ঢাকা ০১:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ফাইল আটকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন্দ্রে প্রধান প্রকৌশলী আবদুল আউয়াল বিআইডব্লিউটিএ চিলমারী শাখার সহকারী পোর্ট অফিসারের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ নষ্ট ও দুর্নীতির অভিযোগ বেতন-ভাতা তুলছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামীম চসিক সচিবের কণ্ঠ নকল করে অডিও ছড়ানোর অভিযোগ অটোরিকশার আড়ালে গড়ে উঠেছে রাজনীতি ও কালো টাকার সাম্রাজ্য হাসান শওকতের হাতে ‘আলাদিনের চেরাগ রাজউকের ইমারত পরিদর্শক পিয়ালের বিরুদ্ধে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব : প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি হলেও আমার ইচ্ছে আছে, জনগণের পাশে থেকে সেবা করবো: মির্জা ফখরুল
নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়

হাসান শওকতের হাতে ‘আলাদিনের চেরাগ

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের হাতে আলাদিনের চেরাগ রয়েছে। আর সেই চেরাগের জোরেই নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। আর এসব সম্পদ গড়েছেন ইইডির বিভিন্ন পদের দায়িত্বে বসেই।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনমালে একটি ১০তলা স্কুল ভবনের পুরো কাজ বুঝে না নিয়েই ঠিকাদারকে বিল দিয়ে দিয়েছেন। যদিও পরিশোধ করা বিল থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। একসময় নিজেকে আওয়ামী লীগের অনুসারী বলে ইইডিতে সুবিধাজনক পদ ও পছন্দের পদায়ন নেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি জামায়াত-শিবিরের অনুসারী ছিলেন বলে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। আর সেই পরিচয়ে ৫ আগস্টের পর ইইডির ঢাকা মেট্রো অঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, এই চেয়ারে বসে তিনি এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করে যাচ্ছেন গোপনেই। আওয়ামী লীগের অনুসারী ঠিকাদারদের একটি গ্রুপ এখনো ইইডিতে বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এই কর্মকর্তার পরোক্ষ সহযোগিতায়। প্রশ্ন উঠেছে, নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া এই প্রকৌশলীর খুঁটির জোর কোথায়?

এদিকে এই কর্মকর্তার চার বছর আগে নিজ দপ্তরে বসে ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী তার কক্ষে নিজ চেয়ারে বসে রয়েছেন। টেবিলের উল্টোদিকে কয়েকজন ঠিকাদার বসা। এ সময় টাকার উঁচু বান্ডিল দেখা যায় টেবিলের ওপর। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের অফিসে ডেকে নিয়ে ঘুষের টাকা গ্রহণ করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকত।

সূত্র জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান শওকতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কেরামত আলীকে (উন্নয়ন) সভাপতি করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন ইইডির প্রধান প্রকৌশলী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব (উন্নয়ন ৩)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, একসময় নিজেকে আওয়ামী লীগের অর্থদাতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রকৌশলী হাসান শওকত এখন নিজেকে বিএনপির অনুসারী পরিচয়ে পদ দখলে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পলাতক নেতাকর্মীদের মুশকিল দূর করার বাহক হিসেবে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের সময়ে শিক্ষা ইইডিতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়িত থেকে টেহুার-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতেন। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারকে অগ্রিম বিল পরিশোধ করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অগ্রিম বিল পরিশোধ করে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ ঘুষ। ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে জামায়াত-শিবিরের অনুসারী দাবি করে পদোন্নতি নিয়ে ইইডির ঢাকা মেট্রোতে পদায়ন বাগিয়ে নেন। বর্তমানে এই পদে থেকে আগের মতোই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি।

ইইডির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ফান্ডে মোটা অঙ্কের টাকা ‘ডোনেশন’ দেন এই কর্মকর্তা। কিন্তু নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি নিজেকে বিএনপির অনুসারী হিসেবে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঢাকা মেট্রো সার্কেলের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান শওকত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়িত ছিলেন। ছাত্রজীবনে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথি পদধারী থাকলেও সে সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের ম্যানেজ করে ইইডিতে নিজের আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। ঢাকা মেট্রো সার্কেলে বারবার পদায়িত থেকে টেহুার-বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকার মালিক হন। প্রতিটি টেন্ডারে নির্ধারিত কমিশন নিতেন তিনি। এরপর পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে অগ্রিম বিল পরিশোধের মাধ্যমেও মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল দীর্ঘ চাকরিজীবনে ইইডির বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়লেও এই কর্মকর্তাকে কখনো বিপদে পড়তে হয়নি। কারণ তিনি সব সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করেই চলেছেন।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইইডির ঢাকা মেট্রো সার্কেলেই তিনি সবচেয়ে বেশি সময় চাকরি করেছেন। ৫ আগস্টের পর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তার ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।

