চৌধুরী বলেন, “সিইউএফএলের বিদ্যুৎ বাইরে বিক্রি করার কোনো অনুমতি নেই। আমরা ইউরিয়া তৈরি করি। আমার জানামতে, এসব দেখাশোনা করেন এমটিএস বিভাগের জিএম শাহজাহান সাহেব। তিনি এই বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বে আছেন। তিনি ভালো বলতে পারবেন।”
তবে এমটিএস বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহজাহান কবিরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি কিছু জানি না। দুদকে আবেদন কে দিয়েছে, কারা দিয়েছে—তা জানি না। দুদকে আবেদন করেছে, দুদক দেখুক। তারা তদন্ত করে দেখুক। আমরা যদি অনিয়ম করে থাকি, অবশ্যই ব্যবস্থা হবে।”
এ সময় তিনি আরও বলেন, “আমার অফিসে সব কাগজপত্রের রেকর্ড আছে। দুদক দেখুক সবকিছু। কিছুই হবে না আমাদের।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি 



















