ঢাকা ০১:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
একটি ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দেশ গড়ছে সরকার : রিজভী চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা সদর দপ্তর কমপ্লেক্স স্থাপনে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশ হাইকোর্টের ফায়ার সার্ভিসের ফাইটারদের পদোন্নতির জট খুলছে: ১২তম থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ চিলমারী নৌ-বন্দরে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তার চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ সফটওয়্যার বদলের আড়ালে রংপুর সিটি করপোরেশনে ৫০ কোটি টাকা লুট ৪ বিভাগে ভারি বৃষ্টির সতর্কতা জারি, ভূমিধসের আশঙ্কা সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৬ দিন ধরে বন্ধ, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’ বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ার গুজবে পদদলিত, মন্দিরে নিহত ৭ সেপ্টেম্বরে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে মিলবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নরসিংদীতে ফের ভূমিকম্প, মৃদু কম্পনে কাঁপল ঢাকা

সফটওয়্যার বদলের আড়ালে রংপুর সিটি করপোরেশনে ৫০ কোটি টাকা লুট

সফটওয়্যার জালিয়াতি করে রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) একটি চক্র সরকারি রাজস্ব খাতের প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। রাজস্ব লুটের এই প্রক্রিয়া কল্পকাহিনীকেও হার মানিয়েছে। সফটওয়্যার ও মূল সার্ভারের কোড পরিবর্তন, অস্তিত্বহীন ‘ভূতুড়ে’ হোল্ডিং অ্যাকাউন্টে টাকা বকেয়া দেখানো, বিরাট ভবনকে কাগজে-কলমে ছোট দেখিয়ে আদায়যোগ্য কর ফাঁকি, ব্যাংকের সিল জাল করে করের টাকা লুটের মতো বড় বড় অনিয়ম পাওয়া গেছে। আর এসবের নেপথ্যে রয়েছে সাবেক মেয়র জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ও তার সিন্ডিকেট।

সার্ভারের মূল কোড পরিবর্তন করে মেয়র মোস্তফা ও তৎকালীন প্রধান নির্বাহীসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অ্যাকাউন্টের (আয়) নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয় চক্রটি। এসব জালিয়াতিতে কর আদায় শাখার কম্পিউটার অপারেটর ও জাতীয় ছাত্রসমাজের জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক আরিফুল ইসলামের নাম এসেছে। তিনি সাবেক মেয়রের আস্থাভাজন ছিলেন। তারা দুজনই লুটপাটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর ও তার দলীয় সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে সরকারের রাজস্ব খাতের টাকা লুটের ওই জালিয়াত চক্র। বিষয়টি রসিকের তৎকালীন প্রধান নির্বাহীসহ অনেকের নজরে এলেও কেউ পদক্ষেপ নেননি।

অনুসন্ধানে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতে চক্রটির নানা কৌশল বেরিয়ে এসেছে। দেখা গেছে, একই হোল্ডিংয়ে একাধিক ভুয়া আইডি তৈরি করা, অপকর্মের ঘটনা আড়াল করতে প্রতিনিয়ত সার্ভার থেকে দৈনন্দিন কার্যক্রমের ডিজিটাল লগ বা ট্র্যাকিং হিস্ট্রি মুছে ফেলার মতো অনিয়মও করেছে চক্রটি। এভাবেই হাতিয়ে নিয়েছে রাজস্বের কোটি কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে আরও বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে। ২০১৫ সালের পরে জাইকার অর্থায়নে চালু করা হয় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সংবলিত একটি সফটওয়্যার। এর গোপন পাসওয়ার্ড মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে সংরক্ষিত রেখে কর প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু ২০১৯ সালে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই সার্ভারের মূল কোড পরিবর্তন করে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলে আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে চক্রটি। ফলে তৎকালীন মেয়র ও প্রধান নির্বাহীর অ্যাকাউন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি আইডির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আরিফুলের হাতে। সাবেক মেয়র মোস্তফার সঙ্গে এর যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