তার দুর্নীতির উদাহরণ দিয়ে একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইইডির নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় হাসান শওকত ২০১৯ সালে বঙ্গভবন সংলগ্ন শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ১০তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেন বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি লিয়াকত শিকদারের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল্ডার্স-সি,ডব্লিউ বি,ডি জেভি নামে কোম্পানিকে। অথচ ভবনের কাজ শেষ না করেই পুরো টাকা তুলে নিয়ে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের জুন মাসে গোপনে ঠিকাদার ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা লিয়াকত শিকদারকে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয় হাসান শওকতের স্বাক্ষরে। বিলে দেখা যায়, নবম ও ১০ম তলার ছাদসহ বিভিন্ন আইটেমের বিল বাবদ এই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, বাস্তবে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ভবনটি আটতলা পর্যন্ত হয়েছে। নয়তলা এবং ১০তলার কোনো কাজই হয়নি। অথচ ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল তুলে তা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন হাসান শওকত এবং লিয়াকত শিকদার। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ওই টাকা ভাগাভাগির ভিডিওতে দেখা যায়, যেখানে হাসান শওকত নিজ দপ্তরে চেয়ারে বসে আছেন, আর তার সামনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন টেবিলের ওপর টাকার বান্ডিল রেখে কথা বলছেন। ওই ভিডিও ভাইরাল হলে নড়েচড়ে বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরের মোহাম্মদপুর থানাধীন মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বিদ্যুতের লোড বৃদ্ধিসহ মেরামত সংস্কার বাবদ প্রায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে, যার মালিক মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস। ২০২২ সালে ওই কাজের কার্যাদেশ দিয়ে ২০২৩ সালে ৮ লাখ টাকা হাসান শওকতের স্বাক্ষরে বিল তুলে ভাগাভাগি করে করা হয়। তিন মাসের মধ্যে ওই কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সেটি তিন বছরেও শেষ হয়নি; বরং ২০২৫ সালে বিলের বাকি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ঠিকদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। আর এ কাজেও সহায়তা করেছেন প্রকৌশলী হাসান শওকত।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চবিদ্যালয়ে ছয়তলা ভবন নির্মাণের জন্য মেসার্স এমএসবি-এমসিবিএল জেভিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোনো কাজ না করেই ১০ লাখ টাকা বিল তোলা হয় হাসান শওকতের স্বাক্ষরে। এ ছাড়া ঢাকার কোতোয়ালি থানার আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে কোনো কাজ না করেই বিলের ১৯ লাখ টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

হাসান শওকতের যত সম্পদ
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চাকরিজীবনে প্রকৌশলী হাসান শওকত যখন যেখানে যে পদেই চাকরি করেছেন, সেখানেই তার হাতে থাকত আলাদিনের চেরাগ। আর এই চেরাগ ঘষেই তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন নামে-বেনামে।

হাতে আসা কিছু নথিপত্রে দেখা গেছে, নিজের নামে, স্ত্রীর নামে দেশে-বিদেশে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অঢেল সম্পদ। স্ত্রীর নামে কিনেছেন বিভিন্ন স্থানে ১৮৪.৩৩ শতক জায়গা ও রিসোর্ট। এ ছাড়া স্ত্রীর নামে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় বিলপাবলা-৫৭ মৌজায় ৪১২২ খতিয়ানে ১২.৫০ শতাংশ, দিঘলিয়া উপজেলার বয়রা-১০ মৌজায় ৩৭১৭ খতিয়ানে ১১.৭২ শতাংশ, মেহেরপুর জেলার সদর উপজেলার মেহেরপুর-৬৬ মৌজায় ৫০৬২ খতিয়ানে ১৩.৮৫ শতাংশ, একই মৌজায় ৯৯৪২ খতিয়ানে ৮ শতাংশ, মাগুরা সদর উপজেলার মাগুরা-৬৯ মৌজায় ৮০০২ খতিয়ানে ১৯ শতাংশ জমিসহ ঢাকা মহানগরের ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া-১ মৌজায় ৮৭৯৭ খতিয়ানের জমিতে করেছেন আলিশান জমিদার বাড়ি।

