ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। দেশের বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম মেগা এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন এক অদ্ভুত চাপা ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাসের অনুরণন। আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, ভেতরকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য অন্যায়ের চাদরে। ক্ষমতার পালাবদলের পরও যেন কাটেনি পুরনো প্রেতাত্মাদের ছায়া। হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ বিতরণের এই মহীরুহে ঘটে গেছে এক নজিরবিহীন ঘটনা, যা খোদ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরেই জন্ম দিয়েছে নানা নাটকীয় বিতর্কের। ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী কমার্শিয়াল সাপোর্ট সার্ভিসেস (CSS) ঠিকাদারদের চুক্তির মেয়াদ আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিপিডিসি এখন পরিণত হয়েছে এক অস্থিরতার জনপদে। ক্ষোভে ফুঁসছেন বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত, নির্যাতিত এবং ভিন্নমতাবলম্বী দেশপ্রেমিক ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের সমস্বরে ওঠা প্রশ্ন—‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। পর্দার আড়ালে থাকা মুখোশধারী ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে, বর্তমান সরকারকে চরম বিব্রতকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রহস্যময় আদেশ:
সাধারণত ডিপিডিসির বিভিন্ন নেটওয়ার্ক অপারেশন অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস (এনওসিএস) সার্কেলের অধীনে সিএসএস ঠিকাদারদের আউটসোর্সিং চুক্তির মেয়াদকাল থাকে ঠিক ০২ (দুই) বছর। বিগত ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই দলীয় ঠিকাদারদের বিশেষ পন্থায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী গত ৩০ জুন এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে, ১ জুলাই ডিপিডিসি’র চুক্তি ও ক্রয় সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সালেক মাহমুদ স্বাক্ষরিত একটি বিশেষ অফিস আদেশ জারি করা হয়।
উক্ত আদেশে উল্লেখ রয়েছে, ডিপিডিসি’র পরিচালনা পর্ষদের ৪০৫তম সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক চলমান সিএসএস চুক্তির মেয়াদ আরও ৬ মাস, অর্থাৎ আগামী বছরের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, এই বর্ধিত সময়ে প্রতিটি এনওসিএস সার্কেলের জন্য আরো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আকাশচুম্বী অর্থ—যার পরিমাণ ঠিক ৫২ লাখ ৪২ হাজার ৯ শত ২৯ টাকা ৬৩৬ পয়সা। অর্থাৎ এই বর্ধিত সময়ের জন্য দেওয়া আরো বরাদ্দকৃত অর্থের সুবিধা ভোগ করবেন ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া তাদের দলীয় ঠিকাদারগণ। আদেশে সময় বৃদ্ধিজনিত নতুন চুক্তির কার্যাদেশটি গ্রহন পূর্বক পারফরমেন্স সিকিউরিটি হিসাবে বর্ধিত চুক্তিমূল্যের ১০ ভাগ হারে মোট ৫ লাখ ২৪ হাজার ২ শত ৯২ টাকা ৯৬ পয়সা পে-অর্ডার অথবা ব্যাংক গ্যারান্টি দাখিল করার জন্য বলা হয়। একেকটি সার্কেলে যদি অর্ধ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবে ৩৬টি সার্কেলে মোট কত কোটি টাকা আবার সেই পুরনো চক্রের পকেটে যাচ্ছে—এই হিসাব মেলাতেই এখন ব্যস্ত ডিপিডিসির বঞ্চিত অংশ।
টেন্ডার প্রক্রিয়া:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিপিডিসিতে এই বিপুল কর্মযজ্ঞের টেন্ডার প্রক্রিয়াটি বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত আধুনিক ও ডিজিটাল করা হয়েছিল।
• আবেদনের মাধ্যম: আগ্রহী যোগ্য লজিস্টিক বা আউটসোর্সিং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ই-জিপি (e-GP) পোর্টালের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অংশ নিতে হতো।
• যোগ্যতার মারপ্যাঁচ: শর্ত দেওয়া থাকত—বিগত বছরগুলোতে মিটার রিডিং বা বিদ্যুৎ বিভাগে কাজের বিপুল অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ফলে নতুন বা ভিন্নমতাবলম্বী কোনো স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই সিন্ডিকেট ভাঙা এক প্রকার অসম্ভব।
