রংপুরের পীরগঞ্জে নগর মাতৃসদনে প্রসূতি শ্রাবণী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগের পর এবার স্বজন ও এলাকাবাসীর বিক্ষোভের মুখে নগর মাতৃসদনের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বেলা আনুমানিক দেড়টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শ্রাবণী বেগম (১৯) গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের ইসলামপুর ছাইগাড়ী গ্রামের রোহানের স্ত্রী। গত ১৮ আগস্ট রাতে সন্তান প্রসবের জন্য পীরগঞ্জ পৌরসভার ওসমানপুরে অবস্থিত নগর মাতৃসদনে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্বজনরা চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করেন।
নিহতের স্বজনদের দাবি, নগর মাতৃসদনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অদক্ষ জনবল ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, শ্রাবণী ছাড়াও দীর্ঘদিনে সেখানে আরও তিনজন প্রসূতি বা ডেলিভারি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে শ্রাবণীর স্বজন ও স্থানীয় এলাকাবাসী নগর মাতৃসদন প্রকল্প এলাকায় জড়ো হয়ে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন। একপর্যায়ে উপস্থিত জনতার সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সেখানে বিক্ষোভ দেখা দেয়।
খবর পেয়ে পীরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করেন। পরে প্রকল্পের কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে সরেজমিনে মাতৃসদন পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে উপস্থিত জনতার সামনে ইউএনও মৌখিকভাবে নগর মাতৃসদনের প্রকল্প কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
এদিকে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদ রানা বলেন, “চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধের জন্য একাধিকবার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও তারা রহস্যজনক কারণে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।”
তিনি আরও জানান, দেশের যেসব নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব ভবন রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলমান রয়েছে। তবে যেসব কেন্দ্রের নিজস্ব ভবন নেই, সেগুলোর প্রকল্পের মেয়াদ গত ১ জুলাই শেষ হওয়ায় বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে নগর মাতৃসদনের কার্যক্রম কীভাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও চলছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পৌর সচিব আব্দুর রহিম প্রামাণিকের নির্দেশেই কেন্দ্রটির কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।
পীরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক ও ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে মাতৃসদন কেন্দ্রে পৌরসভার তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান বন্ধ রয়েছে। কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে জানিয়েছেন, প্রসূতি একলামশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। প্রেসার বেশি হওয়ার কারণে তাঁর খিঁচুনি উঠেছিল। সিভিল সার্জন তদন্ত করলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন হবে।”
উল্লেখ্য, গত ১৯ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করেছিলেন, নগর মাতৃসদনে চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণেই শ্রাবণীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
এখন বিক্ষোভের পর নগর মাতৃসদনের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণায় প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
তারিকুল ইসলাম তারিক পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি 




















