দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দরে সোনামসজিদে গত চার অর্থবছরে মোট রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৭ কোটি ৮১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। কাস্টমস স্টেশনের লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়ের পরিসংখ্যান এবং বন্দর সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে রাজস্ব আদায়ের এ ঘাটতির চিত্র পাওয়া গেছে। কাস্টমস ও বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থাকছে বন্দরটি, যা দিন দিন সোনামসজিদের সার্বিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
কাস্টমসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সোনামসজিদ বন্দরে রাজস্ব ঘাটতির এ ধারা শুরু হয় ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে; ওই বছর ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪১৮ কোটি টাকা। পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৬৩ কোটি টাকায়। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘাটতি আবারও বেড়ে দাঁড়ায় ২১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকায়।
সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ১০১ কোটি ৮৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও আদায় হয়েছে ৮১৯ কোটি ৬৯ লাখ ২৩ হাজার টাকা। ফলে বছর শেষে ২৮২ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকার নতুন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গত চার বছরের ঘাটতি হিসাব করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে।
মাসভিত্তিক আদায়ের চিত্র
সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই মাসভিত্তিক রাজস্ব আদায়ে টানা মন্দাভাব ছিল। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩ শতাংশ রাজস্ব কম আদায় হয়। আগস্টে ঘাটতির হার ছিল ২৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে কম আদায় হয় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অক্টোবর মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ কোটি ৩ লাখ টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে যথাক্রমে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ ও ৩১ দশমিক ১ শতাংশ ঘাটতি ছিল। জানুয়ারিতে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ ঘাটতি দেখা দেয়।
মার্চ মাসে আদায় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এপ্রিলে সামান্য ঘাটতি থাকলেও মে মাসে বড় ধস নামে; নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় কমে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ০ দশমিক ৯ শতাংশ রাজস্ব উদ্বৃত্ত অর্জিত হয়।
রাজস্ব ঘাটতির ছয় প্রধান কারণ
বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্রমাগত এই রাজস্ব ঘাটতির নেপথ্যে মূলত ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা গেছে-
১. অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: বন্দরে জায়গা সংকট ও সরু সড়কের কারণে প্রতিদিন তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে, যা পণ্য খালাস প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।
২. ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া: দাপ্তরিক কাজ ও ফাইল অনুমোদনে অটোমেশন বা অনলাইন ব্যবস্থার ঘাটতির ফলে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিচ্ছে।
৩. গার্মেন্টস পণ্য স্থানান্তরে বাধা: তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস পণ্য স্থলবন্দরের পরিবর্তে সমুদ্রবন্দর (সি-পোর্ট) দিয়ে রপ্তানির বাধ্যবাধকতার কারণে সোনামসজিদের রপ্তানি বাণিজ্য ও আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
৪. অতিরিক্ত খরচ ও শুল্ক: ভারতীয় অংশে একতরফা মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সোনামসজিদ বন্দরেও অতিরিক্ত চার্জ আদায় ও লোড-আনলোডে দ্বিগুণ মাশুল নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
৫. যান্ত্রিকীকরণে শ্রমিক অসন্তোষ: পাথর খালাসে ক্রেন ও জেসিবি বা এস্কাভেটর ব্যবহার বাড়ায় সাধারণ শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন, যা বন্দরে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।
৬. উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানি বন্ধ: ডলারে কড়াকড়ির কারণে আমদানিকারকরা পর্যাপ্ত এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারছেন না। ফলে ফল ও মসলার মতো উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে কেবল নিম্ন শুল্কের পাথর নির্ভর হয়ে পড়েছে বন্দরটি।
ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ক্ষোভ
সোনামসজিদ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়াল বলেন, যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে যেখানে প্রায় সাড়ে ৩০০ একর জায়গা রয়েছে, সেখানে সোনামসজিদে রয়েছে মাত্র ১৯ একর। এত অল্প জায়গায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালানো অসম্ভব। সুযোগ-সুবিধার অভাবে আমদানিকারকরা এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন বলেন, জটিলতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী হয়রানি ও যানজটের ভয়ে এখানে আসতে চান না।
সাবেক আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সিরিয়ালের কারণে সময়মতো ঢাকা বা দেশের অন্য বাজারে পণ্য পৌঁছানো যায় না, ফলে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে।
আমদানিকারক রওশান আলী অভিযোগ করেন, ইয়ার্ডে জায়গা না থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে মালামাল খালাস না করতে পারলে মোটা অঙ্কের ডেমারেজ মাশুল গুনতে হয়।
আবার অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে নিয়মিত তদারকির তাগিদ দেন সোনামসজিদ আমদানি ও রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফ উদ্দিন ইতি।
অন্যদিকে যন্ত্রের ব্যবহারে সাধারণ শ্রমিকদের আয় দিনে ৫০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায় নেমে এসেছে বলে জানান সোনামসজিদ ‘মায়ের দোয়া’ শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি মুখলেসুর রহমান সরকার।
অবকাঠামোগত সংকট প্রসঙ্গে বন্দর পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘পানামা সোনামসজিদ পোর্ট লিংক লিমিটেড’-এর ম্যানেজার মাইনুল বলেন, ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাতে সরকারের কাছে আরও ২২ একর জমি অধিগ্রহণের আবেদন করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে আমদানি-রপ্তানি ও রাজস্ব দুটোই বাড়বে।
সার্বিক বিষয়ে সোনামসজিদ কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ব্যাংক ও স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে আমরা নিয়মিত সভা করছি। আসলে আমদানি কতটুকু হবে তা ব্যবসায়ীদের চাহিদার ওপর নির্ভর করে। এ ছাড়া ডলারের দাম কিছুটা কমে এলে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানি বাড়বে, যা রাজস্ব ঘাটতি কাটাতে ভূমিকা রাখবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