• ভৌগোলিক বণ্টন: গোটা ডিপিডিসির ৩৬টি এনওসিএস সার্কেলকে প্রধানত ৩টি জোনে (নর্থ, সাউথ ও সেন্ট্রাল) ভাগ করে এই ২ বছরের কাজগুলো বণ্টন করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিদের সরাসরি সুপারিশ এবং মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে ই-জিপি পোর্টালের ভেতরেও কারিগরি কারসাজি করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকেই বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো।
মাঠপর্যায়ে সিএসএস ঠিকাদারদের কাজের পরিধি:
এই সিএসএস বা কমার্শিয়াল সাপোর্ট সার্ভিসের কর্মীরাই মূলত ডিপিডিসির রাজস্ব আয়ের মূল চালিকাশক্তি। তাদের কাজের প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ:
মূল দায়িত্ব ও প্রভাব
গ্রাহক সেবা:
মাসিক মিটার রিডিং গ্রহণ এবং ডিজিটাল স্পট বিলিং কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করা।
তথ্য সংরক্ষণ:
বিদ্যুৎ বিলের সংগৃহীত ডাটা এন্ট্রি এবং দৈনিক কালেকশন রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই।
কঠোর নজরদারি:
বকেয়া বিলের দায়ে সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং পুনঃসংযোগের ফিল্ড মনিটরিং নিশ্চিত করা।
বাণিজ্যিক সহায়তা:
নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদন প্রক্রিয়াকরণে যাবতীয় দাপ্তরিক ও বাণিজ্যিক সহায়তা প্রদান।
এই স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ এখনো ফ্যাসিস্ট আমলের সিন্ডিকেটের হাতে থাকায় গ্রাহক হয়রানি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রতিটি এনওসিএস সার্কেলে প্রায় ২০ থেকে ৪০ জন কর্মী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী, এনওসিএসের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর সমন্বয়ে গঠিত ২ সদস্যের কমিটি ইন্টারভিউ নিয়ে এই কর্মীদের চূড়ান্ত করার কথা। কিন্তু বাস্তবে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ক্যাডার ও দলীয় কর্মীদের তালিকা ধরিয়ে দিত, আর কর্মকর্তারা তাতে সই করতেন।
ডিপিডিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এই প্রক্রিয়ার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, “জনবল সরবরাহ করার জন্য টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার চূড়ান্ত করা হয়। এরপর জনবল নিয়োগ ঠিকাদারই করে থাকে। ঠিকাদার যে বায়োডাটাগুলো দিয়েছে, আমাদের লোক তা কেবল যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করেছে। এর বেশি কিছু নয়।”
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—ফ্যাসিস্টদের দেওয়া বায়োডাটা যাচাইয়ের নামে এতকাল কী করা হয়েছে, তা সবারই জানা।
ক্ষুব্ধ প্রকৌশলীদের জবানবন্দি:
নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে ডিপিডিসির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ও বিগত আমলে চরম নির্যাতিত-বঞ্চিত দেশপ্রেমিক প্রকৌশলী আক্ষেপ করে বলেন, “সংস্থাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটা প্রশাসনিক টেবিলে ও নীতি-নির্ধারণী স্তরে এখনো ফ্যাসিস্ট দোসররা শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। এরা সুযোগসন্ধানী এবং অত্যন্ত চতুর। বর্তমান সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা এবং বিভিন্ন সেক্টরে কৃত্রিম সংকট ও অসন্তোষ তৈরি করে এই সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করাই এখন তাদের মূল লুকানো এজেন্ডা। এই কালো থাবা থেকে ডিপিডিসিকে মুক্ত করতে না পারলে বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার সুদূরপরাহত থেকে যাবে। ”
তাদের দাবি, মেয়াদোত্তীর্ণ ঠিকাদারদের পুনরায় মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে প্রশাসনের একটি বড় চক্র জড়িত, যারা ৪০৫তম পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই বিতর্কিত প্রস্তাবটি সুকৌশলে উত্থাপন এবং পাস করিয়েছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