বিষয়টি জানতে পেরে রসিকের সচিব রাকিব হাসান (ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী) চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি একটি চিঠি পাঠান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। তাতে তিনি রসিকের হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে এই বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাটের ঘটনা উল্লেখ করেন। তার স্বাক্ষরিত ওই চিঠির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে এই জালিয়াতির ঘটনার তথ্য-উপাত্ত হাতে পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি তহবিলের বিশাল ঘাটতি গোপন করতে সফটওয়্যারের সার্ভার থেকে কম করের কিছু পুরোনো ও প্রকৃত অ্যাকাউন্ট মুছে দেওয়া হতো। পরে সেই খালি স্থানে নামে-বেনামে নতুন ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আত্মসাৎ করা সমপরিমাণ টাকা ‘বকেয়া কর’ হিসাবে দেখিয়ে খাতা-কলমে হিসাবের যোগফল মেলানো হতো।

এ জালিয়াতির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কিছু হোল্ডিং নম্বর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রসিকের মোট ৫৯ হাজার ৬৭০টি হোল্ডিংয়ের মধ্যে ৩০ হাজার হোল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এই জালিয়াতির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ১৭টি হোন্ডিংয়ের কাল্পনিক অ্যাকাউন্টের তথ্য মিলেছে। এই ১৭টি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে মোট বকেয়া দেখানো হয় ১ কোটি ৭১ লাখ ৬৫ হাজার ২৯১ টাকা। রসিকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এমন ৩০ হাজারের অধিক কাল্পনিক হোল্ডিং নম্বর খুলে এই জালিয়াতি করা হয়েছে।

দেখা গেছে, ৮২২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা ‘২৮-১৪০-০৯৮০-০০’ নম্বর হোল্ডিং অ্যাকাউন্টটি ‘আকরাম’ নামে নিবন্ধিত। এটির বিপরীতে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ২৯২ টাকা। একই ভাবে ৮৩৬ নম্বর সিরিয়ালে কোনো নাম ছাড়াই শুধু ইংরেজি অক্ষর ‘এস’ লিখে আলমনগর ঠিকানার বিপরীতে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৭২৪ নম্বর সিরিয়ালে ‘২৭-১২২-০১৯৯-০১’ নম্বর হোল্ডিংয়ে ‘গ্রামীণ টাওয়ার’ নাম দিয়ে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৩৭ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা।

সরেজমিন সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ ধরনের কোনো হোল্ডিংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকৃত হোল্ডিংয়ের বিপরীতে কর আদায় করে তা আত্মসাৎ করার পর কাল্পনিক হোল্ডিংয়ের নামে বকেয়া দেখিয়ে হিসাব মেলাত জালিয়াত চক্রটি।

শুধু তাই নয়, আরও বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে। নগরীর জিএল রায় রোডে ‘এসোড’ বেসরকারি সংস্থার কার্যালয়ের হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া ছিল ২০০৭-২০০৮ অর্থবছর থেকে। পরবর্তী সময়ে স্থাপনাটি ‘ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’র কাছে বিক্রি করে দেওয়া হলে তাদের পুরোনো বকেয়া কর গোপন করে শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৭৮ হাজার ৮১২ টাকার একটি বকেয়া কর বিল দেওয়া হয়। জালিয়াতি লুকাতে বিলে বকেয়ার সময়কাল কমিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছর দেখানো হয় এবং করের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মালিকানা পরিবর্তনের পর হোল্ডিং খারিজ (নামজারি) করতে এসে এই জালিয়াতি ফাঁস হয়। পরে সিটি করপোরেশন পুনরায় ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫০ টাকার প্রকৃত বকেয়াসহ নতুন বিল দিলে ‘ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’ তা পরিশোধ করে। একই ভাবে তহসিন উদ্দিন রোডের সারওয়ার হোসেন ও গোলাম নাসিরের নামে থাকা একটি হোল্ডিংয়ের (আইডি : ২০-০৪৯-০০১২-০০) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কর কোনো বকেয়া না দেখিয়ে মাত্র ৬ হাজার ৩৮৬ টাকা পরিশোধে চূড়ান্ত রসিদ দেওয়া হয়। অথচ সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ কর নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই হোল্ডিংটিতে প্রকৃতপক্ষে প্রায় ২৮ হাজার ১৭৩ টাকা বকেয়া ছিল। জালিয়াতির বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর বাড়ির মালিক গোলাম নাসির নিজেই জাল বিল তৈরির কথা স্বীকার করে জানান, সহকারী কর আদায়কারী মো. আয়েজউদ্দিনের মাধ্যমে ওই বিল প্রস্তুত করা হয়েছিল। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে আয়েজউদ্দিনকে পরবর্তী সময়ে সাময়িক বরখাস্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবেক মেয়র মোস্তফা বলেন, এ বিষয়গুলো অনেক পুরোনো। ওই সময় যারা কর শাখায় অর্থ আদায় করেছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন। এসব বিষয়ে আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না।’

