ঢাকা ০৯:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রংপুরের এলজিইডি প্রকৌশলী মো. মুসার সম্পদের পাহাড় কাস্টমস কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে ঘুষ-চোরাচালান সিন্ডিকেটের অভিযোগ নতুন দায়িত্ব পেলেন ৩ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ৫,৩১০ ইয়াবাসহ পল্লবী থানার এএসআই গ্রেপ্তার ইউএনডিপি দেশের সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে চায়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রাজিল ম্যাচের জন্য টাকা খরচ করতে চায় না সরকার: আমিনুল হক কুমিল্লা দাউদকান্দিতে গাঁজা-চাপাতিসহ গ্রেপ্তার-৭ বোরহানউদ্দিনে কোস্টগার্ডের সাঁড়াশি অভিযান, ৮ লাখ টাকার বিদেশি সিগারেট জব্দ কালুখালী মহিলা কলেজ পরিদর্শনে এমপি হারুন অর রশিদ হঠাৎ যেন বন্যা পরিস্থিতির মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়ে কাজ করছে সরকার: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

রংপুরে ৪ হ’ত্যা: আরও জটিল হচ্ছে রহস্য

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় আদালতে দুই আসামির জবানবন্দি সত্ত্বেও কাটেনি রহস্যের ধোঁয়াশা। খুনের রাতে অভিযুক্ত দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের অবস্থান এবং চলাফেরা নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বক্তব্যে পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে স্পষ্ট অসংগতি দেখা গেছে।

এদিকে সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালেও মাছুয়াপাড়া এলাকায় থমথমে পরিবেশ ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ওই বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

পরিবারের চাঞ্চল্যকর বয়ান ও সময়ের গরমিল:
পুলিশের দাবি-(২০ আগস্ট) বৃহস্পতিবার রাতে দুই আসামি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ হয়ে শিক্ষকের বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করেন এবং হত্যার পরও সেখানে অবস্থান করে গোসল ও খাবার গ্রহণ করেন।

তবে সিদ্ধার্থ দাসের মা পাপড়ী রানী জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ফুটবল খেলার কথা বলে বের হয় এবং বন্ধুদের সাথে ছিল। শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে সে স্বাভাবিকভাবেই বাসায় ফেরে।

সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস ছেলের অপরাধ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুগ্ধ নেশাখোর, সে আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে যেত। সে অপরাধী হলে প্রশাসন তাকে গুলি করে মারুক। কিন্তু আপনারা বলুন-দুজন উঠতি বয়সী তরুণ মিলে কি একটি পরিবারের চারজন শক্ত-সমর্থ মানুষকে একে একে খুন করতে পারে? নিশ্চয়ই পেছনে আরও বড় কেউ আছে।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ বাসায় ছিলেন না এবং শুক্রবার সকাল ৭টায় উঠে তিনি মুগ্ধর ঘরের বাইরে থেকে তালা ঝুলতে দেখেন। বেলা ১১টার দিকে মুগ্ধ ঘরে ফিরে আসেন। সেনা রানী উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, আমার ছেলে দোষী হলে বিচার হোক, কিন্তু এর সাথে মূল কারা জড়িত তা বের করা হোক। এখন খুনির পরিবার হিসেবে আমরা নিজেরাও চরম আতঙ্কে আছি, রাস্তায় বের হতে ভয় পাচ্ছি।

পুলিশের ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রতিবেশীর দ্বিমত:
পুলিশ দাবি করেছিল-হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তাদের প্রতিবেশী সীমান্তের বাসায় বসে ইয়াবা সেবন করেছিলেন। কিন্তু সীমান্তের বাবা সুবাস দাস বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে সিদ্ধার্থ আমাদের বাসায় এলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে যায়। সেদিন রাতে সিদ্ধার্থ সীমান্তের সঙ্গে ছিল না।

শেষকৃত্য সম্পন্ন ও ১০ দিনে ৬ খুনে আতঙ্ক:
শনিবার (২২ আগস্ট) গভীর রাতে বন্ধ ঘর থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রাপ্তি (২৩) ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) পচা-গলা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন।

জনমনে প্রশ্ন ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ:
রংপুরে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ৬টি খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দারা জানান, এলাকায় মাদকের অবাধ বিস্তারের কারণেই আজ এমন বিপর্যয়।