মেহেরপুর সদর উপজেলার মেহেরপুর-৬৬ মৌজায় ১৪০৪৫ খতিয়ানে ৬৫ শতাংশ এবং ১৫৪২৯ খতিয়ানে ৪০.৩৭ শতাংশ জমি মোট ১৮৪.৩৩ শতাংশ জমিসহ দক্ষিণখান এলাকায় নিজের এবং স্ত্রীর নামে করেছেন ১০তলা আলিশান বাড়ি। এ ছাড়া তার আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে-বেনামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার জমি, ফ্ল্যাট ও প্লট।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ফাইল আটকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে

নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়

হাসান শওকতের হাতে ‘আলাদিনের চেরাগ

আপডেট সময় ১২:১৬:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের হাতে আলাদিনের চেরাগ রয়েছে। আর সেই চেরাগের জোরেই নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। আর এসব সম্পদ গড়েছেন ইইডির বিভিন্ন পদের দায়িত্বে বসেই।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনমালে একটি ১০তলা স্কুল ভবনের পুরো কাজ বুঝে না নিয়েই ঠিকাদারকে বিল দিয়ে দিয়েছেন। যদিও পরিশোধ করা বিল থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। একসময় নিজেকে আওয়ামী লীগের অনুসারী বলে ইইডিতে সুবিধাজনক পদ ও পছন্দের পদায়ন নেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি জামায়াত-শিবিরের অনুসারী ছিলেন বলে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। আর সেই পরিচয়ে ৫ আগস্টের পর ইইডির ঢাকা মেট্রো অঞ্চলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, এই চেয়ারে বসে তিনি এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করে যাচ্ছেন গোপনেই। আওয়ামী লীগের অনুসারী ঠিকাদারদের একটি গ্রুপ এখনো ইইডিতে বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এই কর্মকর্তার পরোক্ষ সহযোগিতায়। প্রশ্ন উঠেছে, নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া এই প্রকৌশলীর খুঁটির জোর কোথায়?

এদিকে এই কর্মকর্তার চার বছর আগে নিজ দপ্তরে বসে ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী তার কক্ষে নিজ চেয়ারে বসে রয়েছেন। টেবিলের উল্টোদিকে কয়েকজন ঠিকাদার বসা। এ সময় টাকার উঁচু বান্ডিল দেখা যায় টেবিলের ওপর। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের অফিসে ডেকে নিয়ে ঘুষের টাকা গ্রহণ করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকত।

সূত্র জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান শওকতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কেরামত আলীকে (উন্নয়ন) সভাপতি করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন ইইডির প্রধান প্রকৌশলী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব (উন্নয়ন ৩)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, একসময় নিজেকে আওয়ামী লীগের অর্থদাতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রকৌশলী হাসান শওকত এখন নিজেকে বিএনপির অনুসারী পরিচয়ে পদ দখলে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পলাতক নেতাকর্মীদের মুশকিল দূর করার বাহক হিসেবে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের সময়ে শিক্ষা ইইডিতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়িত থেকে টেহুার-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতেন। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারকে অগ্রিম বিল পরিশোধ করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অগ্রিম বিল পরিশোধ করে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ ঘুষ। ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে জামায়াত-শিবিরের অনুসারী দাবি করে পদোন্নতি নিয়ে ইইডির ঢাকা মেট্রোতে পদায়ন বাগিয়ে নেন। বর্তমানে এই পদে থেকে আগের মতোই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি।

ইইডির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ফান্ডে মোটা অঙ্কের টাকা ‘ডোনেশন’ দেন এই কর্মকর্তা। কিন্তু নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি নিজেকে বিএনপির অনুসারী হিসেবে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঢাকা মেট্রো সার্কেলের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান শওকত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়িত ছিলেন। ছাত্রজীবনে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথি পদধারী থাকলেও সে সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের ম্যানেজ করে ইইডিতে নিজের আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। ঢাকা মেট্রো সার্কেলে বারবার পদায়িত থেকে টেহুার-বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকার মালিক হন। প্রতিটি টেন্ডারে নির্ধারিত কমিশন নিতেন তিনি। এরপর পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে অগ্রিম বিল পরিশোধের মাধ্যমেও মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল দীর্ঘ চাকরিজীবনে ইইডির বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়লেও এই কর্মকর্তাকে কখনো বিপদে পড়তে হয়নি। কারণ তিনি সব সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করেই চলেছেন।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইইডির ঢাকা মেট্রো সার্কেলেই তিনি সবচেয়ে বেশি সময় চাকরি করেছেন। ৫ আগস্টের পর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তার ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।

