ঢাকা ০৬:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৯ গোল হজম করে আসিয়ান কাপ থেকে বিদায় বাংলাদেশ মনোহরগঞ্জের আ’লীগ নেতা ফিরোজের বিরুদ্ধে অবৈধ মার্কেট ও সম্পদ গড়ার অভিযোগ রূপপুরের পারমাণবিক জ্বালানি আসছে কাল, কেন্দ্রে পৌঁছাবে শনিবার ক্যাশলেস লেনদেনে কোনো চার্জ লাগবে না: অর্থমন্ত্রী চন্দ্রগঞ্জে সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিক হামলার শিকার ফুটপাত দখল করলেই মামলা, হকারদের কড়া বার্তা দিল ডিএসসিসি সেপ্টেম্বরে এলো ৩৪ হাজার কোটি টাকার প্রবাসী আয় দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগ ও জ্বালানিতে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির মৌলভীবাজার শহরের চৌমুহনায় মব সৃষ্টি করে হেনস্তার শিকার পুলিশ কর্মকর্তা

রংপুরে মাদ্রাসার জমি বন্ধক, অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার জমি বন্ধক রেখে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ৯ এপ্রিল এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসন গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাহফুজার রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

অভিযুক্ত মো. শহীদুল ইসলাম মুন্সি বেতগাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং বেতগাড়ী একরামিয়া বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার সভাপতি। একই ঘটনায় ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মাহমুদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধেও মাদ্রাসার ১৮ শতক জমি জোরপূর্বক দখলে রাখার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৫ সাল থেকে শহীদুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, বিভিন্ন তহবিলের টাকা আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানের জমি বন্ধক দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বেতগাড়ী তহশিল অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বেতগাড়ী মৌজার একাধিক দাগে প্রায় ১৬ বিঘা জমি মাদ্রাসার মালিকানাধীন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব জমি বন্ধক দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এ ছাড়া একই মৌজার ১০৫৮ নম্বর দাগের ১৮ শতক জমি বিএনপি নেতা মাহমুদুল ইসলাম সবুজ জোরপূর্বক ভোগদখল করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি প্রথমে গত ৯ জুন সরেজমিন তদন্তের তারিখ নির্ধারণ করে। তবে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মনোয়ারুল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অসুস্থ থাকায় তদন্ত পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। পরে নতুন তারিখে তদন্তকারীরা সরেজমিনে গিয়ে বাদী, বিবাদী, সাক্ষীসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করেন।

তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ২৩ মার্চ ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়। ওই প্রতিবেদনে মাদ্রাসার নিজস্ব জমির পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৭ একর, অর্থাৎ স্থানীয় হিসেবে প্রায় ১৯ বিঘা উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন চাষি জানান, তাঁরা দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে জমিগুলো বন্ধক নিয়ে আবাদ করছেন। বাচ্চা মিয়া নামে এক চাষি বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ২৪ শতক জমি চাষ করছেন এবং প্রতি বছর মাদ্রাসায় টাকা দিলেও কোনো রসিদ পান না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। তবে তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানান।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, তিনি মাত্র তিন মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় জমি-সংক্রান্ত কোনো নথি তাঁর কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, জমি আবাদকারীরা মাদ্রাসায় অর্থ জমা দেন এবং সে অর্থের রসিদও রয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কোনো রসিদ বা নথি দেখাতে পারেননি।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসাসংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের জমি ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত নথি থাকলেও সেগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম চলে আসছে।

জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে মাহমুদুল ইসলাম সবুজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শহীদুল ইসলাম মুন্সি। তিনি বলেন, মাদ্রাসার কোনো জমি বন্ধক দেওয়া হয়নি। সব জমি নিয়ম অনুযায়ী বর্গা দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা হয়। ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডা. মো. মাহফুজার রহমান বলেন, বাদী, বিবাদী, সাক্ষী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। আরও কিছু দাপ্তরিক নথি সংগ্রহের পর তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হবে।

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমীন আক্তার বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে প্রয়োজনীয় কিছু নথি পাওয়া যায়নি। তাই প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৯ গোল হজম করে আসিয়ান কাপ থেকে বিদায় বাংলাদেশ

রংপুরে মাদ্রাসার জমি বন্ধক, অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

আপডেট সময় ০২:৩২:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার জমি বন্ধক রেখে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ৯ এপ্রিল এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসন গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাহফুজার রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

অভিযুক্ত মো. শহীদুল ইসলাম মুন্সি বেতগাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং বেতগাড়ী একরামিয়া বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার সভাপতি। একই ঘটনায় ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মাহমুদুল ইসলাম সবুজের বিরুদ্ধেও মাদ্রাসার ১৮ শতক জমি জোরপূর্বক দখলে রাখার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৫ সাল থেকে শহীদুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, বিভিন্ন তহবিলের টাকা আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানের জমি বন্ধক দিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বেতগাড়ী তহশিল অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বেতগাড়ী মৌজার একাধিক দাগে প্রায় ১৬ বিঘা জমি মাদ্রাসার মালিকানাধীন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব জমি বন্ধক দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এ ছাড়া একই মৌজার ১০৫৮ নম্বর দাগের ১৮ শতক জমি বিএনপি নেতা মাহমুদুল ইসলাম সবুজ জোরপূর্বক ভোগদখল করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি প্রথমে গত ৯ জুন সরেজমিন তদন্তের তারিখ নির্ধারণ করে। তবে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মনোয়ারুল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অসুস্থ থাকায় তদন্ত পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। পরে নতুন তারিখে তদন্তকারীরা সরেজমিনে গিয়ে বাদী, বিবাদী, সাক্ষীসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করেন।

তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ২৩ মার্চ ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়। ওই প্রতিবেদনে মাদ্রাসার নিজস্ব জমির পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৭ একর, অর্থাৎ স্থানীয় হিসেবে প্রায় ১৯ বিঘা উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন চাষি জানান, তাঁরা দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে জমিগুলো বন্ধক নিয়ে আবাদ করছেন। বাচ্চা মিয়া নামে এক চাষি বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ২৪ শতক জমি চাষ করছেন এবং প্রতি বছর মাদ্রাসায় টাকা দিলেও কোনো রসিদ পান না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। তবে তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানান।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, তিনি মাত্র তিন মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় জমি-সংক্রান্ত কোনো নথি তাঁর কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, জমি আবাদকারীরা মাদ্রাসায় অর্থ জমা দেন এবং সে অর্থের রসিদও রয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কোনো রসিদ বা নথি দেখাতে পারেননি।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসাসংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের জমি ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত নথি থাকলেও সেগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম চলে আসছে।

জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে মাহমুদুল ইসলাম সবুজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শহীদুল ইসলাম মুন্সি। তিনি বলেন, মাদ্রাসার কোনো জমি বন্ধক দেওয়া হয়নি। সব জমি নিয়ম অনুযায়ী বর্গা দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা হয়। ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডা. মো. মাহফুজার রহমান বলেন, বাদী, বিবাদী, সাক্ষী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। আরও কিছু দাপ্তরিক নথি সংগ্রহের পর তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হবে।

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমীন আক্তার বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে প্রয়োজনীয় কিছু নথি পাওয়া যায়নি। তাই প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে।