কলেজ শিক্ষক শামীম হোসেন ১৯৯৮ সালে বেলকুচি মডেল কলেজে মার্কেটিং বিভাগে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি এই প্রতিষ্ঠান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্র গৃহীতও হয়। কিন্তু আবার দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর শিক্ষা পেশার বাইরে থাকলেও ২০১১ সালে তিনি নতুন করে বেলকুচি মডেল কলেজে নিজের আগের এমপিও চালু রাখার বিষয়টি পুরোপুরি গোপন করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। এই পর্যন্ত সবই ঠিক থাকলেও নিজের ছয়বছরের সার্ভিস ব্রেকের তথ্য গোপন করে, পদত্যাগের পরও আগের ইনডেক্সে চতুরতার সঙ্গে চালু রেখে নতুন নিয়োগের পর আগের সেই ইনডেক্সেই বেতন ভাতা তোলা শুরু করেন শামীম হোসেন।
যদিও তার দ্বিতীয়বার নিয়োগের সময় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের- এনটিআরসিএ’র সনদ থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু শামীম হোসেনের সেই সনদ ছিল না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এদিকে অনিয়ম করে সার্ভিস ব্রেকের সময়ের বেতন তুলেই ক্ষ্যান্ত হননি এই কলেজ শিক্ষক। ইতোমধ্যে ছয়বছরের বকেয়া টাকাও তুলে ফেলেছেন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। এমন সব অভিযোগের তথ্যাদিসহ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপক মো. আল-মামুন।
অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে মাউশি।
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো অভিযোগকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামীম হোসেন।
মঙ্গলবার রাতে শামীম হোসেন বলেন, ‘আপনি আমার কলেজ আসেন। বাস্তবতা সত্যতা জানার জন্য অবশ্য কলেজে আসা প্রয়োজন।
অভিযোগকারী শিক্ষককে আওয়ামীপন্থি দাবি করে তিনি বলেন, আল মামুন মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন কথা বলে বেড়াচ্ছে। অথচ তিনি ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক। মাঝে মধ্যে কলেজে আসে। তার গত মাসে ৫ দিনের বেতন কাটা হয়েছে এবং কলেজের ফান্ড থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা টাকা আত্মসাৎ করেছে।
যদিও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের এমন অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে আল মামুন বলেন, নিজের অনিয়মের পাহাড় আড়াল করতে এই প্রচারণা চালাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। তার কাছে প্রমাণ থাকলে উপস্থাপন করতে পারে কোনো সমস্যা নেই।
মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের সহকারী পরিচালক (কলেজ) মোহা. সাদিকুল ইসলাম বলেন, এমন অভিযোগের বিষয় জানা নেই। তবে মাউশি যদি অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত দেয় তাহলে সরেজমিন তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। সেখানে অভিযোগ সত্য প্রমাণ হলে অবৈধভাবে নেওয়া সব অর্থ ফেরত দেওয়াসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
পদত্যাগের পর ফের চাকরিতে ঢুকতেও করেছেন চতুরতা
মাউশিতে দেওয়া লিখিত অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, শামীম হোসেন ১৯৯৮ সালে বেলকুচি কলেজে মার্কেটিং বিভাগে শিক্ষক হিসেবে চাকরি নেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হওয়ার কথা বলে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। যা কমিটি কর্তৃক গৃহীতও হয়। এই সময়ে প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তও হয়ে যায়। কিন্তু পদত্যাগের পর দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর শিক্ষা পেশার বাইরে থাকা শামীম হোসেন ২০১১ সালে তিনি নতুন করে বেলকুচি মডেল কলেজে নিয়োগ নেন। যেখানেও অনিয়ম করার অভিযোগ আছে। কারণ ২০০৫ সালের ২০ মার্চ থেকে এনটিআরসিএর সনদ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। অথচ শামীম হোসেন তৎকালিন গভর্নিং বডিকে ম্যানেজ করে শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়াই আগের পদে নিয়োগ নেন।
গোপন করেছেন সার্ভিস ব্রেক, সচল দেখান আগের ইনডেক্স
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় চাকরির বিরতি থাকলে আগের ইনডেক্স সরাসরি সচল বা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। একইসঙ্গে নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগদানের ক্ষেত্রে সার্ভিস ব্রেক ও পূর্বের পদত্যাগের তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে নতুন নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু শামীম হোসেন তা না করে প্রায় ছয়বছরের বেশি সময়ের সার্ভিস ব্রেকের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন করেন। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই কৌশল খাটিয়ে বেলকুচি মহিলা কলেজের পুরনো ইনডেক্স নম্বরটি বেলকুচি মডেল কলেজে সচল দেখান। এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত হয়ে পুরো সময়ের তিনি নিয়মিত সরকারি কোষাগার থেকে মোটা অংকের বেতন-ভাতা ও বকেয়া উত্তোলন করেছেন। এখনো বেতনভাতা তুলছেন।
অভিযোগ শুধু সরকারি অর্থ আত্মসাৎই নয়, নিজের অপকর্ম ঢাকতে ও প্রভাব বিস্তার করতে তার বিরুদ্ধে তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে স্বেচ্ছাচারী আচরণেরও অভিযোগ আছে। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় সহকর্মীদের বেতন কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কর্মকাণ্ডের কারণে নিজের নিরাপত্তা বেলকুচি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন অভিযোগকারী শিক্ষক নিয়ে চরম শঙ্কিত বলে জানান অভিযোগকারী শিক্ষক মো. আল-মামুন।
আর অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য মাউশি মহাপরিচালকের দফতরে দায়ের করা আবেদনের সঙ্গে শামীম হোসেনের তৎকালীন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কপি, চাকরির পদত্যাগপত্র, বেতন শিট এবং বোর্ড পরীক্ষার হাজিরা শিটসহ মোট ৯টি গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক নথিপত্রও সংযুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে মাউশির উপ-পরিচালক (কলেজ-২) শফি মাহমুদের সঙ্গে বলতে চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















