ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-২ কার্যালয়ে ঠিকাদারদের কাজের ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে প্রকৌশল বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারদের কথোপকথন ও লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে বলে দাবি করেছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অঞ্চল-২-এর প্রকল্প পরিচালক খাইরুল বাকের, সহকারী প্রকৌশলী দিদার আলম এবং উপসহকারী প্রকৌশলী আহসান হাবিব। অভিযোগকারীদের দাবি, কাজের অনুমোদন, ছাড়পত্র এবং বিল ছাড় করাতে বিভিন্ন পর্যায়ে কথিত ‘পারসেন্টেজ’ দিতে হয়। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে রয়েছে ভিন্নতা; আহসান হাবিব সরাসরি কোনো পারসেন্টেজ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে খাইরুল বাকের ও দিদার আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিন ধাপে ঘুষের অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিকাদারদের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়টি একক কোনো পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। কাজ পাওয়ার আগে, কাজ চলাকালে এবং কাজ শেষ হওয়ার পর বিলের সময় এমন একাধিক পর্যায়ে অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদারের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে কাজের বিল পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কথিত কমিশন দিতে হয়।
ওই ঠিকাদার আরও অভিযোগ করেন, কিছু কাজকে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ঠিকাদারদের ওপর অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপ তৈরি করা হয়। তিনি দাবি করেন, ‘আওয়ামী লীগের লাইসেন্স’ হিসেবে কোনো কাজকে চিহ্নিত করে বেশি ‘পারসেন্টেজ’ দাবি করা হতো।
গোপন ক্যামেরার ফুটেজ
গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘিরে ঠিকাদারদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের প্রাসঙ্গিক দৃশ্য থাকার দাবি করা হয়েছে। ফুটেজের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, কথোপকথনের ধারাবাহিকতা এবং অর্থের উৎস ও গন্তব্য যাচাই করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযুক্ত প্রকৌশলীর অস্বীকার
অভিযোগের বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী আহসান হাবিবের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো ধরনের কমিশন নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তার বক্তব্যের সারাংশ হলো তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো ‘পারসেন্টেজ’ নেন না এবং কারা এমন অর্থ নেয় সে বিষয়ে তিনি বলতে পারবেন না। তার সঙ্গে কোনো ঠিকাদারের এ ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে সহকারী প্রকৌশলী দিদার আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের আরেক কেন্দ্রে থাকা প্রকল্প পরিচালক খাইরুল বাকেরকে এরই মধ্যে রাজশাহীতে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
শুধু অঞ্চল-২ নয়, অভিযোগের বিস্তার?
ঠিকাদারদের অভিযোগ, কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ শুধু অঞ্চল-২-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ডিএসসিসির বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়েই দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো-যদি সত্যিই কাজের টেন্ডার, অনুমোদন, ছাড়পত্র ও বিল ছাড়ের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে ঘুষের বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ নয়; বরং সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
এতে প্রকৃত যোগ্য ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে পারেন, কাজের ব্যয় বাড়তে পারে এবং নিম্নমানের কাজের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
প্রশাসকের অবস্থান কঠোর
অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, প্রমাণসহ কেউ অভিযোগ দিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাময়িক বরখাস্ত থেকে চাকরিচ্যুতি পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে এবং বিভাগীয় মামলা করা হবে।
সরকারি উন্নয়ন কাজের প্রতিটি ধাপ যদি স্বচ্ছ নিয়মের পরিবর্তে কথিত কমিশন নির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে নাগরিকদের অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের মান ও ব্যয় দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিজেই প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