এ ব্যাপারে জানতে ডিপিডিসি’র চুক্তি ও ক্রয় সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সালেক মাহমুদের সাথে দফায় দফায় যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে ডিপিডিসি’র পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মো. হামিদুর রহমান খান বলেন, আমাকে যতটুকু বলা হয়েছে তা হলো, সিএসএস ঠিকাদার নিয়োগে আমরা ই-জিপি কে টেন্ডার আহ্বান করলে তারা জানিয়েছেন তাদের কিছু টেকনিক্যাল প্রবলেম রয়েছে। যার কারনে সিএসএস ঠিকাদার নিয়োগের টেন্ডার আহ্বানে কিছুটা সময় লাগবে। আর তাই ৪০৫তম বোর্ড সভায় ৬ মাসের সময় বৃদ্ধি করার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়।
ভিন্নমতাবলম্বী ও দেশপ্রেমিক প্রকৌশলীদের দাবি, অবিলম্বে এই রহস্যজনক ‘মেয়াদ বৃদ্ধি’র আদেশ বাতিল করতে হবে। বিদ্যুৎ খাতকে রাহুমুক্ত করতে হলে পর্দার আড়ালের কালো হাতগুলোকে দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা এই সুবিধাবাদী চক্র ডিপিডিসিকে অচল করে দিয়ে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের জাতীয় বিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
একটি দেশের মেরুদণ্ড হলো তার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। এই সংবেদনশীল খাতে যদি পূর্বতন স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা জেঁকে বসে থাকে, তবে তা সমগ্র জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। ডিপিডিসির সাধারণ কর্মকর্তা, বঞ্চিত ঠিকাদার সমাজ এবং দেশের সচেতন নাগরিকদের এখন একটাই জোরালো দাবি—অবিলম্বে এই বিতর্কিত ১ জুলাইয়ের অফিস আদেশ বাতিল করতে হবে। একই সাথে, উচ্চপর্যায়ের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে ডিপিডিসির ভেতরে লুকিয়ে থাকা মুখোশধারী ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে হবে। আলোর সংস্থায় লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের কীটদের যদি এখনই উপড়ে ফেলা না যায়, তবে বিদ্যুৎ খাতের এই ‘কালো বিড়াল’ একদিন পুরো ব্যবস্থাকেই গ্রাস করে ফেলবে।
ডিপিডিসিতে ২০২৪ সালে সিএসএস ঠিকাদার হিসেবে কাজ পাওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হচ্ছে- আদবরে জেভি অফ আর.আই এন্ড আর.এস এন্টারপ্রাইজ, বনশ্রীতে মেসার্স সৈয়দ মঞ্জুরুল কবির অ্যান্ড মেসার্স সানসাইন এন্টারপ্রাইজ (জেভি), বংশালে স্টার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড এস.এস সিয়াম-জেভি, বাসাবোতে সানাকোশ-জ্যামস জেভিসিএ, জুরাইন মেসার্স মোর্শেদ
এন্ড অয়ন এন্টারপ্রাইজ (জেভিসি), কাকরাইলে মেসার্স মুন পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড এসোসিয়েটস, মানিকনগর ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস লিমিটেড, মাতুয়াইলে ইউনিভার্সেল আরবিসি জেভি, মগবাজারে মেসার্স তামিম ইন্টারন্যাশনাল, নারায়ণগঞ্জ (পশ্চিম) এ.এ ট্রেডিং এন্ড এ্যাসোসিয়েটস, নারায়ণগঞ্জ (পূর্ব) সাজু এন্টারপ্রাইজ, পোস্তগোলা জেভি অফ পিএমইসিটি এন্ড রায়াত এন্টারপ্রাইজ, শীতালক্ষ্যা মেসার্স মুন্সী ইঞ্জিনিয়ার্স এবং সিদ্ধিরগঞ্জে এমআই এসোসিয়েটস এন্ড এ্যাটকো-জেভি।
আবার ২০২১ সালে কাজ পাওয়া সিএসএস ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হচ্ছে- আদাবরে স্টার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেসার্স অয়ন এন্টারপ্রাইজ-জেভি, বনশ্রীতে পেয়েছে এমআই অ্যাসোসিয়েটস, বংশালে পেয়েছে মেসার্স মোর্শেদ এন্টারপ্রাইজ, বাসাবোয় মেসার্স এমআরএ কনসোর্টিয়াম, জুরাইনে সাজু এন্টারপ্রাইজ, মানিকনগরে এএ ট্রেডিং, মাতুয়াইলে সানাকোশ অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড (জেভি), মগবাজারে ইঞ্জনিয়ারিং সার্ভিস লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জে (দক্ষিণ) এ মেসার্স মুনশী ইঞ্জিনিয়ার্স, নারায়ণগঞ্জ (উত্তর) আর.আই অ্যান্ড আর.এস এন্টারপ্রাইজ (জেভি), শীতলক্ষ্যায় দি ইস্টওয়ে ইলেকট্রিক কোম্পানি, সিদ্ধিরগঞ্জে মেসার্স সৈয়দ মঞ্জুরুল কবির অ্যান্ড মেসার্স জেআরএস ট্রেডার্স (জেভি)।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