তবে কেবল দুই মাদকসেবী তরুণ পুরো ঘটনা ঘটিয়েছে— পুলিশের এই তড়িঘড়ি ব্যাখ্যা মানতে পারছেন না কেউ। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই এমন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে কি না-তা নিয়ে জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী ও রংপুরবাসী নগরজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন। তারা এই হত্যাকাণ্ডের গভীর ও নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রংপুরের এলজিইডি প্রকৌশলী মো. মুসার সম্পদের পাহাড়

রংপুরে ৪ হ’ত্যা: আরও জটিল হচ্ছে রহস্য

আপডেট সময় ০৬:৫২:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় আদালতে দুই আসামির জবানবন্দি সত্ত্বেও কাটেনি রহস্যের ধোঁয়াশা। খুনের রাতে অভিযুক্ত দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের অবস্থান এবং চলাফেরা নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বক্তব্যে পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে স্পষ্ট অসংগতি দেখা গেছে।

এদিকে সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালেও মাছুয়াপাড়া এলাকায় থমথমে পরিবেশ ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ওই বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

পরিবারের চাঞ্চল্যকর বয়ান ও সময়ের গরমিল:
পুলিশের দাবি-(২০ আগস্ট) বৃহস্পতিবার রাতে দুই আসামি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ হয়ে শিক্ষকের বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করেন এবং হত্যার পরও সেখানে অবস্থান করে গোসল ও খাবার গ্রহণ করেন।

তবে সিদ্ধার্থ দাসের মা পাপড়ী রানী জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ফুটবল খেলার কথা বলে বের হয় এবং বন্ধুদের সাথে ছিল। শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে সে স্বাভাবিকভাবেই বাসায় ফেরে।

সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস ছেলের অপরাধ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুগ্ধ নেশাখোর, সে আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে যেত। সে অপরাধী হলে প্রশাসন তাকে গুলি করে মারুক। কিন্তু আপনারা বলুন-দুজন উঠতি বয়সী তরুণ মিলে কি একটি পরিবারের চারজন শক্ত-সমর্থ মানুষকে একে একে খুন করতে পারে? নিশ্চয়ই পেছনে আরও বড় কেউ আছে।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ বাসায় ছিলেন না এবং শুক্রবার সকাল ৭টায় উঠে তিনি মুগ্ধর ঘরের বাইরে থেকে তালা ঝুলতে দেখেন। বেলা ১১টার দিকে মুগ্ধ ঘরে ফিরে আসেন। সেনা রানী উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, আমার ছেলে দোষী হলে বিচার হোক, কিন্তু এর সাথে মূল কারা জড়িত তা বের করা হোক। এখন খুনির পরিবার হিসেবে আমরা নিজেরাও চরম আতঙ্কে আছি, রাস্তায় বের হতে ভয় পাচ্ছি।

পুলিশের ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রতিবেশীর দ্বিমত:
পুলিশ দাবি করেছিল-হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তাদের প্রতিবেশী সীমান্তের বাসায় বসে ইয়াবা সেবন করেছিলেন। কিন্তু সীমান্তের বাবা সুবাস দাস বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে সিদ্ধার্থ আমাদের বাসায় এলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে যায়। সেদিন রাতে সিদ্ধার্থ সীমান্তের সঙ্গে ছিল না।

শেষকৃত্য সম্পন্ন ও ১০ দিনে ৬ খুনে আতঙ্ক:
শনিবার (২২ আগস্ট) গভীর রাতে বন্ধ ঘর থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রাপ্তি (২৩) ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) পচা-গলা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন।

জনমনে প্রশ্ন ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ:
রংপুরে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ৬টি খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দারা জানান, এলাকায় মাদকের অবাধ বিস্তারের কারণেই আজ এমন বিপর্যয়।

তবে কেবল দুই মাদকসেবী তরুণ পুরো ঘটনা ঘটিয়েছে— পুলিশের এই তড়িঘড়ি ব্যাখ্যা মানতে পারছেন না কেউ। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই এমন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে কি না-তা নিয়ে জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী ও রংপুরবাসী নগরজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন। তারা এই হত্যাকাণ্ডের গভীর ও নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।