তার দুর্নীতির উদাহরণ দিয়ে একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইইডির নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় হাসান শওকত ২০১৯ সালে বঙ্গভবন সংলগ্ন শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ১০তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেন বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি লিয়াকত শিকদারের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল্ডার্স-সি,ডব্লিউ বি,ডি জেভি নামে কোম্পানিকে। অথচ ভবনের কাজ শেষ না করেই পুরো টাকা তুলে নিয়ে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের জুন মাসে গোপনে ঠিকাদার ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা লিয়াকত শিকদারকে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয় হাসান শওকতের স্বাক্ষরে। বিলে দেখা যায়, নবম ও ১০ম তলার ছাদসহ বিভিন্ন আইটেমের বিল বাবদ এই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, বাস্তবে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ভবনটি আটতলা পর্যন্ত হয়েছে। নয়তলা এবং ১০তলার কোনো কাজই হয়নি। অথচ ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিল তুলে তা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন হাসান শওকত এবং লিয়াকত শিকদার। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ওই টাকা ভাগাভাগির ভিডিওতে দেখা যায়, যেখানে হাসান শওকত নিজ দপ্তরে চেয়ারে বসে আছেন, আর তার সামনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন টেবিলের ওপর টাকার বান্ডিল রেখে কথা বলছেন। ওই ভিডিও ভাইরাল হলে নড়েচড়ে বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরের মোহাম্মদপুর থানাধীন মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বিদ্যুতের লোড বৃদ্ধিসহ মেরামত সংস্কার বাবদ প্রায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে, যার মালিক মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস। ২০২২ সালে ওই কাজের কার্যাদেশ দিয়ে ২০২৩ সালে ৮ লাখ টাকা হাসান শওকতের স্বাক্ষরে বিল তুলে ভাগাভাগি করে করা হয়। তিন মাসের মধ্যে ওই কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সেটি তিন বছরেও শেষ হয়নি; বরং ২০২৫ সালে বিলের বাকি ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ঠিকদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। আর এ কাজেও সহায়তা করেছেন প্রকৌশলী হাসান শওকত।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ উচ্চবিদ্যালয়ে ছয়তলা ভবন নির্মাণের জন্য মেসার্স এমএসবি-এমসিবিএল জেভিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোনো কাজ না করেই ১০ লাখ টাকা বিল তোলা হয় হাসান শওকতের স্বাক্ষরে। এ ছাড়া ঢাকার কোতোয়ালি থানার আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে কোনো কাজ না করেই বিলের ১৯ লাখ টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

হাসান শওকতের যত সম্পদ
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চাকরিজীবনে প্রকৌশলী হাসান শওকত যখন যেখানে যে পদেই চাকরি করেছেন, সেখানেই তার হাতে থাকত আলাদিনের চেরাগ। আর এই চেরাগ ঘষেই তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন নামে-বেনামে।

হাতে আসা কিছু নথিপত্রে দেখা গেছে, নিজের নামে, স্ত্রীর নামে দেশে-বিদেশে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অঢেল সম্পদ। স্ত্রীর নামে কিনেছেন বিভিন্ন স্থানে ১৮৪.৩৩ শতক জায়গা ও রিসোর্ট। এ ছাড়া স্ত্রীর নামে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় বিলপাবলা-৫৭ মৌজায় ৪১২২ খতিয়ানে ১২.৫০ শতাংশ, দিঘলিয়া উপজেলার বয়রা-১০ মৌজায় ৩৭১৭ খতিয়ানে ১১.৭২ শতাংশ, মেহেরপুর জেলার সদর উপজেলার মেহেরপুর-৬৬ মৌজায় ৫০৬২ খতিয়ানে ১৩.৮৫ শতাংশ, একই মৌজায় ৯৯৪২ খতিয়ানে ৮ শতাংশ, মাগুরা সদর উপজেলার মাগুরা-৬৯ মৌজায় ৮০০২ খতিয়ানে ১৯ শতাংশ জমিসহ ঢাকা মহানগরের ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন বরুয়া-১ মৌজায় ৮৭৯৭ খতিয়ানের জমিতে করেছেন আলিশান জমিদার বাড়ি।

মেহেরপুর সদর উপজেলার মেহেরপুর-৬৬ মৌজায় ১৪০৪৫ খতিয়ানে ৬৫ শতাংশ এবং ১৫৪২৯ খতিয়ানে ৪০.৩৭ শতাংশ জমি মোট ১৮৪.৩৩ শতাংশ জমিসহ দক্ষিণখান এলাকায় নিজের এবং স্ত্রীর নামে করেছেন ১০তলা আলিশান বাড়ি। এ ছাড়া তার আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে-বেনামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার জমি, ফ্ল্যাট ও প্লট।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।