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

একটি ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দেশ গড়ছে সরকার : রিজভী

সফটওয়্যার বদলের আড়ালে রংপুর সিটি করপোরেশনে ৫০ কোটি টাকা লুট

আপডেট সময় ১২:৪৯:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

সফটওয়্যার জালিয়াতি করে রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) একটি চক্র সরকারি রাজস্ব খাতের প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। রাজস্ব লুটের এই প্রক্রিয়া কল্পকাহিনীকেও হার মানিয়েছে। সফটওয়্যার ও মূল সার্ভারের কোড পরিবর্তন, অস্তিত্বহীন ‘ভূতুড়ে’ হোল্ডিং অ্যাকাউন্টে টাকা বকেয়া দেখানো, বিরাট ভবনকে কাগজে-কলমে ছোট দেখিয়ে আদায়যোগ্য কর ফাঁকি, ব্যাংকের সিল জাল করে করের টাকা লুটের মতো বড় বড় অনিয়ম পাওয়া গেছে। আর এসবের নেপথ্যে রয়েছে সাবেক মেয়র জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ও তার সিন্ডিকেট।

সার্ভারের মূল কোড পরিবর্তন করে মেয়র মোস্তফা ও তৎকালীন প্রধান নির্বাহীসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অ্যাকাউন্টের (আয়) নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয় চক্রটি। এসব জালিয়াতিতে কর আদায় শাখার কম্পিউটার অপারেটর ও জাতীয় ছাত্রসমাজের জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক আরিফুল ইসলামের নাম এসেছে। তিনি সাবেক মেয়রের আস্থাভাজন ছিলেন। তারা দুজনই লুটপাটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর ও তার দলীয় সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে সরকারের রাজস্ব খাতের টাকা লুটের ওই জালিয়াত চক্র। বিষয়টি রসিকের তৎকালীন প্রধান নির্বাহীসহ অনেকের নজরে এলেও কেউ পদক্ষেপ নেননি।

অনুসন্ধানে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতে চক্রটির নানা কৌশল বেরিয়ে এসেছে। দেখা গেছে, একই হোল্ডিংয়ে একাধিক ভুয়া আইডি তৈরি করা, অপকর্মের ঘটনা আড়াল করতে প্রতিনিয়ত সার্ভার থেকে দৈনন্দিন কার্যক্রমের ডিজিটাল লগ বা ট্র্যাকিং হিস্ট্রি মুছে ফেলার মতো অনিয়মও করেছে চক্রটি। এভাবেই হাতিয়ে নিয়েছে রাজস্বের কোটি কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে আরও বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে। ২০১৫ সালের পরে জাইকার অর্থায়নে চালু করা হয় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সংবলিত একটি সফটওয়্যার। এর গোপন পাসওয়ার্ড মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে সংরক্ষিত রেখে কর প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু ২০১৯ সালে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই সার্ভারের মূল কোড পরিবর্তন করে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলে আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে চক্রটি। ফলে তৎকালীন মেয়র ও প্রধান নির্বাহীর অ্যাকাউন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি আইডির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আরিফুলের হাতে। সাবেক মেয়র মোস্তফার সঙ্গে এর যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

বিষয়টি জানতে পেরে রসিকের সচিব রাকিব হাসান (ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী) চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি একটি চিঠি পাঠান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। তাতে তিনি রসিকের হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে এই বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাটের ঘটনা উল্লেখ করেন। তার স্বাক্ষরিত ওই চিঠির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে এই জালিয়াতির ঘটনার তথ্য-উপাত্ত হাতে পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি তহবিলের বিশাল ঘাটতি গোপন করতে সফটওয়্যারের সার্ভার থেকে কম করের কিছু পুরোনো ও প্রকৃত অ্যাকাউন্ট মুছে দেওয়া হতো। পরে সেই খালি স্থানে নামে-বেনামে নতুন ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আত্মসাৎ করা সমপরিমাণ টাকা ‘বকেয়া কর’ হিসাবে দেখিয়ে খাতা-কলমে হিসাবের যোগফল মেলানো হতো।

