বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এটিএম সেলিমের বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি, সম্পদ অর্জন ও বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ২০২২ সালের আগস্টে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকে বিপিসিতে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগের সময় এটিএম সেলিমের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। বিপিসির নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিয়োগের পর কয়েকটি পদ শূন্য হলে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই সেলিমসহ অন্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগে তার চাচা ও তৎকালীন বিপিসির প্রভাবশালী কর্মকর্তা কামাল উদ্দিনের প্রভাব থাকার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এটিএম সেলিম। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তার নিয়োগে কোনো জালিয়াতি হয়নি এবং তিনি সঠিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগসংক্রান্ত নথি ও সময়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি বিপিসির কাছে জানতে বলেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নেও অনিয়মের অভিযোগ অভিযোগের আরেক অংশে মংলা অয়েল ইনস্টলেশন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ছিল ২০৫ কোটি ৪৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা; বিপরীতে বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ২০৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের বিভিন্ন ভাউচার সংরক্ষণ ও হিসাব নিয়েও অডিট আপত্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের অর্থে বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে এ ঘটনায় প্রায় ৯৬ লাখ ৬০ হাজার ১৫০ টাকার অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্পদ অর্জন নিয়েও প্রশ্ন অভিযোগে এটিএম সেলিমের নামে ও বেনামে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় একাধিক স্থাবর সম্পত্তি, দোকান ও ফ্ল্যাট থাকার দাবি করা হয়েছে। এটিএম সেলিম চট্টগ্রামের ফয়েস লেক আবাসিক এলাকার হাজী আবদুল হামিদ রোডে ৬ তলা বিলাসবহুল বাড়িতে পরিবারসহ বসবাস করতেন। বাড়িটির নাম ‘জ্যোৎস্না’ হলেও, এটিএম সেলিম দাবি করেন এটি তার শ্বশুরের বাড়ি। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই বাড়িটি তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে নির্মাণ করেছেন, আর সেই বাড়ির নাম শাশুড়ির নামে রেখেছেন।
এছাড়াও চকবাজারে একটি দোকানের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
বিদেশে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় অর্থ পাচার ও সম্পদ গড়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ দাবির সমর্থনে কোনো আদালতের রায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
অটোমেশন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ বিপিসির আর্থিক কার্যক্রমে অটোমেশন বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগও রয়েছে এটিএম সেলিমের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অটোমেশন কার্যকর হলে তেল বিক্রি, মজুদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতো এবং অনিয়মের সুযোগ কমে আসত।
এছাড়া বিপিসির কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে আমানত থাকা সত্ত্বেও একটি প্রকল্পে ব্যাংকঋণ নেওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৭৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিও বিপিসির অনিয়ম ও স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্তের দাবি এটিএম সেলিমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, অডিট প্রতিবেদন, সম্পদের হিসাব এবং নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিপিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