এ জালিয়াতির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কিছু হোল্ডিং নম্বর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রসিকের মোট ৫৯ হাজার ৬৭০টি হোল্ডিংয়ের মধ্যে ৩০ হাজার হোল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এই জালিয়াতির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ১৭টি হোন্ডিংয়ের কাল্পনিক অ্যাকাউন্টের তথ্য মিলেছে। এই ১৭টি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে মোট বকেয়া দেখানো হয় ১ কোটি ৭১ লাখ ৬৫ হাজার ২৯১ টাকা। রসিকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এমন ৩০ হাজারের অধিক কাল্পনিক হোল্ডিং নম্বর খুলে এই জালিয়াতি করা হয়েছে।

দেখা গেছে, ৮২২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা ‘২৮-১৪০-০৯৮০-০০’ নম্বর হোল্ডিং অ্যাকাউন্টটি ‘আকরাম’ নামে নিবন্ধিত। এটির বিপরীতে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ২৯২ টাকা। একই ভাবে ৮৩৬ নম্বর সিরিয়ালে কোনো নাম ছাড়াই শুধু ইংরেজি অক্ষর ‘এস’ লিখে আলমনগর ঠিকানার বিপরীতে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৭২৪ নম্বর সিরিয়ালে ‘২৭-১২২-০১৯৯-০১’ নম্বর হোল্ডিংয়ে ‘গ্রামীণ টাওয়ার’ নাম দিয়ে বকেয়া দেখানো হয়েছে ৩৭ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা।

সরেজমিন সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ ধরনের কোনো হোল্ডিংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকৃত হোল্ডিংয়ের বিপরীতে কর আদায় করে তা আত্মসাৎ করার পর কাল্পনিক হোল্ডিংয়ের নামে বকেয়া দেখিয়ে হিসাব মেলাত জালিয়াত চক্রটি।

শুধু তাই নয়, আরও বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে। নগরীর জিএল রায় রোডে ‘এসোড’ বেসরকারি সংস্থার কার্যালয়ের হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া ছিল ২০০৭-২০০৮ অর্থবছর থেকে। পরবর্তী সময়ে স্থাপনাটি ‘ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’র কাছে বিক্রি করে দেওয়া হলে তাদের পুরোনো বকেয়া কর গোপন করে শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৭৮ হাজার ৮১২ টাকার একটি বকেয়া কর বিল দেওয়া হয়। জালিয়াতি লুকাতে বিলে বকেয়ার সময়কাল কমিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছর দেখানো হয় এবং করের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মালিকানা পরিবর্তনের পর হোল্ডিং খারিজ (নামজারি) করতে এসে এই জালিয়াতি ফাঁস হয়। পরে সিটি করপোরেশন পুনরায় ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫০ টাকার প্রকৃত বকেয়াসহ নতুন বিল দিলে ‘ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’ তা পরিশোধ করে। একই ভাবে তহসিন উদ্দিন রোডের সারওয়ার হোসেন ও গোলাম নাসিরের নামে থাকা একটি হোল্ডিংয়ের (আইডি : ২০-০৪৯-০০১২-০০) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কর কোনো বকেয়া না দেখিয়ে মাত্র ৬ হাজার ৩৮৬ টাকা পরিশোধে চূড়ান্ত রসিদ দেওয়া হয়। অথচ সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ কর নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই হোল্ডিংটিতে প্রকৃতপক্ষে প্রায় ২৮ হাজার ১৭৩ টাকা বকেয়া ছিল। জালিয়াতির বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর বাড়ির মালিক গোলাম নাসির নিজেই জাল বিল তৈরির কথা স্বীকার করে জানান, সহকারী কর আদায়কারী মো. আয়েজউদ্দিনের মাধ্যমে ওই বিল প্রস্তুত করা হয়েছিল। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে আয়েজউদ্দিনকে পরবর্তী সময়ে সাময়িক বরখাস্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবেক মেয়র মোস্তফা বলেন, এ বিষয়গুলো অনেক পুরোনো। ওই সময় যারা কর শাখায় অর্থ আদায় করেছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন। এসব বিষয়ে আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না।’